,



হাওর এলাকায় জীবন-জীবিকার সংকট

ভারতীয় বানের পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে চরম খাদ্য সংকটে রয়েছে হাওরবাসীরা। এই সংকটে পড়েছে ৭ জেলার হাওরাঞ্চলের কৃষক পরিবারগুলো। ফসল হারিয়ে তারা দিশাহারা। তার উপর কাজ নেই। সামনের সময় কিভাবে কাটবে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা তাদের চোখে-মুখে। এদিকে মন্ত্রণালয় থেকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ত্রাণবরাদ্দ দেয়া হলেও অনেকে তা পায়নি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা  দাঁড়িয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো ত্রাণ পাচ্ছে না। গরীব অসহায় মানুষজন দিনভর দাঁড়িয়ে থেকে অল্প চাল পেলেও মধ্যবিত্তরা পড়েছে বিপাকে। আত্মসম্মানের কথা ভেবে তারা ওএমএসের চাল নিতে পারছে না। এদিকে ওএমএসের চাল বিতরণে অনিয়ম ও অপর্যাপ্ততা সম্পর্কে একটি ইংরেজি দৈনিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মূল সংকট হচ্ছে সরবরাহে। অনেকেই অভিযোগ করেছেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও তারা ওএমএসের চাল বা আটা পাচ্ছে না। কেন পাচ্ছে না সে ব্যাপারে একজন ওএমএস ডিলার দৈনিকটিকে জানিয়েছেন, অনেকেই বঞ্চিত হয়েছে সরবরাহের অপ্রতুলতা কারণে। তিনি বলেছেন একটি কেন্দ্র ছাড়া সবগুলোতেই একটন চাল ও এক টন আটা সরবরাহ করা হচ্ছে। সুতরাং কোন অবস্থাতেই দিনে ২ শত পরিবারের বেশি আওতায় আনা সম্ভব নয়। অথচ শতশত পরিবার প্রতিদিন অপেক্ষা করছে। এদিকে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক জানিয়েছেন, তিনি ইতোমধ্যেই পরিস্থিতির ব্যাপকতা ও গভীরতার বিস্তারিত বিবরণ দিয়ে খাদ্য ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়কে আরো অধিক কেন্দ্রখোলা ও খাদ্যবরাদ্দের জন্য আবেদন জানিয়েছেন।
খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম স্বীকার করেছেন, হাওর এলাকায় বোরো ধানের ক্ষতি হওয়ায় সাড়ে চার লাখ টনের মতো চাল নষ্ট হবে। কৃষি বিভাগ সূত্রে বলা হয়েছে, চলতি মৌসুমে হাওর এলাকায় মোট ৮ লাখ ২৫ হাজার ৫৯৮ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছিল- যা সারাদেশে মোট আবাদের ১৭ দশমিক ১৯ ভাগ। কৃষিবিভাগ আশা করেছিল, প্রায় ১৫-১৬ লাখ টন চাল উৎপন্ন হবে। বানের পানিতে সবই বিনষ্ট হয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, হাওর অঞ্চলের মানুষ এখন শহরমুখী। বাস্তবতা হচ্ছে হাওর অঞ্চলে বোরো ফসল তোলার সময় কৃষক ছাড়াও প্রান্তিক শ্রমিকদের কর্মসংস্থান হয়। নতুন ফসলকে ঘিরে চাঙ্গা হয়ে ওঠে ওই এলাকার অর্থনীতি। কৃষির আয় দিয়ে পরবর্তী এক বছর চলে মানুষের যাবতীয় অর্থনৈতিক কর্মকান্ড। ফসলহানীর ফলে হাওরের মানুষ এখন চরম বিপন্ন। কৃষক পরিবারের সন্তানদের শিক্ষা নিয়েও দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না পেলে হাওর অঞ্চলের বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়তে পারে অনেক শিক্ষার্থী। পরিস্থিতি যা তাতে দয়ার দানের উপরই হাওরবাসীকে ভরসা করতে হচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এর আগে বিভিন্ন দুর্যোগের সময়ে ক্ষতিগ্রস্তদের যে তালিকা তৈরি করা হয় সে তালিকা ধরেই দ্রæততম সময়ে তালিকা তৈরির প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে বলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
হাওর এলাকার জমি এক ফসলী। এক মৌসুমের ফসল তুলে আগামী ফসলের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। সময়টা অনেকদীর্ঘ। যে ক্ষতি হয়েছে তা তাদের পক্ষে পুষিয়ে নেয়া কোন মতেই সম্ভব নয়। সরকারের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যেই যে সহায়তার ঘোষণা দেয়া হয়েছে তাতে  প্রাথমিকভাবে এলাকায় আশার সঞ্চার হলেও আস্তে আস্তে তাতে অনিয়ম দেখা দিচ্ছে। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না, তালিকা যদি যথাযথ না হয় বা এর সাথে যদি অন্য কোন অবৈধ বা  দলাদলির প্রশ্ন থাকে তাহলে তার চাপ পড়বে সাধারণ মানুষের উপর। সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী যে পরিমাণে ওএমএসের চাল-আটা  দুর্গত অঞ্চলে থাকার কথা তা নেই। ফলে সেখানে এক প্রকার দুর্ভিক্ষাবস্থা বিরাজ করছে। খাদ্য ও নানাবিধ সংকটের মধ্যে সেখানকার দরিদ্র ও মধ্যবিত্তরা যে সংকটে পড়েছে তা থেকে উদ্ধারে সংশ্লিষ্টদের কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া দরকার। বাজারে চালের সরবরাহ বৃদ্ধি করা না গেলে এবং জনসাধারণের ক্রয়ক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব না হলে পরিস্থিতির অবনতি প্রায় অবধারিত। মানুষের হাতে টাকা পৌঁছানো প্রয়োজন। একারণে সেখানে প্রয়োজনীয় উন্নয়ন কর্মসূচী হাতে নেয়া জরুরি। যেহেতু প্রাকৃতিক অথবা প্রতিবেশির বৈরি পানিনীতির শিকারে পরিণত হয়েছে হাওর অঞ্চলের সমৃদ্ধ জনপদ তাই তাদের এই বিপদের সময় টিকিয়ে রাখা না গেলে আগামীতে তার নেতিবাচক প্রভাব হবে সুদুরপ্রসারি। সেকারণেই অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ও বাস্তবানুগ কর্মসূচী গ্রহণ করা অবশ্যক।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর