,



হাওরে দূষণ ও বিপর্যয় : বাংলাদেশের সামগ্রিক নিরাপত্তার প্রশ্ন

সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের হাওর-বাঁওড় বেষ্টিত জনপদগুলোর পরিবেশ এখন মরকের দুর্গন্ধ এবং লাখো মানুষের কান্নার আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছে। শত বছরে হাওরাঞ্চলের ইতিহাসে হয়তো অনেক বন্যা, ক্ষরা, দুর্গতি ও দুর্ভিক্ষের স্মৃতি আছে। ক্ষেতের ফসল তলিয়ে যাওয়া এবং মাছের ঘের ভেসে যাওয়ার ক্ষয়ক্ষতির অভিজ্ঞতাও নতুন নয়। তবে আকস্মিক বন্যায় লাখ লাখ হেক্টর বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যাওয়ার পর পর এতদাঞ্চলের সব হাওর-বাঁওড়, বিলের হাজার হাজার টন মাছ মরে ভেসে ওঠার এমন জৈব-প্রাকৃতিক বিপর্যয় অতীতে আর কখনো দেখা যায়নি। শুধু মাছ নয়, সব ধরনের জলজ প্রাণী ও হাঁস মরে ভেসে থাকার চিত্র পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। পানি, মাছসহ জলজ প্রাণী, উদ্ভিজ্জ, পশুপাখি ও মানুষ একই প্রতিবেশ-জীবপ্রকৃতি ও খাদ্য-শৃঙ্খলে আবদ্ধ। হাওরের ধান এবং মাছ ধ্বংস হয়ে গেলে সেখানকার খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ভেঙে পড়তে বাধ্য। গত বরিবার পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টে জানা যায়, নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরি, মদন উপজেলার ৯৫টি হাওরের মাছ ধরা ও খাওয়া নিষিদ্ধ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। হাওরের লাখ লাখ মানুষ বোরো ধান এবং মাছ ধরেই জীবিকানির্বাহ করে থাকে। সম্প্রতি মেঘালয় থেকে আসা ঢলে হাওরের লাখ লাখ হেক্টর জমির ধান তলিয়ে এবং মাছের মড়ক দেখা দেয়ার পর সেখানে এখন দুর্ভিক্ষ ও হাহাকার শুরু হয়েছে। হাওরের সর্বস্ব হারানো কৃষক জেলেরা রাষ্ট্রের কাছে ত্রাণ সহযোগিতার দাবি জানাচ্ছে। তারা নিজেদের অঞ্চলকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানাচ্ছে। তবে পত্রিকায় প্রকাশিত একটি রিপোর্টে জানা যায়, সরকারের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের সচিব নাকি বলেছেন, দুর্গত এলাকা ঘোষণা করতে হলে সেখানকার অর্ধেক মানুষ মরতে হবে। মহামারী দেখা দিতে হবে। কাকে বলে মহামারী? ক্ষেতের ফসল তলিয়ে, বিষাক্ত পানিতে মাছ-পশুপাখি মরে ভেসে ওঠার পর একইভাবে সেখানকার জনসংখ্যার অর্ধেক মরে গেলে তবেই তা দুর্গত এলাকা হিসেবে ঘোষিত হতে পারে, এমনটা আমাদের জানা ছিল না। লাখ লাখ মানুষই যদি মরে সাফ হয়ে যায় তবে কাদের জন্য দুর্গত এলাকা ঘোষণা করা হবে? আর কিছু দিন বাদেই হাওরের বোরো ধানগুলো গোলায় উঠত। দেশের মোট ধান উৎপাদনের অন্তত ৫ ভাগ ধান হাওরাঞ্চলে উৎপাদিত হয়। আর উজানের ভারতের বাঁধ নির্মাণ ও পানি প্রত্যাহারের কারণে দেশের অধিকাশ নদ-নদীতে নাব্যতা সংকট ও প্রাকৃতিক জলাশয়গুলো পানিশূন্য হয়ে পড়ায় এখন মিঠাপানির মাছের সবচেয়ে বড় জোগানদাতাই হচ্ছে সিলেট, নেত্রকোনা, কিশোরগঞ্জ ও সুনামগঞ্জের হাওরের মৎস্যজীবীরা। একই সময়ে অকস্মাৎ সেখানকার লাখ লাখ টন ধান ও হাজার হাজার টন মাছ ধ্বংসের বিরূপ প্রভাব বাংলাদেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা ও জাতীয় অর্থনীতিতেও পড়তে বাধ্য।
উজানের ঢলে হাওরে ফসলহানির ঘটনা কমবেশী প্রতিবছরই ঘটে থাকে। উজানের ঢলে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধগুলো তলিয়ে যাওয়া বা ভেঙে যাওয়ার সাংবাৎসরিক আক্ষেপও সাধারণ ঘটনা। এ খাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকার বাজেট খরচ করার পরও অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন দেখা যায় না। প্রতি বছরই বর্ষার আগে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ তড়িঘড়ি করে মেরামতে হাত দিতে দেখা যায়, কাজ শেষ হওয়ার আগেই বন্যার পানিতে তলিয়ে উন্নয়ন বা সংস্কারের কোনো চিহ্নই আর থাকে না। এভাবেই প্রতি বছর জনগণের ট্যাক্সের শত শত কোটি টাকার ধারাবাহিক অপচয় ও লুটপাট চলছে। আর উজানের ঢলে লুট হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের সম্ভাবনা ও নিরাপত্তা। বন্যার পাশাপাশি মৎস্য, জলজ প্রাণীর মড়কের মধ্য দিয়ে এবার বাংলাদেশের জন্য যুক্ত হলো মহাবিপদ সংকেত। গোলায় ওঠার দুই সপ্তাহ আগে লাখ লাখ কৃষকের ধান তলিয়ে যাওয়ার পর পুরো হাওরাঞ্চলে সারা বছর ধরে চলা অন্যতম প্রাকৃতিক মৎস্যের উৎসে মারাত্মক দূষণের কারণে সেখানকার জনপদে দুর্ভিক্ষাবস্থা সৃষ্টি করেছে। ইউরেনিয়াম দূষণের আশঙ্কা যদি সত্যি বলে প্রমাণিত হয়, তা বাংলাদেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য এবং অর্থনীতির জন্য চরম আঘাত হিসেবে বিবেচিত হবে। কারণ ইউরেনিয়ামের তেজষ্ক্রিয় দূষণ ক্ষরা, বন্যা বা ভ‚মিকম্পের মতো কোনো সাময়িক সংকট নয়, যুগ যুগ ধরে এ ধরনের রেডিয়েশন এবং কনটেমিনেশন মাটিতে, পানিতে রয়ে যায় এবং প্রাণ-প্রকৃতিতে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে। ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের বিক্ষুব্ধ উদ্বেগের সাথে এবার যুক্ত হলো আমাদের পানিতে ভারতের পারমাণবিক আগ্রাসনের বাস্তব বিপর্যয়। তবে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে শুরু হওয়া মাছের মড়ক সম্পর্কে আমাদের সরকার, মিডিয়া,  পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভ‚মিকা দেখে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে অভাবনীয় বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। যেখানে উজানের ঢলে ভারত থেকে ভেসে আসা বন্যহাতি নিয়ে আমাদের মিডিয়াগুলোকে দিনের পর দিন লাইভ আপডেট প্রচার করতে দেখা গেছে, সেখানে উজানের পানির সাথে ভেসে আসা কথিত পারমাণবিক দূষণে হাজার হাজার টন মাছ ও জলজ প্রাণ-প্রকৃতি বিনষ্ট হওয়া ছাড়াও তাৎক্ষণিকভাবেই দেশের হাজার হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক ক্ষতিসাধিত হলো, তা নিয়ে মিডিয়াগুলোর নীরবতা ও দায়সারা গোছের ভ‚মিকা দেশের মানুষ মেনে নিতে পারছে না। মেইনস্ট্রিমমিডিয়ার এমন ভ‚মিকার জবাব ও বিক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া সাধারণ মানুষ দিচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ভারতের মেঘালয়ের ওপেন পিট ইউরেনিয়াম মাইনিংয়ের পরিত্যক্ত খনির সাথে মেঘালয়ের রানিকর নদীর সংযোগ এবং রানিকর নদীর পানির রং পরিবর্তনের অভিযোগে সেখানকার পরিবেশবাদী ও রাজনৈতিক মহলে অনেক দিন ধরেই বেশ হইচই হলেও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্টদের নীরবতা রহস্যজনক। এ কারণে হাওরের পানি দূষণে মাছে মড়ক লাগার পর অনেক দেরিতে অকুস্থলে যাওয়া বিশেষজ্ঞরা তাৎক্ষণিকভাবে যেসব রিপোর্ট দিচ্ছেন তা সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা পাচ্ছে না বলেই মনে হচ্ছে।
গত বছর জুলাইয়ের ৭ তারিখে ইন্ডিয়া টুডে পত্রিকায় প্রকাশিত একটি রিপোর্টে বলা হয়, মেঘালয়ে ইউরেনিয়াম খনি থেকে উন্মুক্ত পদ্ধতিতে ইউরেনিয়াম উত্তোলনে ভারত সরকারের প্রতিষ্ঠান ইউরেনিয়াম করপোরেশন অব ইন্ডিয়া লিঃ (ইউসিল)-এর যে কর্মযজ্ঞ চলছে তার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী মুকুল সাংমা। রাজ্য সরকারের অনুমোদন বা সংশ্লিষ্টতা ছাড়াই এই ইউরেনিয়াম প্রকল্প গ্রহণ করা হয় বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। মেঘালয়ের খাসি পাহাড়ের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশে অবস্থিত খনি থেকে বছরে ৩ লাখ ৭৫ হাজার মেট্রিক টন ইউরেনিয়াম আকর উত্তোলনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল ইউসিল কর্তৃপক্ষ। মেঘালয়ের পরিবেশবাদী, ছাত্র ও নাগরিক সমাজের অবস্থান ইউরেনিয়াম খনির বিরুদ্ধে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর প্রতিক্রিয়া থেকে বোঝা যায়, কেন্দ্রীয় সরকারের দেয়া ছাড়পত্র অনুসারে ইউসিল রাজ্য সরকার, স্থানীয় প্রতিনিধিদের অগোচরে অনেকটা গোপনীয়তায় এই ওপেন পিট ইউরেনিয়াম মাইনিং শুরু করেছে। বাইশে জুলাই বিজনেস স্টান্ডার্ড পত্রিকার অনলাইনে প্রকাশিক রিপোর্টে বলা হয়, খাসি পাহাড়ে উন্মুক্ত পদ্ধতির ইউরেনিয়াম খনির বিরুদ্ধে পরিবেশবাদী ও ছাত্র সমাজের প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মুকুল সাংমা। সে সমাবেশে দেয়া বক্তৃতায় তিনি বলেন, উন্মুক্ত ইউরেনিয়াম পিট মাইনিং সম্পর্কে সরকার ও ইউসিলকে সঠিক ব্যাখা তুলে ধরতে হবে। উন্মুক্ত ইউরেনিয়াম খনির প্রেক্ষাপটে জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত নিরাপত্তার কার্যকর ব্যবস্থা সম্পর্কে সন্তোষজনক সমাধান না পাওয়া গেলে সেখানকার রাজ্য সরকার এবং জনগণ খনিতে যাতায়াত এবং ইউরেনিয়াম উত্তোলনের প্রস্তুতিমূলক উন্নয়ন প্রকল্প ইউসিলকে বাস্তবায়ন করতে দেয়া হবে না বলে তিনি জানিয়েছিলেন। পরবর্তীতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে খাশি পাহাড়ের ইউরেনিয়াম খনি সংলগ্ন রানিকর নদীর পানির রং পরিবর্তন ও ব্যাপকহারে মাছ মরে ভেসে ওঠার জন্য মেঘালয়ের খাশি স্টুডেন্ট ইউনিয়নের পক্ষ থেকে কথিত ইউরেনিয়াম খনিকে দায়ী করা হয়। তবে সাম্প্রতিক বন্যার পর মেঘালয় সীমান্তবর্তী বাংলাদেশের হাওর বাঁওড়গুলোতে ব্যাপকহারে মাছের মড়ক লাগার ঘটনার সাথে ইউরেনিয়াম খনির কোনো যোগসূত্র নেই বলে দাবি করেছেন মেঘালয়ের খনিজ বিভাগের দায়িত্বে থাকা উপ-মুখ্যমন্ত্রী বিন্দো এম লানং। তার মতে, হাওরের পানিতে ইউরেনিয়াম দূষণ ঘটলে শুধু মাছ নয়, অন্যান্য জলজ প্রাণীও মারা যেত। বিন্দো এম লানং-এর সাথে দ্বিমত না করেই এ সিদ্ধান্তে আসা যায়, টাঙ্গুয়ার হাওরসহ সিলেট সুনামগঞ্জের হাওর ও বিলগুলোতে শুধু মাছ নয়, কাঁকড়া, জোঁকসহ নানা ধরনের জলজ প্রাণী এবং অসংখ্য হাঁসও মরে ভেসে থাকতে দেখা যাচ্ছে। আর আমাদের তথাকথিত বিশেষজ্ঞরা চটপট বলে দিচ্ছেন, পানিতে অক্সিজেনের অভাব থাকায় মাছ মরতে পারে। তাহলে হাঁসগুলো মারা গেল কেন? হাঁসগুলো তো পানির অক্সিজেন নিয়ে বেঁচে থাকে না। পানিতে মারাত্মক রাসায়নিক দূষণ না থাকলে অক্সিজেনের অভাবে মরে যাওয়া মাছ খেয়ে হাঁসগুলো মরে যাওয়ার কোনো কারণ আছে কিনা বিশেষজ্ঞরাই বলতে পারবেন। তবে বাংলাদেশে পানিদূষণ ও জলজ প্রাণীর মড়ক লেগে ক্ষয়ক্ষতির জন্য সন্দেহের তীর ভারতের উন্মুক্ত ইউরেনিয়াম খনির দিকে নির্দেশ করার পর মেঘালয় সরকার এবং স্থানীয় প্রতিবাদকারীদের মুখ নিশ্চিতভাবেই বন্ধ হয়ে যাবে। ওরা হয়তো নিজ দেশের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের অভিযোগ বা ক্ষতিপূরণের দায় গ্রহণে সহায়ক হতে চাইবে না। তবে বাংলাদেশের সরকার এবং বিশেষজ্ঞ এবং গণমাধ্যম কী ভ‚মিকা পালন করে তা দেখতে উদগ্রীব হয়ে আছে দেশের জনগণ। হাওরে হাজার হাজার টন মাছ মরছে, মাছের পোনা বেঁচে থেকে বড় হওয়ার গুণাগুণও এখন পানিতে নেই। তলিয়ে যাওয়া ধানগাছ পচে সৃষ্ট অ্যামোনিয়া গ্যাসে এমন মড়ক লাগা ও পানি বিষাক্ত হওয়ার দাবি বিশ্বাসযোগ্যতা পাচ্ছে না। সার্বিক অবস্থা এবং নেপথ্যের কারণ সম্পর্কে জনগণ সঠিক ব্যাখ্যা দাবি করছে।
অনেক সীমাবদ্ধতা ও পশ্চাৎপদতা সত্তে¡ও ভারত দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বড় সামরিক-অর্থনৈতিক পরাশক্তি। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা লাভের ক্ষেত্রে ভারতের অসামান্য অবদান থাকলেও বাংলাদেশের মৌলিক স্বার্থের প্রশ্নে ভারতকে কখনো উদার বন্ধুত্বপূর্ণ ভূমিকায় দেখা যায়নি। ফারাক্কা বাঁধ, গজলডোবা বাঁধ, আন্তঃনদী সংযোগ প্রকল্প ও তিস্তার পানি চুক্তির মতো বিষয়গুলো থেকে তা অনেকটাই স্পষ্ট। এদেশের মানুষ লাখো প্রাণের বিনিময়ে পিন্ডির দাসত্ব শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীনতা অর্জন করেছিল দিল্লির বশংবদ হওয়ার জন্য নয়। আঞ্চলিক পরাশক্তি হওয়ার জন্য ভারত পরমাণু বোমার অধিকারী হয়েছে, সেই সাথে তার সমরাস্ত্র ও সমর প্রযুক্তিকে ক্রমাগত সমৃদ্ধ করে চলেছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কখনো উদ্বেগ প্রকাশ করেনি, নিরাপত্তা হুমকির কথা বলেনি। কিন্তু বাংলাদেশ যখন তার সমুদ্র সম্পদ ও মেরিটাইম বাউন্ডারির নিরাপত্তার জন্য চীন থেকে দুটি সাবমেরিন সংগ্রহ করল, তখন ভারতের সামরিক-বেসামরিক কর্তৃপক্ষ যেন মাথাব্যথায় অস্থির হয়ে উঠল। গত ৪৬ বছরেও ভারতের কোনো প্রতিরক্ষা মন্ত্রী বাংলাদেশে আসেননি। চীন থেকে সাবমেরিন নিয়ে আসার পর ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পারিকর তড়িঘড়ি করে ঢাকায় এসে হাজির হলেন কার্যত তার উদ্বেগ জানাতে এবং বাংলাদেশকে কথিত নিরাপত্তা চুক্তিতে রাজি করাতে। প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের আগে এসব নিয়ে অনেক লেখা হয়েছে। আজকের বিষয় ভিন্নতর। চীন, ভারত বা পাকিস্তান পারমাণবিক শক্তিধর হলেও বাংলাদেশের মানুষ তাদের ভয়ে কখনো ভীত নয়। বিশ্বের এক নম্বর সামরিক-রাজনৈতিক পরাশক্তি বিশাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশে ক্ষুদ্র কিউবা বা মেক্সিকো যেভাবে নিজেদের রাজনৈতিক অর্থনৈতিক স্বাতন্ত্র্য নিয়ে টিকে আছে, চীন, ভারত বা পাকিস্তানের পাশে বাংলাদেশও নিজস্ব রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য নিয়ে টিকে থাকতে চায়। তবে ভারত তার আধিপত্যবাদী নীলনকশায় পরোক্ষভাবে বাংলাদেশের অস্তিত্বের প্রশ্নে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে চাইছে বলে বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধারণা। আন্তর্জাতিক নদী আইন অমান্য করে অভিন্ন নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণ ও ব্যাপকহারে পানি প্রত্যাহার করে ভাটির বাংলাদেশকে শুকিয়ে মারার মহাপরিকল্পনা নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে ভারত। এক তিস্তার পানি আটকে দিয়ে তিস্তা অববাহিকায় পরিবেশগত বিপর্যয় সৃষ্টির পরও তিস্তার পানি চুক্তি নিয়ে ভারতের টালবাহানা বেড়েই চলেছে। ভারতের সাথে অন্তত ৮টি দেশের আন্তর্জাতিক সীমান্ত রয়েছে, পাকিস্তান বা চীনের মতো বৈরী রাষ্ট্র থেকে ভারতে অনুপ্রবেশের অভিযোগ শোনা গেলেও কখনো এসব রাষ্ট্রের নাগরিকদের পাখির মতো গুলি করে মারা হয়েছে এমন কোনো রিপোর্ট পাওয়া যায় না। কিছু দিন আগে একজন নেপালি নাগরিক ভারতীয় সীমান্তরক্ষীদের হাতে নিহত হওয়ার পর ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক দুঃখ প্রকাশ করা হয়েছিল। ব্যতিক্রম শুধু বাংলাদেশ। বিএসএফের গুলিতে প্রায় প্রতিদিনই বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা করা হচ্ছে। এরপরও বাংলাদেশ ও ভারত সরকার কথিত বন্ধুত্বের উচ্চ শিখরে আরোহণ করে চলেছে। পানি আটকে দেশটাকে উষর মরুভ‚মিতে পরিণত করা, সীমান্ত নদীগুলোকে ভাঙনের মুখে ঠেলে দিয়ে নদীর গতিপথ পরিবর্তন করে বাংলাদেশের হাজার হাজার হেক্টর ভূ-খন্ড ভারতের দখলে নিয়ে যাওয়া, যৌথ নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণের বিপর্যয় রোধে গঙ্গা ব্যারাজ নির্মাণে ভারতের বাধা ইত্যাদি বিষয় আমাদের যেন ইতোমধ্যে গা-সওয়া হয়ে গিয়েছিল। হাওরের পানিতে ইউরেনিয়াম দূষণ ঘটেছে কিনা আমরা এখনো নিশ্চিত নই। তবে যে দূষণই ঘটে থাকুক ক্ষয়ক্ষতি অর্থের মানদন্ডে নিরূপণ করা সম্ভব নয়। আর যদি সত্যিই আমাদের পানিতে ভারতের ইউরেনিয়াম দূষণের ঘটনা ঘটে থাকে, তবে এটাই প্রমাণিত হবে যে, পরোক্ষভাবে বাংলাদেশই হলো বন্ধুরাষ্ট্র ভারতের পারমাণবিক শক্তির প্রথম শিকার। এ ধরনের অভিযোগ স্রেফ রাজনৈতিক দলাদলি বা বেøইম গেমের বিষয় নয়। দেশের পানি, মাটি, খাদ্য নিরাপত্তা, জনস্বাস্থ্য তথা ১৬ কোটি মানুষের সামগ্রিক অস্তিত্বের প্রশ্ন। হাওরে সাম্প্রতিক দূষণ বিপর্যয়ের পেছনে যে কারণই থাক, এ থেকে বোঝা গেল উজান থেকে ঠেলে দেয়া রাসায়নিক বা পারমাণবিক বর্জ্যে যে কোনো সময় যে কোনো মাত্রার বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে পারে বাংলাদেশ। আন্তর্জাতিক নদীর পানি বন্টন এবং পানির স্বাভাবিক গুণাগুণ বজায় রাখার গ্যারান্টি আন্তর্জাতিক আইনে নিশ্চিত করা আছে। তা না হলে বিশ্বের যে কোনো রাষ্ট্র উজানের রাষ্ট্রের খামখেয়ালিপনার শিকার হয়ে বিরান ভ‚মিতে পরিণত হতে পারে। এখন দেশের ১৬ কোটি মানুষ উদ্বিগ্ন আতঙ্কিত। আন্তর্জাতিক নদীর উজানে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভাটির বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ভারত বাংলাদেশের বন্ধুত্ব আশা করতে পারে না।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর