,



নৈতিক স্খলন বাহিনীর মনোবল দুর্বল করে দেয় র‌্যাবের দরবার হলে প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশের সাধারণ নাগরিকরা যেন অহেতুক নির্যাতনের শিকার না হয়, সেজন্য র‌্যাব সদস্যদের সজাগ থাকতে হবে। তিনি বলেছেন, জনগণের যেন কোনো রকম কষ্ট না হয়, সেদিকে সকলের দৃষ্টি দিতে হবে।
র‌্যাব সদস্যদের শৃঙ্খলা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, প্রতিটি সদস্যকে দেশপ্রেম, সততা, কর্তব্যনিষ্ঠা, দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের মনোভাব নিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে। মনে রাখতে হবে, আপনারা একটি শৃঙ্খলা-বাহিনীর সদস্য। নৈতিক স্খলন যে কোন বাহিনীর মনোবল দুর্বল করে দেয়। মনে রাখবেন, জনগণের পয়সায় আমাদের-আপনাদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হয়। আমরা সকলেই জনগণের সেবক। সেই জনগণ যেন কোনভাবেই নিগৃহীত না হয়।
পুলিশের অধীন এলিট ফোর্স র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়নের ত্রয়োদশ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে আয়োজিত দরবারে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। র‌্যাব সদস্যদের উদ্দেশে শেখ হাসিনা বলেন, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করাই আপনাদের মূল লক্ষ্য। আইন-কানুন এবং নিয়ম-নীতি মেনে আপনাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করবেন- এটাই আমাদের প্রত্যাশা। শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ পালন করা একটি বাহিনীর সদস্যদের জন্য অবশ্য পালনীয় কর্তব্য।
কুর্মিটোলায় র‌্যাব সদর দপ্তরে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মঞ্চে ছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল (অবঃ) তারেক আহমেদ সিদ্দিক, স্বরাষ্ট্র সচিব কামাল উদ্দিন আহমেদ, পুলিশ মহাপরিদর্শক এ কে এম শহীদুল হক এবং র‌্যাব মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ।
প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের শুরুতেই সিলেটের জঙ্গি আস্তানা ‘আতিয়া মহলে’ অভিযান পরিচালনার সময় বিস্ফোরণে নিহত র‌্যাবের গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদসহ বিভন্ন সময়ে দায়িত্ব পালনকালে নিহত এ বাহিনীর সদস্যদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন।
প্রধানমন্ত্রী জঙ্গি দমনে সাফল্য এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ ভূমিকার জন্য র‌্যাব সদস্যদের ধন্যবাদ জানান । তিনি বলেন, দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় র‌্যাব যথেষ্ট সাফল্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে। অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার, সন্ত্রাস, জঙ্গি, চরমপন্থি দমনসহ সকল ধরনের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে র‌্যাব অগ্রণী ভূমিকা পালন করে চলেছে।
জঙ্গিবিরোধী অভিযানে র‌্যাবের ভূমিকার কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, র‌্যাব সদস্যরা জঙ্গি সংগঠনের শীর্ষ পর্যায়ের নেতাসহ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জঙ্গি সদস্যকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করেছে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র, বোমা ও বিস্ফোরক দ্রব্য।
এ অনুষ্ঠানে জঙ্গিবাদকে ‘বিশ্বব্যাপী নতুন উপসর্গ’ হিসেবে বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমরা জঙ্গিবাদ নির্মূলে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। কোনো ধরনের জঙ্গি কর্মকান্ডই আমরা বরদাশত করব না।
র‌্যাবসহ সব আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে জঙ্গিবিরোধী বিশেষ অভিযান অব্যাহত রাখার নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ ক্ষেত্রে অন্যান্য দেশের চেয়ে বাংলাদেশ ‘কার্যকর ভূমিকা’ রেখেছে।
তিনি বলেন, রংপুরে জাপানি নাগরিক এবং ঢাকায় ইতালীয় নাগরিককে ‘পরিকল্পিতভাবে’ হত্যা করা হয়েছিল দেশের মর্যাদা নষ্ট করার জন্য। ভবিষ্যতে কেউ যেন এ ধরনের কাজ করার সাহস না পায়, সে ব্যবস্থা নিতে হবে।
সুন্দরবনের জলদস্যুদের আত্মসমর্পণকে ‘যুগান্তকারী পদক্ষেপ’ হিসেবে বর্ণনা করে প্রধানমন্ত্রী এ কাজে র‌্যাবের ভূমিকার প্রশংসা করেন। তিনি বলেন, সুন্দরবন এখন একটি ‘নিরাপদ জনপদ। শুধু তাই নয়, দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের চরমপন্থি দমনেও র‌্যাব কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়েছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক চরমপন্থিকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। র‌্যাব তাদের কাছ থেকে উদ্ধার করেছে বিপুল পরিমাণ অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্র।
প্রধানমন্ত্রী র‌্যাব সদস্যদের উদ্দেশ্যে বলেন, এ বাহিনীর নতুন নতুন ব্যাটালিয়ন উদ্বোধন করা হয়েছে। র‌্যাবের অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও সুযোগ-সুবিধা বহুগুণে বৃদ্ধি করা হয়েছে। র‌্যাব সদরদপ্তর এবং র‌্যাব ট্রেনিং স্কুলসহ সকল ব্যাটালিয়নের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। র‌্যাব সদরদপ্তর, র‌্যাব-১৩ এবং ১৪ ব্যতীত সকল ব্যাটালিয়নের অবকাঠামো নির্মাণ কাজ একনেক-এ অনুমোদিত হয়েছে। ২০১৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত র‌্যাব-এর বাজেট প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে।
অপরাধী শনাক্ত করতে র‌্যাবের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সরকারের পদক্ষেপ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ বাহিনীতে অস্পষ্ট ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ, টেলিফোন সেট ট্রাকিং-এর যন্ত্রসহ অত্যাধুনিক সরঞ্জামাদি সংযোজন করা হয়েছে। র‌্যাবের অপারেশনাল শক্তি বৃদ্ধি করতে দু’টি হেলিকপ্টারসহ প্রয়োজনীয় যানবাহন বরাদ্দ দিয়েছি আমরা। ফলে, র‌্যাব জল, স্থল ও আকাশপথে দ্রুত আভিযান কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা অর্জন করেছে। পরিণত হয়েছে একটি ত্রিমাত্রিক বাহিনীতে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বাহিনীর মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ। এরপর র‌্যাবের বিভিন্ন অভিযান, এ বাহিনীর স্পেশাল ফোর্স এবং সুন্দরবনে জলদস্যুবিরোধী অভিযানের ওপর তিনটি প্রামাণ্যচিত্র দেখানো হয়। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে র‌্যাব-৯ এর জন্য নবনির্মিত হেডকোয়ার্টার্স ভবনেরও ফলক উন্মোচন করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, আওয়ামী লীগ যখনই সরকার গঠন করেছে, তখনই দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যাপক উন্নয়ন করেছে। দেশের আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা খাতে বরাদ্দকৃত অর্থকে আমরা ব্যয় নয়, বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করি।
তিনি বলেন, অপহরণের পর মুক্তিপণ আদায় করে- এ ধরনের অপরাধীদের বিরুদ্ধে র‌্যাব কার্যকর অভিযান পরিচালনা করে আসছে। পাশাপাশি মাদক পাচার প্রতিরোধ এবং এখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য সংখ্যক অপহৃত শিশু ও ব্যক্তিকে তাদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।
দেশীয় অসাধু ব্যবসায়ীর পাশাপাশি বিদেশী চোরাচালানী, জাল মুদ্রা ও পাসপোর্ট প্রস্তুতকারী এবং অবৈধ ভিওআইপি বিরোধী অভিযান পরিচালনা করে রাষ্ট্রীয় রাজস্ব বৃদ্ধিতে এই বাহিনীর অবদানকেও তিনি স্মরণ করেন। সরকার প্রধান বলেন, র‌্যাব জননিরাপত্তায় হুমকি ও আতঙ্ক সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা এবং ভেজাল বিরোধী অভিযান জোরদার করে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করে জনজীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।
তিনি বলেন, নিরীহ কোমলমতি যুবকদের প্রলোভন দেখিয়ে বা ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে জঙ্গিবাদের দিকে আকৃষ্ট করা হচ্ছে। এজন্য দমন কার্যক্রমের পাশাপাশি জনসচেতনতা তৈরিতে আমাদের মনোযোগ দিতে হবে। র‌্যাব স¤প্রতি ‘কতিপয় বিষয়ে জঙ্গিবাদীদের অপব্যাখ্যা এবং পবিত্র কোরআনের সংশ্লিষ্ট আয়াত ও হাদীসের সঠিক ব্যাখ্যা’ শীর্ষক একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছে উল্লেখ করে এই উদ্যোগের প্রশংসা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। এ পুস্তক ব্যাপক প্রচারের উদ্যোগ নিন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি নিজেও ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে দেশের সকল জেলার সাধারণ মানুষ, ইমাম, স্কুল শিক্ষক, মুক্তিযোদ্ধাসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে কথা বলেছেন। জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জনসচেতনতা তৈরির আহ্বান জানিয়েছেন। আমরা যে যেখানে আছি সেখান থেকেই জঙ্গিবাদের মোকাবেলা করতে হবে। তা না হলে আমাদের সব অর্জন বিনষ্ট হয়ে যাবে। এর পাশাপাশি তিনি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়াতে এবং প্রতিকার নয়, প্রতিরোধের দিকেই বেশি নজর দেয়ার আহবান জানান।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর