,



দিল্লি দাঙ্গা হিন্দু-মুসলিম বিভেদের ক্ষত আরও গভীরে

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ দিল্লির এক ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা যমুনা বিহার। সেখানে বহু বছর ধরে হিন্দু ও মুসলমানরা মিলেমিশে শান্তিতে বসবাস ও কাজ করে আসছিল। তবে গত মাসে দিল্লি জুড়ে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ার পর তাদের দীর্ঘদিনের সম্পর্কে চিড় ধরেছে। কাচের মতো ভেঙে গেছে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস। বলা বাহুল্য এই দাঙ্গায় উত্তেজনা ছড়িয়েছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী এজেন্ডা, যার জোরে তিনি ক্ষমতায় এসেছেন এবং দীর্ঘদিন ধরে ভারতজুড়ে এই এজেন্ডা বাস্তবায়নেরই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।হিন্দু অধ্যুষিত যমুনা বিহারে এখনও দাঙ্গার চিহ্ণ স্পষ্ট। আর এখানকার হিন্দু অধিবাসীরা গত মাসের শেষ দিকে হওয়া ওই দাঙ্গার জন্য সংখ্যালঘু মুসলিমদের দায়ী করছে। এর প্রতিমোধ হিসাবে তারা মুসলিম ব্যবসায়ী বর্জন করছে এবং মুসলিম শ্রমিকদের কাজে নিতে অস্বীকার করছেন।

মুসলমানরা বলছেন, তাদের এমন এক সময়ে চাকরির সন্ধানে নামতে হয়েছে যখন করোনভাইরাস মহামারি ভারতের অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

যমুনা বিহারে পেইন্ট এবং বাথরুম ফিটিংসের দোকানের মালিক যশ ধিঙ্গরা। তিনি রয়টার্সকে বলেন, ‘আমি আর কখনও মুসলমানদের সাথে কাজ করবো না। আমি দোকানের জন্য নতুন কর্মচারী নিয়েছি, তারা সবাই হিন্দু।’ তিনি কথা বলছিলেন একটি সরু গলিতে দাঁড়িয়ে যেখানে ২৩ ফেব্রুয়ারি দাঙ্গার সহিংসতার চিহ্ণ এখনও স্পষ্ট।

দিল্লির এবারের দাঙ্গাকে কয়েক দশক ধরে ভারতের রাজধানীতে সংঘটিত সবচেয়ে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক সহিংসতা হিসাবে উল্লেখ করা হচ্ছে যার পেছনে ছিল গত বছর চালু করা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন। সমালোচকরা বলছেন, ওই আইনের উদ্দেশ্য হচ্ছে ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিমদের আরও প্রান্তিক ও নিঃসঙ্গ করে তোলা।

দীর্ঘ ৪ দিন ধরে চলা (২৩-২৬ ফেব্রুয়ারি) ওই দাঙ্গায় নিহত হয়েছেন কমপক্ষে ৫৩ জন এবং আহত হয়েছেন আরও ২০০ জনেরও বেশি মানুষ, যাদের বেশিরভাগ মুসলিম।

ধিঙ্গরা বলেন, ওই সহিংসতা যমুনা বিহারকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। পাড়াজুড়ে ভাঙা দরজাসহঘরগুলি, ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা পাথর এবং ইটের টুকরো (দাঙ্গায় অস্থায়ী অস্ত্র হিসাবে ব্যবহৃত ) এবং আগুনে গলে যাওয়া বিদ্যুতের তারগুলি গলিত এখনও সেই দাঙ্গার ভয়াবহতার সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

তিনি বলেন, জেলার বেশিরভাগ হিন্দু বাসিন্দা এখন মুসলিম কর্মীদের বর্জন করছে, যা রান্নাঘর ও ক্লিনার থেকে শুরু করে যন্ত্রপাতি ও ফল বিক্রেতাদের সবাইকে প্রভাবিত করছে।

ধিংরা দাবি করেন, ‘আমাদের কাছে অসংখ্য প্রমাণ রয়েছে যে মুসলমানরাই সহিংসতা শুরু করেছিল এবং এখন তারা আমাদের উপর দোষ চাপাচ্ছে।’ এরপর তিনি বলেন, ‘তারা (মুসলিম) বরাবরই ক্রিমিন্যাল মাইন্ডেড মানুষ এবং এটাই তাদের আসল পরিচয়।’

রয়টার্সের রিপোর্টার উত্তর-পূর্ব দিল্লির যে আটটি অঞ্চলের যে ২৫ জন হিন্দুর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন তাদের সবারই মনোভাব অনেকটা একই রকম। এছাড়া রয়টার্স প্রায় ৩০ জন মুসলমানের সাথেও কথা বলেছে, তাদের বেশিরভাগ জানিয়েছে, হিন্দুরা তাদের সাথে কাজ বন্ধ করে দিয়েছে।

দিল্লির ৪৫ বছরের গৃহবধূ সুমন গোয়েল যিনি ২৩ বছর ধরে মুসলিম প্রতিবেশীদের বসবাস করে আসছেন, সাম্প্রদায়িক সহিংসতা তাকে হতবাক করে দিয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এটা তো আমার জন্য খুবই কষ্টকর যে,বাড়ি থেকে বের হয়ে একজন মুসলিম নারীকে দেখে মুখ ফিরিয়ে নিলাম এবং হাসলাম না।’

তিনি মনে করেন, তার মুসলিম প্রতিবেশীরদেরও একই রকম অনুভূতি হচ্ছে। তবে তিনি বর্তমানে যে পরিস্থিতি চলছে তাতে নিজেদের মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখাই সবচেয়ে ভালো।

দাঙ্গায় ক্ষতিগ্রস্থ দিল্লির আরেক এলাকা ভজনপুরা। সেখানকার এক হিন্দু মালিকের কারখানায় তৈরি জুতা বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। কিন্তু তার জুতার দোকানটি ধ্বংস করে দিয়েছে দাঙ্গাকারী হিন্দুরা। এরপর তাকে উচ্ছেদ করে ওই দোকানটি আরেকজন হিন্দু ব্যবসায়ীকে দেওয়া হয়েছে।

তাসলিম বলেছিলেন, ‘আমি মুসলমান এটাই আমার একমাত্র দোষ। আর এ কারণেই আমার সঙ্গে এমনটা করা হলো।’

তাসলিম একা নন, অনেক মুসলমানই কট্টরপন্থী হিন্দু দাঙ্গাকারীদের আক্রোশের শিকার হয়েছেন। আর তাদের অপরাধ তারা গত বছরের শেষ নাগাদ মোদি সরকারের প্রণীত নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ওই বিতর্কিত আইনের বিরুদ্ধে ভাত জুড়ে হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ প্রকাশ করে চলেছে।

মধ্য দিল্লির মুসলিম গবেষক ও চিন্তাবিদ আদিল বলেন, ‘এখন আমরা নতুন এই অবস্থার সঙ্গে অভ্যস্থ হয়ে উঠেছি। এখন আমরা ক্যারিয়ার, চাকরি ও ব্যবসাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি না। এখন আমাদের কাছে নিরাপত্তা আর বেঁচে থাকাটাই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।’

তিনি হিন্দুদের প্রতিশোধের ভয়ে নিজের তার পুরো নাম বলার সাহস পাননি।

২০১৪ সালে মোদীর বিশাল নির্বাচনী জয়ের দ্বারা উত্সাহিত, কট্টরপন্থী গোষ্ঠীগুলি একটি হিন্দু-প্রথম এজেন্ডা অনুসরণ করতে শুরু করেছিল, যা দেশের মুসলিম সংখ্যালঘুদের ব্যয়ে এসেছিল।

২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদি বিপুল ভোটে সরকার গঠন করার পর থেকেই ছন্দ হারিয়েছে ভারতের সাম্পদায়িক সম্প্রীতির চিরচেনা চিত্রটি। কেননা সংখ্যাগুরু হিন্দু ভোটে ক্ষমতায় আসা বিজেপির এজন্ডা ছিল হিন্দু তোষণ। যার ফলে স্বভাবতই সামাজিক ও আর্থিক শোষণের মুখে পড়েন সেখান মুসলিম সম্প্রদায়্

সাম্প্রতিক বছরগুলিতে হিন্দুদের দ্বারা পবিত্র প্রাণী হিসাবে স্বীকৃত গরু পাচারের অভিযোগে হত্যা করা হয়েছে বহু মুসলিমকে। ভারতের অনেক রাজ্যে গরু হত্যা নিষিদ্ধ করা হয়েছে যে কারণে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বন্ধ হয়ে গেছে বহু কসাইখানা। যেগুলি গবাদি পশুদের হিসাবে দেখা হয়, জড়িত বেশ কয়েকজন মুসলমানকে আক্রমণ ও হত্যা করেছে।

প্রতিবেশী দেশ পাকিস্তানের ব্যাপারেও সরকার কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে এবং গত বছরের আগস্টে ভারতের একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ সুবিধা প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

নভেম্বরে সুপ্রিম কোর্ট অযোধ্যার ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদের স্থলে হিন্দুরা রামমন্দির নির্মাণ করতে পারবে বলে রায় দেয়। আদালতের এই রায়কে এর আগে ১৯৯২ সালে স্থানীয় প্রশাসনের মদদে হিন্দুরা নির্মমভাবে ভেঙে ফেলেছিল ১৬ শতাব্দীতে নির্মিত ওই মসজিদিটি। তখন এই ঘটনাকে স্বাগত জানিয়েছিল মোদি সরকার।

নাগরিকত্ব আইন, যা প্রতিবেশী মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলির অমুসলিমদের ভারতে নাগরিকত্ব অর্জনের পথকে সহজ করে দেবে। অন্যদিকে এ থেকে কোনও সুবিধা পাবে না মুসলিমরা। কেননা এতে স্পষ্ট উল্লে আছে, কেবল অমুসলিমরাই এ সুবিধা পাবে। এই আইনে ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর মারাত্মক আঘাত যার ফলে এ নিয়ে দেশ জুড়ে চলছে বিক্ষোভ।

দিল্লির সাম্প্রতিক দাঙ্গা নিয়ে কথা বলার জন্য একাধিকবার মোদির কার্যালয়ের সঙ্গে কথা বলার চেষ্ট করে রয়টার্স। তবে তারা এতে সাড়া দেয়নি। রয়টার্স প্রতিতিনিধির সাথে কথা বলতে রাজি হয়নি। পক্ষ থেকে ফেব্রুয়ারিতে অশান্তির দ্বারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হওয়া দিল্লির জেলাগুলিতে হিন্দু ও মুসলমানরা দিনে একে অপরের কাছ থেকে দূরত্ব বজায় রাখছে। রাতে যখন সহিংসতার হুমকি বেশি হয়, তখন তারা কিছু ব্যরিকেড দিয়ে মুসলিম ও হিন্দু পাড়াগুলোকে আলাদা করে ফেলে। সকালে সেগুলো সরিয়ে দেয়া হয়। তবে কিছু এলাকায় স্থায়ী প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হচ্ছে।

সম্প্রতি এক সন্ধ্যায় তারান্নুম শেখ নামের একজন স্কুল শিক্ষিকা খজুরি খাসের মুসলিম ছিটমহলে একটি সরু গলির প্রবেশপথে দুটি সুউচ্চ ফটক স্থাপন করার কাজ দেখছিলেন। এই ফটক তৈরির উদ্দেশ্য ছিল এই এলাকা থেকে হিন্দুদের দূরে রাখা।

তিনি বলেন, ‘এই এলাকায় হামলাকারীদের প্রবেশ ঠেকাতে আমরা কাঠের লাঠিগুলি নিজেদের সাথে রাখি। কেননা যে কেউ সমস্যা তৈরি করতে এই গলিতে প্রবেশ করতে পারে। এখন আমরা আর পুলিশকে বিশ্বাস করি না।’

ভজনপুরার সংলগ্ন হিন্দু পাড়ায়, বাসিন্দারা একই রকম অবিশ্বাস ও নিরাপত্তাহীনতার বোধ প্রকাশ করেছিলেন।

‘হিন্দুদের ঐক্যবদ্ধ করার জন্য এই দাঙ্গার প্রয়োজন ছিল। আমরা বুঝতে পারি নি যে আমরা কয়েক দশক ধরে এ জাতীয় দুষ্ট মানসিকতার লোকজনের (মুসলিম) সঙ্গে ছিলাম।’বলছিলেন ৫২ বছর বয়সী সন্তোষ রানী।

তিনি দাবি করেন, সহিংসতায় ভবনটিতে অগ্নিসংযোগ করার পরে তার বাড়ির প্রথম তলা থেকে তার দুই নাতি-নাতনীসহ তাকে রাস্তায় নামাতে বাধ্য করা হয়েছিল। আর এটি করেছিলেন একজন মুসলিম।

কয়েকটি কারখানা ও খুচরা দোকানের মালিক ওই ভদ্রমহিলা আরও বলেন, ‘এবার মুসলমানরা আমাদের ধৈর্য পরীক্ষা করেছে। আমরা এরপর আর তাদের কখনই চাকরি দেব না। আমি তাদের কখনই ক্ষমা করব না।’

৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে হিন্দু ও মুসলিম নারীদের পোশাক সেলাইয়ের কাজ করেন দর্জি হাসান শেখ। তিনি জানান, দাঙ্গার পরে হিন্দু গ্রাহকরা এসে তাদের সেলাইবিহীন কাপড়গুলো ফিরিয়ে নিয়ে গেছে।

‘আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম কীভাবে আমাদের সম্পর্ক শেষ হয়ে গেল। কিন্তু আমার তো কোনও দোষ ছিল না। আমার নারী গ্রাহকদেরও কোনও দোষি নেই। কিন্তু এই এলাকার সামাজিক আবহাওয়া অত্যন্ত উত্তেজনাকর। তাই দুই পক্ষের ঘৃণাই ন্যায়সঙ্গত।’ বলছিলেন দর্জি হাসান শেখ।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর