,



নবীজীবনের অলৌকিক ঘটনা

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ পৃথিবীর শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যত আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছে, তার মধ্যে অন্যতম আশ্চর্যজনক ঘটনা বিশ্বনবী মোহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র মেরাজ। মেরাজ আরবি শব্দ; যার বাংলা অর্থ হচ্ছে ঊর্ধ্বে আরোহণের বাহন। আল্লাহতায়ালার সঙ্গে রাসুল (সা.)-এর সশরীরে সাক্ষাতের এই সফরের প্রথম ভাগ মসজিদে হারাম থেকে মসজিদে আকসা পর্যন্তকে বলা হয় ইসরা। আর মসজিদে হারাম থেকে সিদরাতুল মুনতাহা ও তদূর্ধ্ব ভ্রমণকে বলা হয় মেরাজ।

হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী নবুওয়াতের দশম বছরে রজব মাসের ২৬ তারিখ দিবাগত রাতের মধ্য প্রহরে পবিত্র মেরাজ সংঘটিত হয়। বিখ্যাত সাহাবি আনাস ইবনে মালিক (রা) কুদরতি এই সফরের বর্ণনা করে বলেন, মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, ‘রজবের সাতাশ তারিখ রাতে হঠাৎ আমার কাছে জিবরাইল (আ.) একটি সাদা রঙের বোরাক নিয়ে উপস্থিত হলেন। আমি এতে আরোহণ করলাম। অতঃপর মসজিদে প্রবেশ করলাম এবং সেখানে দুই রাকাত নামাজ আদায় করলাম। এরপর আমি মসজিদ থেকে বের হলাম। তখন জিবরাইল (আ.) একটি শরাব এবং একটি দুধের পাত্র নিয়ে আমরা সামনে উপস্থিত হলেন। আমি তখন দুধের পাত্রটি গ্রহণ করলাম। জিবরাইল (আ.) বললেন, আপনি ফিতরাতকেই (স্বভাবজাত) গ্রহণ করেছেন। (মুসলিম, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ৯১)

হাদিসে আরও বলা হয়েছে, সপ্তম আকাশে মহানবী (সা.) বায়তুল মামুর দেখতে পান। এই বায়তুল মামুরে দৈনিক সত্তর হাজার ফেরেশতা প্রবেশ করেন এবং কেয়ামত পর্যন্ত তারা (অর্থাৎ যারা একবার প্রবেশ করে) পুনরায় প্রবেশ করতে পারবেন না। অতঃপর নবীজি সিদরাতুল মুনতাহা বা শেষ সীমানির্দেশক কেন্দ্রবিন্দুতে গিয়ে পৌঁছান। ক্রমান্বয়ে তিনি জান্নাত ও জাহান্নাম পরিদর্শন করেন। সিদরাতুল মুনতাহায় গিয়ে বোরাকের গতি থেমে যায়। ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)-ও আর এগোতে পারলেন না। সিদরাতুল মুনতাহার কাছেই সবুজ রঙের ‘রফরফ’ নামে একটি কুদরতি সিঁড়ি অপেক্ষমাণ ছিল। এই রফরফে আরোহণ করে মহানবী (সা.) একাই আল্লাহতায়ালার নিকটবর্তী হলেন। আল্লাহতায়ালার সঙ্গে একান্ত ভাবের আদান-প্রদান করেন। আল্লাহতায়ালা রাসুল (সা.)-কে সমগ্র সৃষ্টিজগতের রহস্য বুঝিয়ে দেন। সবশেষে নবীজি আল্লাহতায়ালার কাছ থেকে পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজের বিধান নিয়ে পুনরায় কুদরতি বাহনে আরোহণ করে পৃথিবীতে ফিরে আসেন।

এই যে বায়তুল্লাহ থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস, সেখান থেকে ঊর্ধ্বগমন। একে একে সাত আকাশ অতিক্রমসহ রহস্যজনক নানা ঘটনা সংঘটিত হয়েছে তা হয়েছে এক রাতের অতি অল্প সময়ে। সেজন্যই মেরাজ অতিবিস্ময়কর এক ঘটনা। যে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহতায়ালা নিজেই ‘সুবহানাল্লাহ’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। পবিত্র এ মেরাজ বিস্ময়কর হলেও যে অবিশ্বাস্য নয়, তারই প্রমাণ দিয়ে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি তার বান্দাকে রজনীযোগে ভ্রমণ করিয়েছিলেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসায়, যার পরিবেশ আমি বরকতময় করেছিলাম, তাকে আমার নিদর্শন দেখানোর জন্য। নিশ্চয়ই তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা বনি ইসরাইল, আয়াত : ১)

মহানবী (সা.)-এর রহস্যময় এই মেরাজ নিয়ে অবিশ্বাসীদের তর্কের শেষ নেই। সে সময় যেমন আবু জাহেলরা মেরাজকে নিয়ে ব্যঙ্গ করেছে, নানা প্রশ্ন উত্থাপন করেছে তেমনই আজকের যুগেও তথাকথিত ‘কিছু লোক’ মেরাজ প্রসঙ্গে অবান্তর তর্ক তুলছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, তারা নিজেরাই তাদের এসব ঠুনকো তর্কের গ্যাঁড়াকলে পরাস্ত হচ্ছে। রাসুল (সা.)-এর সময় আবু জাহেলরা মেরাজ প্রসঙ্গের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য নবীজিকে প্রশ্ন করেছিল ‘মোহাম্মদ! তুমি যদি বায়তুল মুকাদ্দাস গিয়ে থাকো, তাহলে বলো বায়তুল মুকাদ্দাসের কটা সিঁড়ি? কটা দরজা-জানলা আছে?’

এখানে বলে রাখা প্রয়োজন, আমরা যখন কারও বাড়ি বেড়াতে যাই, তখন তাদের বাড়িঘরের দরজা-জানলা কটা, তা কখনোই গণনা করি না; রাসুল (সা.)-ও করেননি। তাদের এসব উদ্ভট প্রশ্নে রাসুল (সা.) এই ভেবে পেরেশানিতে পড়লেন যে, ‘এখন যদি তাদের প্রশ্নের জবাব দিতে না পারি, তাহলে ওরা আমাকে মিথ্যাবাদী বলে সাব্যস্ত করবে। হাদিসে এসেছে, রাসুল (সা.)-এর এতই পেরেশানি হলো যে, ও রকম পেরেশানি তার আর কখনো হয়নি। নবীজির এই পেরেশানি দেখে আল্লাহতায়ালা কুদরতের বহিঃপ্রকাশ ঘটালেন। নবীজি বলেন, ‘অতঃপর আল্লাহতায়ালা বায়তুল মুকাদ্দাসকে আমার চোখের সামনে তুলে ধরলেন আর তারা যা জিজ্ঞেস করছিল, আমি তা দেখে দেখে গণনা করে উত্তর দিচ্ছিলাম।’

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর