,



পাপুলের কুয়েতি নাগরিকত্ব থাকলে এমপি পদ বাতিল হবে

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ মানবপাচারের অভিযোগে কুয়েতে গ্রেপ্তার হওয়া লক্ষ্মীপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ শহিদ ইসলাম পাপুল সম্পর্কে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তিনি কুয়েতের নাগরিক কি না, সে বিষয়ে কুয়েতের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে। যদি সত্যিই এটা হয়, তাহলে ওই সিট (নির্বাচনী আসন) হয়তো খালি করে দিতে হবে। যেটা আইন আছে সেটাই হবে। তার বিরুদ্ধে এখানেও তদন্ত চলছে। গতকাল সংসদ অধিবেশনে পয়েন্ট অব অর্ডারে বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য মো. হারুনুর রশীদের প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। দীর্ঘদিন পর পয়েন্ট অব অর্ডারে বিরোধী দলের অভিযোগের জবাব দিলেন সংসদ নেতা শেখ হাসিনা। স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে করোনা পরিস্থিতির কারণে কঠোর স্বাস্থ্য সতর্কতা মেনে শুরু অধিবেশনে তিনি মানবপাচারের বিরুদ্ধে সরকারের কঠোর অবস্থানের কথাও উল্লেখ করেন।
পাপুল সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, যে সংসদ সদস্যের কথা বলা হয়েছে, সে কিন্তু স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য।

সে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য নমিনেশন চেয়েছিল, আমি দেইনি। গত নির্বাচন ওই আসনটি জাতীয় পার্টিকে দিয়েছিলাম। জাতীয় পার্টির নোমান (প্রার্থী) নমিনেশন পেয়েছিল, কিন্তু সে নির্বাচন করেনি। এ কারণে ওই লোক জিতে আসে। এরপর আবার তার স্ত্রীকেও যেভাবে হোক বানায় (সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য)। কাজেই তার এমপি হওয়া কিন্তু আমাদের বানানো নয়।
রাজধানীর রিজেন্ট হাসপাতাল নিয়ে সংসদে উত্থাপিত প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এটা সরকারের পক্ষ থেকেই ধরেছি। প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে সরকার উদ্যোগ নিয়েছে এবং অনিয়মগুলো খুঁজে বের করেছি। ইতিমধ্যে জড়িতদের গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ওই (রিজেন্ট) হাসপাতালের এই তথ্য কিন্তু আগে কেউ দেয়নি, জানাতে পারেনি। অন্য কেউ জানায়নি। সরকারের পক্ষ থেকেই খুঁজে বের করেছি, ব্যবস্থা নিয়েছি। র‌্যাব সেখানে গেছে। সেখান থেকে জড়িতদের খুঁজে বের করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এর আগে পয়েন্ট অব অর্ডারে বিএনপি’র সংসদ সদস্য হারুনুর রশীদ সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদের ব্যাখ্যা তুলে ধরে বলেন, সংসদে নির্বাচিত হওয়ার যোগ্যতা এবং অযোগ্যতা সম্পর্কে যে বিষয়টি তা এখানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, যদি কেউ কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোনো বিদেশি রাষ্ট্রের আনুগত্য স্বীকার করেন- তাহলে তিনি সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচন করার যোগ্য হবেন না। এ প্রসঙ্গে কুয়েতে গ্রেপ্তারকৃত সংসদ সদস্য পাপুল প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, পত্র-পত্রিকার রেফারেন্স দিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, কুয়েতের নাগরিক হিসেবে এমপি পাপুল সেখানে গ্রেপ্তার হয়েছেন। আজকে যদি সত্যিই পাপুল কুয়েতের নাগরিকত্ব গ্রহণ করে থাকেন, তাহলে এ ব্যাপারে স্পিকারকে এর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে হবে। কারণ নিশ্চয়ই পররাষ্ট্রমন্ত্রী তথ্য সংগ্রহ করেই বলেছেন। আর তথ্য গোপন করে সে নির্বাচনে অংশ নিয়েছে।
রিজেন্ট হাসপাতালের অপকর্মসহ স্বাস্থ্যখাতের অনিয়মের অভিযোগ করে বিএনপি’র এই এমপি বলেন, কোভিড টেস্টের অনুমতি দলীয় বিবেচনায় দেয়া হয়েছে দুর্নীতি করতে। রিজেন্ট হাসপাতালের যে পরিচালনা বোর্ড রয়েছে, তাদের অগোচরেই কি এ সমস্ত অপকর্ম হয়েছে? মানুষের জীবন-মরণের সংকটময় মুহূর্তে সরকারের জায়গা থেকে র‌্যাব অভিযান চালিয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। কিন্তু এতে আমরা সন্তুষ্ট নই, এই রকম ব্যক্তিদের বাঁচিয়ে রাখা উচিত নয়। তাদের ক্রসফায়ারে দেয়া উচিত। তবে করোনা মোকাবিলায় বিভিন্ন প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করায় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান তিনি।
করোনাকালে ত্রাণ সহায়তার দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের জবাবে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, সারা দেশে ৫০ লাখ পরিবারকে আমরা সহায়তা দিচ্ছি। তাদের তালিকা বানানো হয়েছে। সেই তালিকা তিন দফা যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। সেইসঙ্গে তাদের আইডি কার্ড ভোটার লিস্টে নাম সবকিছু মিলিয়ে তথ্য নেয়া হচ্ছে। সবকিছু যাচাই করে সঠিক ব্যক্তির কাছে টাকাটা পৌঁছে দিচ্ছি। এ প্রক্রিয়ায় আমাদের সময়ও লেগেছে। অন্য যে নামধাম (ভুয়া/অযোগ্য) এসেছে, তা বাদ দেয়া হয়েছে।
এদিকে সরকারদলীয় বেনজীর আহমদ-এর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে বিভিন্ন দেশে কর্মহীন হয়ে পড়া বাংলাদেশি কর্মীরা যাতে করোনা পরবর্তী সময়ে পুনরায় কর্মে নিয়োগ পেতে পারে সেজন্য বিদেশস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। এই অন্তর্বর্তী সময়ে বিদেশস্থ বাংলাদেশ মিশনের শ্রম কল্যাণ উইংয়ের মাধ্যমে আমরা দুস্থ ও কর্মহীন হয়ে পড়া প্রবাসী কর্মীদের মাঝে প্রায় ১১ কোটি টাকার ওষুধ, ত্রাণ ও জরুরি সামগ্রী বিতরণ করেছি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনার কারণে চাকরিচ্যুত হয়ে কিংবা অন্য কোনো কারণে বিদেশ ফেরত কর্মীদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদানের জন্য আমরা ইতিমধ্যেই প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের অনুকূলে ৫০০ কোটি টাকার বরাদ্দ অনুমোদন করেছি। এছাড়া, করোনার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বিদেশ প্রত্যাগত কর্মীদের এবং প্রবাসে করোনায় মৃত কর্মীর পরিবারের উপযুক্ত সদস্যকে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মাধ্যমে স্বল্প সুদে ও সহজ শর্তে বিনিয়োগ ঋণ প্রদানের জন্য আমরা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড থেকে ২০০ কোটি টাকার তহবিল গঠন করেছি। এ সংক্রান্ত নীতিমালা ইতিমধ্যে প্রণয়ন করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের বিদ্যমান নীতিমালা অনুযায়ী শুধু বৈধ ও নিবন্ধিত অভিবাসী মৃত কর্মীর পরিবারকে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের তহবিল হতে ক্ষতিপূরণ বাবদ ৩ লাখ টাকা আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়। করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের দেশসমূহ হতে প্রবাসী শ্রমিকদের ফিরিয়ে নিয়ে আসার জন্য কূটনৈতিক চাপ অব্যাহত রয়েছে। তবে এ চাপ প্রশমিত করার জন্য আমাদের সরকার বিভিন্নমুখী কূটনৈতিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। শেখ হাসিনা বলেন, চলাচলের অনুমতির বিষয়ে বেসরকারি বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে আমি কতিপয় রাষ্ট্র প্রধান/সরকার প্রধানের নিকট এ বিষয়ে পত্র প্রেরণ করেছি। এছাড়া, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং প্রবাসী কল্যাণ ও এয়ারলাইন্সের আবেদনের প্রেক্ষিতে সীমিত পরিসরে ঢাকা-কুয়ালালামপুর রুটে বিমান চলাচালে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। আমাদের সরকারের গৃহীত খাদ্য ও চিকিৎসা কূটনীতির আওতায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চিকিৎসা সরঞ্জামাদি এবং ওষুধ প্রেরণ করা হয়েছে। তিনি আরো বলেন, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের গৃহীত সময়োচিত কূটনৈতিক উদ্যোগের ফলে ফিরে আসা প্রবাসীর সংখ্যা এখনও কম রয়েছে। আমাদের সরকার ফিরে আসা প্রবাসী কর্মীদের টেকসই পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ এবং প্রবাসীদের যথাযথ সহায়তা প্রদানের জন্য একটি ডাটাবেজ নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এছাড়া, যারা পুনরায় বিদেশে যেতে সক্ষম তাদের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষতা উন্নয়নের কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়েছে। প্রবাসীদের বিদেশে চাকরি ধরে রাখা, নতুন নতুন প্রফেশনে যোগদান, কৃষিক্ষেত্রে নিয়োগ এবং এন্টারপ্রেইনার হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সংসদ নেতা বলেন, বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশে গমনাগমনের সুবিধার্থে আমরা ইতিমধ্যে কাতার এয়ারওয়েজ, টার্কিশ এয়ারলাইন্স, এয়ার অ্যারাবিয়া এবং এমিরেটসকে বাংলাদেশে নিয়মিত বিমান চলাচলের অনুমতি প্রদান করেছি। তাছাড়া বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ঢাকা-লন্ডন রুটে বিমান চালু করা হয়েছে। মালয়েশিয়ান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যৌথভাবে কাজ করছে। তিনি আরো বলেন, করোনা চলাকালীন সময়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তরে প্রাপ্ত ২ লাখ ১৫ হাজার আবেদনের অধিকাংশ পাসপোর্ট মুদ্রণ করে আমরা বিদেশস্থ বিভিন্ন মিশনে প্রেরণের ব্যবস্থা গ্রহণ করেছি। এছাড়া পাসপোর্ট না থাকার কারণে বাংলাদেশের কোনো নাগরিক যাতে হয়রানির শিকার না হন সেজন্য যে সকল পাসপোর্ট মুদ্রণের অপেক্ষায় রয়েছে তা দ্রুত মুদ্রণ করে প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝে বিতরণ করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। আওয়ামী লীগের সদস্য হাবিবুর রহমানের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের সংকট নিরসনে সরকার বহুপক্ষীয় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশি শ্রমিক ও অভিবাসীদের অধিকার সুনিশ্চিত করার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি তাদের খাদ্য চাহিদা নিশ্চিত ও অন্তত ছয় মাস চাকরিচ্যুত না করতে জাতিসংঘ মহাসচিবকে অনুরোধ করেছি। অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থা ও উন্নয়ন সহযোগীকে এ ব্যাপারে এগিয়ে আসার অনুরোধ করা হয়েছে। সরকারি দলের সদস্য কাজী নাবিল আহমেদের প্রশ্নের জবাবে সংসদ নেতা বলেন, করোনার কারণে বিভিন্ন দেশে কর্মহীন হয়ে পড়া বাংলাদেশি কর্মীরা যেন করোনা পরবর্তী সময়ে পুনরায় কাজে নিয়োগ পেতে পারে, সেজন্য সরকার কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। তিনি আরো জানান, করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে (১২ই জুন পর্যন্ত) ১৪ হাজার ৯৫৭ জন প্রবাসী শ্রমিককে দেশে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। অধিকাংশ প্রবাসী শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ ও সিঙ্গাপুর থেকে ফেরত এসেছে।
‘বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকথা’ নামে আরেকটি বই প্রকাশ করা হচ্ছে:
জাতীয় পার্টির এমপি মুজিবুল হন চুন্নুর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’, ‘আমার দেখা নয়া চীন’সহ বঙ্গবন্ধুর লেখা নিয়ে প্রকাশিত বইগুলোর তথ্য তুলে ধরেন। ওই বইয়ের তথ্যগুলো কীভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেছিলেন সেটা বলেন। বঙ্গবন্ধুর লেখা বা তার সংশ্লিষ্ট দেশে-বিদেশের ডকুমেন্ট সংগ্রহ করে তা প্রকাশের পরিকল্পনার কথাও এ সময় তুলে ধরেন বঙ্গবন্ধু কন্যা। এ প্রসঙ্গে তিনি স্মৃতিকথা নিয়ে নতুন বই প্রকাশের প্রসঙ্গও টানেন। এ সময় অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র মতো ‘বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকথা’ নামে আরেকটি বই প্রকাশ করা হচ্ছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর স্মৃতিকথা’ একটা লেখা আছে। ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’র মতোই উনার জীবনবৃত্তান্ত নিয়ে কিছু লেখা। সেই লেখাগুলো আমি প্রস্তুত করেছি। তা প্রায় তৈরি হয়ে আছে। ওটা আমরা ছাপতে দেবো। আমার ধারণা, এটা ছিল একটি রাফ কাজ। প্রথমে তিনি ওটা করেন। তারপর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ প্রস্তুত করেন ছাপানোর জন্য। জাতির জনক তার জীবদ্দশায় সন্তানদের বা পরিবারের সদস্যদের কাছে কখনও জেলজীবনের দুঃখ-কষ্টের কথা বলতেন না বলে শেখ হাসিনা সংসদকে জানিয়েছেন।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর