,



ক্রেতা বাড়ছে, দামও কম নয়, অপেক্ষা শেষ দিনের

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ পবিত্র ঈদুল আজহায় পশু কোরবানিকে ঘিরে প্রতিবছর জমে ওঠে পশুর হাট। কিন্তু এবার করোনার কারণে পালটে গেছে হাটের চিত্র।

একদিকে, পশু কোরবানি দেওয়ার মতো আর্থিক সঙ্গতি হারিয়েছেন অনেকে। অন্যদিকে, আর্থিক সক্ষমতা থাকলেও করোনার সংক্রমণ ঝুঁকি এড়াতে অনেকে কোরবানি দেওয়া থেকে বিরত থাকছেন। যার কারণে বাজারে পশুর দাম পড়ে যাবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল। এনিয়ে সবচেয়ে দুশ্চিন্তায় ছিলেন খামারিরা। তবে রাজধানীতে গত দুই দিন পশুর হাট ঘুরে দেখা গেছে কিছুটা ভিন্ন চিত্র।

প্রথমে বাজারে তেমন ক্রেতা না থাকলেও গতকাল বৃহস্পতিবার ক্রেতার ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। পশুর দামও কিছুটা চড়া। অবশ্য বাজার ও ক্রেতা-বিক্রেতার দরকষাকষি ভেদে দাম কম-বেশি হচ্ছে। ক্রেতা ও বিক্রেতা দুই পক্ষই পরস্পরকে পর্যবেক্ষণ করছেন। শেষ পর্যন্ত পশুর দাম কোনদিকে মোড় নেবে- সেটি দেখা যাবে আজ শেষ দিন শুক্রবারে।

চাহিদার তুলনায় দেশে উত্পাদিত পশু পর্যাপ্ত হলেও ভারত থেকে এবারও গরু এসেছে। ঢাকার বাজারে দেশীয় গরুরই প্রাধান্য, কোনো কোনো বাজারে স্বল্পসংখ্যক ভারতীয় গরু চোখে পড়ছে। তবে ঢাকার আশপাশে ও মফস্বলের হাটগুলোতে ভারতীয় গরু দেখা গেছে অনেক।

গতকাল রাজধানীর মেরুল-বাড্ডায় আফতাবনগর গরুর হাটে গিয়ে দেখা যায়, দিনভর প্রচুর ক্রেতার সমাগম ছিল। পশুর বিক্রিও ছিল পর্যাপ্ত। বিক্রেতারা দাম হাঁকাচ্ছেন অনেক। ১ লাখ টাকার গরুর দাম চাচ্ছেন ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত। আবার দেড় লাখ টাকার গরুর দাম চাচ্ছেন ২ লাখের বেশি। দরকষাকষি শেষে ক্রেতাদের কেউ ঠকছেন, কেউ জিতছেন।

দেখা গেছে, একই আকারের বা ওজনের গরু কেউ কিনছেন ৮৫-৯০ হাজারে, আবার কেউ কিনছেন ১ লাখ টাকায়। একই আকারের গরু কেউ কিনছেন ৬০ হাজার টাকায়, আবার কেউ কিনছেন ৭০-৭৫ হাজার টাকায়।

তবে কিছু ব্যাপারী আগেই কমদামে গরু ছেড়ে দিয়েছেন। রাজধানীর উত্তর সিটি করপোরেশনের শিয়ালডাঙ্গা হাটে ফরিদপুর থেকে গরু চারটি গরু এনেছেন আমিনুল ইসলাম। যার মধ্যে তিনি তিনটি গরু তিনি বিক্রি করেছেন। তিনটি গরু বিক্রি করেও তার মধ্যে হতাশা কাজ করছে।

তিনি বলেন, দুটির মধ্যে সব খরচ বাদ দিয়ে আমার কোনো লাভ হবে না। হাটে ক্রেতা একেবারেই কম ছিল। তাই গরু আবার ফরিদপুরে নিয়ে যাওয়ার ভয়ে বিক্রি করে দিয়েছি। সবাই বলাবলি করছে সামনে নাকি আর ক্রেতা হবে না। তাই নিরুপায় হয়ে এটি করেছি।

অন্যদিকে নওগাঁ এলাকা থেকে মো. ইমন আলী এনেছেন ১৯টি গরু। কিন্তু আর মাত্র এক দিন হাট চলবে। তারপরেও তার একটি গরুও বিক্রি হয়নি। তিনি এই গরু বিক্রি না হলে টাকা খরচ করে আবার নওগাঁয় নিয়ে যাওয়া লাগবে বলে জানান। এজন্য কম টাকায় হলেও গরু বিক্রি করে এলাকায় ফিরতে চান।

এই হাটের ইজারাদার রুবেল শওকত বলেন, এমনিতেই হাট বৃষ্টির পানিতে ভরে গেছে। তার ওপর বিক্রি নেই। ইজারার টাকা উঠবে কি-না সেটা নিয়েই অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে উত্তরার হাটে গত দুই দিন পশু বিক্রি কম হলেও গতকাল বৃহস্পতিবার বিক্রি বেড়েছ। তবে আশানুরূপ দাম তারা পাননি।

কিশোরগঞ্জ থেকে গরু নিয়ে আসা মইনুল ইসলাম জানান, তারা কয়েক জন মিলে দুই গাড়ি গরু নিয়ে বাজারে এসেছেন। গত কয়দিন থেকে একটি গরুও বিক্রি না হলেও আজ (বৃহস্পতিবার) পাঁচটি গরু বিক্রি করেছেন। মানিকগঞ্জ থেকে আসা মজিবর মিয়া জানান, ১৭টি গরু নিয়ে হাটে এসেছেন। দুই দিনে মাত্র একটি গরু তিনি বিক্রি করেছেন। মানুষ শুধু দাম জিজ্ঞেস করে চলে যায়।

উত্তরা পশুর হাটের ইজারাদার নূর হোসেন বলেন, মাঠে পর্যাপ্ত গরু-ছাগল এসেছে। গত কয়েক দিন বেচাকেনা না থাকলেও আজ (বৃহস্পতিবার) কিছুটা বেড়েছে। তবে করোনা এবং বন্যার কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় গরুর বাজারে অনেকটাই প্রভাব পড়েছে।

গাবতলী হাটের গরু ব্যবসায়ী রানা জানান, ‘শুধু পুরো গাবতলী হাটটি ঘুরে এসে তারপর আমাকে বলুন, কত ইন্ডিয়ান গরু এই হাটে উঠেছে। ক্রেতারা আড়াই লাখ টাকা দিয়ে ভারতীয় গরু কিনলে ১৪-১৫ মণ মাংসের গরু পায়। তাহলে তারা আমাদের দেশি গরু কিনবে কেন?’ শুধু গাবতলী হাট নয়, বিভিন্ন হাটে ভারতীয় গরু লক্ষ্য করা গেছে।

অন্যদিকে এ বছর ট্রেনে করে ঢাকার বাহিরে থেকেই গরু আনা হয়েছে রাজধানীতে। বন্যাকবলিত এলাকা থেকেও এসেছে অনেক গরু। কিন্তু বিভিন্ন হাটে ঘুরে খামারিদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বেশির ভাগ খামারিকেই এবার লোকসান গুণতে হবে। পরিবহন খরচ ও পশুর খাদ্যের টাকাও পশু বিক্রি করে অনেকে পোষাতে পারছেন না।

সারা বছর অপেক্ষার প্রহর গুণে এমন পরিস্থিতি তৈরি হবে তারা কখনোই চিন্তা করেননি বলে জানান কুষ্টিয়ার ব্যবসায়ী জামাল হোসেন। তিনি বলেন, এত বাজে অবস্থায় কোনো বছরেই পড়তে হয়নি। প্রতিবছর গরু নিয়ে ঢাকায় এলে গরু বিক্রি করে সারা বছর চলার টাকা হয়ে যায়। এবার গরু নিয়ে বড় বিপদে পড়ে গিয়েছি।

শিয়ালডাঙ্গা গরুর হাট পরিদর্শনে এসে উত্তর সিটির ৪৯ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আনিছুর রহমান নাঈম বলেন, ‘প্রান্তিক খামারিরা কোরবানির সময় গরু বিক্রি করার জন্য সারা বছর অপেক্ষা করে থাকে। কিন্তু এবার বেশির ভাগ খামারিই লোকসান গুনতে হবে। হাট ঘুরে যা দেখলাম ক্রেতা একাবারে খুবই কম। সারাদেশ থেকে আসা ব্যবসায়ীদের হতাশার কথা শুনতে হয়েছে শুধু। আর একদিন আছে মাত্র। দেখা যাক কি হয়।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর