,



বন্যায় বেড়েছে সাপে কাটা, সচেতনতায় বাঁচবে জীবন

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ করোনা মহামারির পাশাপাশি দেশের মানুষ বন্যায় বিপর্যস্ত। বন্যার এ সময়টাতে সাপে কাটা রোগীর সংখ্যা বাড়তে থাকে।

ইতোমধ্যে বেশ কিছু জেলায় সাপের কামড়ে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।

দেশের বিভিন্ন জেলায় বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। অনেক স্থানে পানি জমে যাওয়ার কারণে সাপ তার আবাস হারিয়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নিয়েছে। অনেক সময় সাপ চলে আসে মানুষের বসত ভিটায়। ফলে সামান্য অসাবধানতার ফলে ঘটতে পারে বড় দুর্ঘটনা। আমাদের সচেতনতাই বাঁচাতে পারে মানুষ ও সাপের জীবন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ গবেষণায় দেখা যায়, বছরে ৭ লাখ মানুষ সাপের কামড়ের শিকার এবং মারা যায় ৬ হাজার মানুষ। অধিকাংশ সাপের কামড়ের ঘটনা বন্যাকালে ঘটে।

বাংলাদেশ ভেনম রিসার্চ সেন্টারের প্রশিক্ষক এবং স্নেক রেসকিউ সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা বোরহান বিশ্বাস রুমন বলেন, রাজশাহীতে গতবারের তুলনায় এবার সাপে কামড়ানোর ঘটনা বেশি দেখা যাচ্ছে। এ বছর অধিকাংশ রাসেল ভাইপারের কামড়, পাশাপাশি গোখরা সাপের কামড়ানোর ঘটনাও ঘটছে। গত চৌদ্দ-পনের দিনে প্রায় ১৮ জনের মতো সাপে কামড়ানো রোগী রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসা নিতে আসেন। এরমধ্যে চারজন মারাও গিয়েছেন।

সাপ গবেষক আবু সাঈদ বাংলানিউজকে বলেন, চারিদিকে বন্যার পানিতে ডুবে গেছে। সাপের থাকার গর্ত এবং ইঁদুরের গর্তগুলো পানিতে ভরাট হয়ে গেছে। তাই সাপ বর্ষাকালে আবাস এবং খাবারের খোঁজে মানুষের কাছাকাছি চলে আসে। ফলে মাঝে মাঝে ঘটে যায় অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা।

সর্তকতা অবলম্বন বিষয়ে আবু সাঈদ বলেন, বাড়ির আশেপাশে যেকোনো প্রকার ছোট-বড় গর্ত থাকলে তা বন্ধ করে দিতে হবে। বাড়ি ঘরের আশেপাশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা। সাপ নিরিবিলি স্থান পেলে সেখানে আশ্রয় নিতে পারে, তাই ঘরের মধ্যে জিনিসপত্র মাটি থেকে একটু উঁচুতে রাখতে হবে। ঘরে যেসব স্থানে আমরা ধান-চাল রাখি, সেগুলো খাবার জন্য ইঁদুর চলে আসে। ইঁদুর শিকারের লোভে সাপও ঘরের মধ্যে চলে আসে। সুতরাং বসতভিটা ইঁদুর এবং ব্যাঙ মুক্ত রাখতে হবে। হাড়ি-পাতিল কিংবা মাটির কলস জাতীয় জিনিস খোলা না রেখে ঢাকনা ব্যবহার করতে হবে। রাতে শোবার সময় মশারি ভালো করে টাঙিয়ে বিছানার সাথে গুঁজে দিয়ে ঘুমাতে হবে। রাতের বেলা টর্চ লাইট নিয়ে সাবধানে দেখেশুনে চলাফেরা করতে হবে।

তিনি আরো বলেন, এখন প্রচুর গরম পড়েছে। সাপ খুব বেশি গরম এবং ঠাণ্ডা সহ্য করতে পারে না, তাই বাইরে বের হয়ে আসে। বর্ষাকালে প্রচুর মাছ ধরা পড়ে, ফলে মানুষ রাতের বেলা অন্ধকারে মাছ ধরতে যায়। মাছ ধরার সময় টর্চ লাইট কিংবা আলো দিয়ে দেখে শুনে মাছ ধরতে হবে। এরপরেও যদি কাউকে সাপে কামড়ায় তাকে যত দ্রুত সম্ভব জেলা সদর হাসপাতাল অথবা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। ভুল করেও কোন ওঝার কাছে নিয়ে অযথা সময় নষ্ট করা যাবে না। সাপ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করতে স্থানীয়ভাবে স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে এবং এলাকায় এলাকায় মাইকিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ও ব্র্যাকের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচির পরিচালক গওহার নঈম ওয়ারা এবিষয়ে বলেন, বন্যার সময় সাপ মানুষের আগেই বুঝতে পারে কোন স্থানে বন্যা হবে। ফলে সাপ মানুষের অনেক আগেই উঁচু স্থানে আশ্রয় গ্রহণ করে। বন্যার সময় সাপের কাটা বেড়ে যায়। আমাদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণ এন্টিভেনম থাকার পরেও, যেখানে থাকা উচিত সেখানে নেই। কিংবা কোথায় রয়েছে সেটাও মানুষ জানে না। সুতরাং মানুষকে জানাতে হবে সাপের কামড়ের এন্টিভেনম কোথায় পাওয়া যায়, কোথায় পাওয়া যায় না। মানুষকে জানাতে হবে কোথায় এবং কোন হাসপাতালে গেলে সঠিক চিকিৎসা পাওয়া যাবে। এ ক্ষেত্রে দেশের গণমাধ্যম প্রচার-প্রচারণার মাধ্যমে সহযোগিতা করতে পারে।

তিনি বলেন, সাপের কামড়ে অধিকাংশ মানুষ মারা যায় এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল যেতে সময় ব্যয় করে। বিষাক্ত সাপে কামড় দিলে রোগীকে কীভাবে হাসপাতালে নিতে হবে, এই বিষয়গুলোও গণমাধ্যমে তুলে ধরতে হবে। উপজেলা পর্যায়ে সাপে কামড়ানো রোগীকে সেবা দেওয়ার জন্য ট্রেইন্ড চিকিৎসক এবং এন্টিভেনম থাকতে হবে। বন্যার আগেই আমাদের সাপে কামড়ানো বিষয়ে পূর্ব প্রস্তুতি নেওয়া জরুরি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল প্রোগ্রামের লাইন ডিরেক্টর ডা. হাবিবুর রহমান বলেন, বিগত সময়ের থেকে বর্তমানে সাপে কাটা রোগীর মৃত্যুর সংখ্যা অনেক কম। তারপরেও কিছু মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। আমাদের কাছে পর্যাপ্ত পরিমাণে এন্টিভেনম রয়েছে। আমরা জেলা সিভিল সার্জনের মাধ্যমে প্রতিটা উপজেলায় সাপের এন্টিভেনম সরবরাহ করতে চাচ্ছি। অনেক উপজেলাতে আগে থেকেই এন্টিভেনম সরবরাহ করা আছে। যেসব উপজেলায় এন্টিভেনম নাই, তারা আমাদের সাথে যোগাযোগ করলে দ্রুত সরবরাহ করার ব্যবস্থা করা হবে।

 

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর