,



সৌন্দর্য দিয়েই মানুষের প্রাণ কাড়ে এই ভয়ঙ্কর লেক

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ বিশ্বের নানাপ্রান্তে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিভিন্ন লেক। কোনোটা তৈরি হয়েছে প্রাকৃতিকভাবেই আবার কোনোটা মনুষ্যসৃষ্ট। এর সৌন্দর্য যেমন মানুষকে মুগ্ধ করে তেমনি কিছু আছে মানুষের জন্য খুবই বিপজ্জনক। তেমনই এক মিষ্টি পানির হ্রদ সুপিরিয়র। এটি বিশ্বের সর্ববৃহৎ মিষ্টি জলের হ্রদ।

উত্তরে কানাডার অন্টারিও, পশ্চিমে আমেরিকার মিনাসোটা, দক্ষিণে আমেরিকার উইসকনসিন ও মিশিগান। এর ঠিক মাঝেই শুয়ে আছে হ্রদটি। লেক সুপিরিয়র লম্বায় ৫৬৩ কিমি এবং চওড়ায় ২৫৭ কিমি। লেকটির গড় গভীরতা ৪৮২ ফুট হলেও, সর্বোচ্চ গভীরতা প্রায় ১৩৩২ ফুট। সুপিরিয়র লেকে ভাসা দ্বীপগুলোর উপকূল এলাকাসহ হিসাব করলে এর দৈর্ঘ্য প্রায় ৪৩৮৭ কিলোমিটার। তাই একে ছোটখাটো সাগরই বলা চলে। লেক সুপিরিয়রের তীরের কিছু অংশে, বেলেপাথরের পাহাড় রয়েছে। পাহাড়ের গায়ে আছে কিছু আশ্চর্যজনক গুহা। এই গুহাগুলোর ভেতর আছে অসংখ্য ছোট ও বড় প্রকোষ্ঠ।

লেক সুপেরিয়র

লেক সুপেরিয়র

কোটি কোটি বছর ধরে সুপিরিয়র লেকের ঢেউ, বেলে পাথরের দেয়ালে আছড়ে পড়ে নিজের অজান্তেই সৃষ্টি করেছে এই প্রাকৃতিক গুহাগুলো। বছরের বিভিন্ন ঋতুতে গুহাগুলো রং বদলায়। গ্রীষ্মের সময় লেক সুপিরিয়রের ঘন নীল জলরাশি ও তীরের ঘন সবুজ জঙ্গলের মাঝে লুকিয়ে থাকা গুহাগুলোর রঙ হয়ে যায় বাদামি। আশেপাশের পাহাড়গুলো থেকে লেকে নেমে আসা ঝরনার জল গুহাগুলোর গায়ে পরশ বুলিয়ে যায়। বছরের বেশিরভাগ সময়ই গুহাগুলোর মেঝে লেকের পানিতে ডুবে থাকে। ঝোড়ো হাওয়ার দিনে গুহার ওপর  আছড়ে পড়ে সুপিরিয়রে ৫০ ফুটের উত্তাল ঢেউ।

গ্রীষ্মকালে ডেভিলস আইল্যান্ড, স্যান্ড আইল্যন্ড ও অনান্য দ্বীপে থাকা গুহাগুলো দেখার জন্য ছোট জাহাজ চালায় ‘অ্যাপোস্টেল আইল্যান্ড ক্রুজ সার্ভিস’। গাইডদের সঙ্গে কায়াক চেপে কয়েক কিলোমিটার লম্বা ও অসংখ্য প্রকোষ্ঠের গুহাগুলোতে, ঘুরে বেড়ান পর্যটকেরা। মোহিত হয়ে যান গুহার গা ছমছমে সৌন্দর্যে। শীতকালে সম্পূর্ণই অচেনা রূপ ধরে লেক সুপিরিয়র। পুরু বরফের নীচে লুকিয়ে পড়ে লেক সুপিরিয়রের সুবিশাল জলরাশি। পৃথিবীর অন্যতম শীতল হ্রদ লেক সুপিরিয়র, অ্যান্টার্কটিকার মতোই হয়ে ওঠে বরফের মরুভূমি। জানুয়ারি থেকে মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত বরফে মুড়ে থাকে লেকটি।

রয়েছে বিপজ্জনক অনেক গুহা

রয়েছে বিপজ্জনক অনেক গুহা

লেক সুপিরিয়রে থাকা গুহাগুলোতে শীতকালে দেখায় এক অবিশ্বাস্য রূপ। গুহার ভেতর আছড়ে পড়া পানি জমে বরফ হয়ে যায়। গুহার ভেতর জমে যায় পাহাড় থেকে নেমে আসা ঝরনার জলও। তৈরি হয় আইসিকল, ছুঁচের মতো তীক্ষ্ণ অগ্রভাগ নিয়ে ঝুলতে থাকে গুহার ছাদ থেকে। মাঝে মাঝে খসে পড়ে গুহার মেঝেতে। গ্রীষ্মের চেয়ে শীতকালেই বেশি পর্যটক আসেন এখানে। তবে ইচ্ছা করলেই গুহায় যাওয়া যায় না। তীর থেকে গুহা পর্যন্ত রুটে জমা বরফ, পরীক্ষা করেন অ্যাপোস্টেল আইল্যান্ড ন্যাশনাল লেক-শোরের কর্মীরা। বেশ কয়েকদিন ধরে পরীক্ষা চালিয়ে, বরফের স্থায়ীত্ব ও ভারবহন ক্ষমতা সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হওয়ার পর গুহাগুলোতে যাওয়ার দিন ঘোষণা করা হয়।

এরপরও সেখানে যাওয়া সবসময়ই বিপজ্জনক। কারণ প্রবল বাতাসের ধাক্কায়, বরফের নীচের পানি ঢেউ উঠতে পারে যেকোনো সময়। ফেটে যেতে পারে বরফের স্তর। বিপদে পড়তে পারেন পর্যটকেরা। তাই রোজই পরীক্ষা করা হয় বরফ। পর্যটকদের জন্য সব সময় প্রস্তুত থাকে উদ্ধারকারী দল ও হেলিকপ্টার। লেক সুপিরিয়রের বরফে মোড়া গুহাগুলোতে যাওয়ার আদর্শ দিক হলো, আমেরিকার বেফিল্ড কাউন্টির মেয়ারস বিচ। এই মেয়ারস বিচের গায়ে লেগে থাকা মেয়ারস রোডের শেষপ্রান্ত থেকে। প্রথম গুহাটির দূরত্ব প্রায় দুই কিলোমিটার। পায়ে হেঁটে যাওয়া যায়। তবে শক্ত ও এবড়ো থেবড়ো বরফের ওপরে হাঁটার জন্য আপনাকে আগে থেকেই মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে।

লেকের পাশেই রয়েছে গুহা

লেকের পাশেই রয়েছে গুহা

পরতে হবে গরম পোশাক, কালো কাঁচের গগলস ও স্নো বুট। বুটের তলায় অবশ্যই পরতে হবে কাঁটামারা ধাতব ফ্রেম বা ক্রাম্পন। হাতে আইস স্টিক নিতে ভুলবেন না একেবারেই। এই গুহাগুলোতে যাওয়ার এসব সরঞ্জাম যে প্রচর খরচ করে আপনাকে কিনতে হবে, তা কিন্তু নয়। সেখানকার অনেক ট্রাভেল এজেন্সিতে এগুলো স্বল্প মূল্যে ভাড়া পাবেন। গুহাগুলোতে যাওয়ার সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি হলো স্কিয়িং। তবে যারা স্কি করতে পারেন না, তাদের হেঁটেই যেতে হবে। সঙ্গে রাখতে হবে পর্যাপ্ত পানি,খাবার ও ওষুধ। কারণ বরফে থাকতে হবে ঘণ্টা সাতেক।

গুহা দেখতে যাওয়ার আগে আপনাকে পাঁচ ডলার প্রবেশমূল্য দিয়ে এড়িয়াতে ঢুকতে হবে। যে সব পর্যটকেরা গাইড ছাড়া যান, তাদের বার বার অনুরোধ করা হয়, অতিউৎসাহী না হওয়ার জন্য। রুটে থাকা বরফের ফাটল সম্পর্কে সতর্ক থাকতে বলা হয়। জানিয়ে দেয়া হয়, গুহার ছাদ থেকে  যখন তখন খসে পড়তে পারে বরফের চাঁই।

পড়ন্ত বিকেলে লেক সুপেরিয়র

পড়ন্ত বিকেলে লেক সুপেরিয়র

গুহামুখগুলো দিয়ে হিমশীতল ঝোড়ো হাওয়া প্রবেশ করে, আইসিকল বা বরফের চাঁই খসিয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে অনেক। বেপরোয়া কিছু পর্যটকও দুর্ঘটনা ঘটিয়ে বসেন প্রতিবছরেই। তবুও পর্যটকের সংখ্যা কমে না, প্রতিবছর বেড়েই চলে। কারণ দুর্ঘটনা ও মৃত্যু সারা বিশ্বের অ্যাডভেঞ্চার-প্রিয় পর্যটকদের ভয় দেখিয়েছে। তবে পায়ে আতঙ্কের বেড়ি পরিয়ে ঘরে বেঁধে রাখতে পারেনি কিছু তাদের।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর