,



ভাঙনরোধে মহাপরিকল্পনা

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যেই পদ্মা, যমুনা, তিস্তা, ব্রাক্ষপুত্র, ধরলা, দুধকুমারসহ কয়েকটি নদীর ভাঙনে বিলিন হয়েছে দেশের স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, মসজিদসহ লাখ লাখ পরিবারে ঘরবাড়ি। এ জন্য সারাদেশের নদী ভাঙন প্রতিরোধে মহাপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

ভাঙন ঠেকাতে নদীর চরিত্র বুঝে ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভাঙন থেকে রক্ষা করতে নদীর পাড়ে হুমকির মুখে থাকা স্কুল, কলেজ, মাদরাসা, মসজিদ সরিয়ে নেয়ারও নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

গতকাল মঙ্গলবার একনেক সভায় অনির্ধারিত আলোচনাকালে সংশ্লিষ্টদের এ নির্দেশনা দেন প্রধানমন্ত্রী। শেরেবাংলা নগরে এনইসি মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত একনেক বৈঠকে গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে যুক্ত হন একনেক চেয়ারপারসন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বৈঠক শেষে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান।

তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙ্গন থেকে পটুয়াখালী জেলাধীন বাউফল উপজেলার ধুলিয়া লঞ্চঘাট থেকে বরিশাল জেলাধীন বাকেরগঞ্জ উপজেলার দূর্গাপাশা রক্ষা নির্মাণসহ সাতটি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এগুলো বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৩ হাজার ৪৬১ কোটি ৯৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ২ হাজার ৬১৯ কোটি ৭৯ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক সহায়তা থেকে ৮৪২ কোটি ১৮ লাখ টাকা ব্যয় করা হবে।

একনেকে অনুমোদিত প্রকল্প গুলো হচ্ছে- তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙ্গন থেকে পটুয়াখালী জেলাধীন বাউফল উপজেলার ধুলিয়া লঞ্চঘাট থেকে বরিশাল জেলাধীন বাকেরগঞ্জ উপজেলার দূর্গাপাশা রক্ষা, গভীর সমুদ্রে টুনা ও সমজাতীয় পেলাজিক মাছ আহরণে পাইলট প্রকল্প এবং ইমার্জেন্সি মাল্টি- সেক্টর রোহিঙ্গা ক্রাইসিস রেসপন্স প্রকল্প, বারৈয়াহাট- হেয়াকো-রামগড় সড়ক প্রশস্তকরন, দাউদকান্দি-গোয়লমারী-শ্রীরায়েরচর-মতলব উত্তর জেলা মহাসড়ক যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ, খুলনা সড়ক জোনের আওতাধীন মহাসড়কে বিদ্যমান সরু ও ঝুঁকিপূর্ণ পুরাতন কংক্রিট সেতু নির্মাণ প্রকল্প।

পরিকল্পনামন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, নদীর চরিত্র বুঝতে হবে। জেনেশুনে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। সব জায়গায় সবকিছু নির্মাণ করা যাবে না। ভাঙনের হুমকির মুখে থাকা নদীর পাড়ে নির্মিত স্কুল-কলেজ-মাদারাসা অবিলম্বে সরিয়ে নিতে হবে।

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, আমরা যে নদীর পাড়ে ঘরবাড়ি বানাই, তখন কি আমরা চিন্তা করি কোথায় বানাচ্ছি? বানিয়ে চলে গেলেন, নদী ভেঙে নিয়ে গেলো। এটা ঠিক না। নদীর চরিত্র বুঝতে হবে। জেনেশুনে অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সব জায়গায় সবকিছু নির্মাণ করা যাবে না।

পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন- মুন্সিগঞ্জে টিনের বাড়ি দোতলা দেখা যায়। সুন্দর সুন্দর একতলা, দোতলা। কারণ তারা পদ্মার পাড়ে বাস করতো। পদ্মা ভাঙার সময় আসলে তারা উঠিয়ে আরেক জায়গায় বসিয়ে দিতে পারবে। প্রধানমন্ত্রী আমাদের নির্দেশ দিয়েছেন, আপনারা মডেল ডেভেলপ করেন। স্কুল, মসজিদ, মাদরাসা, কলেজ যেগুলো হুমকির সম্মুখীন সেগুলো আমরা যেন তাড়াতাড়ি সরিয়ে নিতে পারি। যাতে করে গোটা বিল্ডিং না খেয়ে ফেলে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান জানান, এ বিষয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হবে।

বৈঠকে নদী ভাঙন প্রতিরোধ, সড়ক প্রশস্তকরণ, সেতু নির্মাণ, মাছ আহরণ, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলার বিষয়সহ নতুন সাতটি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে একনেক। পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, ইন্টারেস্টিং একটা অনুশাসন প্রধানমন্ত্রীর আছে। আমি তার সঙ্গে সম্পূর্ণ একমত। সুইস গেটের জন্য আমার এলাকার মানুষও অস্থির হয়ে যায়। প্রধানমন্ত্রীর অভিজ্ঞতা, বৃহদাংশ সুইস গেট কাজ করে না। এগুলো নামলে ওঠে না, উঠলে নামে না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের যারা বানায়, এটা রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে তাদের যথাযথ স্টাডি নেই। প্রধানমন্ত্রীর আরেকটা পর্যবেক্ষণ, ইতোমধ্যে আগের তুলনায় দেশে পানির প্রবাহ কমে গেছে। ফারাক্কা বাঁধ, জলবায়ু ইত্যাদির কারণে এখন কম পানি যায়। মাঝে মাঝে শক্তিশালী বন্যা হয়। সাধারণত কম পানি আসে। সুতরাং সুইস গেট বিশেষ দরকার নয় বলে মনে করেন তিনি। দেশে কত সুইস গেট বানিয়েছেন, কয়টা চলছে এসব বিষয়ে স্টাডি করার জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়কে আদেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রী বলেন, বন্যা শুধু বিপদ নয়, সম্পদও বটে। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য তুলে ধরে পরিকল্পনামন্ত্রী বলেন, বন্যা আমাদের পলি দেয়, বন্যার পানি ধুয়েমুছে ময়লা পরিষ্কার করে নিয়ে যায়। সুতরাং বন্যার সঙ্গে আমরা যেন এডজাস্ট (সমন্বয়) করে চলি। এটাকে যেন আমরা শত্রু না মনে করি। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলের নদীগুলো ড্রেজিং করার নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। উপকূলের নদীগুলোর মুখ পরিষ্কার হলে পানি তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাবে।

জানা গেছে, গত ২০ বছরের সারাদেশের ৩৫টি জেলার ৮ হাজার স্কুল-কলেজ-মসজিদ এবং মাদরাসা তিস্তা, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা,মেঘনা নদীর ভাঙ্গনে বিলিন হয়ে গেছে। সবচেয়ে এবার বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্ষতি হয়েছে রংপুর বিভাগে। এর সংখ্যা ৭৬২টি। এরপর সিলেট বিভাগে ৬৩৫টি, বরিশাল বিভাগে ৩০২টি, ময়মনসিংহ বিভাগে ৪৪৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০০১ সাল থেকে গত ২০ বছরের দেশের ৩৫টি জেলার ৮ হাজার স্কুল-কলেজ-মাদরাসা এবং মসজিদ তিস্ত, যমুনা, ব্রহ্মপুত্র, পদ্ম, মেঘনা নদীর ভাঙ্গনে বিলিন হয়েছে বলে স্থানীয় জেলা প্রশাসক অফিসগুলো থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

দেশজুড়ে কয়েকশ নদ-নদী-উপনদী রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ভাঙন-প্রবণ নদী হচ্ছে যমুনা, পদ্মা, মেঘনা। আর কম ভাঙ্গন নদীর মধ্যে ছিলো তিস্তা। সেই তিস্তা এবার প্রবণের মধ্যে পড়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে নদী ভাঙনে এ দেশের সোয়া দুই লাখ হেক্টরের মতো জমি বিলীন হয়েছে। যমুনা নদীতে সাধারন মানুষ সব চেয়ে সর্বস্বাস্ত বেশি। বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও নদী ভাঙন এবং ঘরবাড়ি ভেঙে যাওয়া মানুষ চরমদুভোগে পড়েছে লাখ লাখ মানুষ। অনেক মানুষ এখনো আশ্রয় কেন্দ্র এবং বাঁধে অবস্থান করছেন।

এদিকে গত দেড় মাস থেকে বয়ে আসা বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। তবে নদীর ভাঙন তীব্র দেখা দিয়েছে। শরীয়তপুরের জাজিরা উপজেলার কুন্ডেরচর ইউনিয়নের সিডারচর এলাকায় করপারা গুচ্ছগ্রামটি পদ্মা নদীর ভাঙনের কবলে পড়েছে। ১৫ দিনে ওই আশ্রয়ণ প্রকল্পটির ৪০ শতাংশ জায়গা পদ্মা নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন আতঙ্কে গুচ্ছগ্রামটির বাসিন্দারা নিরাপদ স্থানে সরে যাচ্ছে। তবে ভাঙন রোধে ৩৩০ মিটার জায়গায় পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বালুভর্তি জিও ব্যাগ ফেলা শুরু করেছে। ২০১৬ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত জাজিরার বিভিন্ন স্থানে নদীভাঙন ছিল। কুন্ডেরচর ইউনিয়নের কলমিরচর এলাকায় বাড়ি ছিল ধলু সরদারের। তিনি কোথায়ও আশ্রয় না পেয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে করপারা গুচ্ছগ্রামে ওঠেন। বলেন, নদীভাঙন আমাদের পিছু ছাড়ছেই না। এ পর্যন্ত তিন দফা ভাঙনে সর্বস্বাস্ত হয়েছি। সর্বশেষ আশ্রয়টুকুও হারালাম। মোহাম্মদ ফরাজি ও আলম সরদার জানান, গুচ্ছগ্রামের বাসিন্দা হয়ে তারা নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখছিলেন। সেই গুচ্ছগ্রাম এখন ভাঙনের কবলে পড়ায় তাঁরা দুঃশ্চিন্তায় পড়েছেন।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর