,



রাসূলের (সা.) যে গুণে ইসলামের ছায়ায় আশ্রয় নিল আরববাসী

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ এক বেদুঈন ব্যক্তি মসজিদে নববীতে রাসূল (সা.) এর সঙ্গে দেখা করতে এলো। সাহাবারা ছিলেন। একপর্যায়ে লোকটির পেশাবের চাপ আসলে সে কিছু না বুঝেই মসজিদের এক কোণায় গিয়ে পেশাব করতে শুরু করলো। সাহাবারা দেখে বলে উঠলো, আরে করছো কী? তারা তাকে থামাতে অগ্রসর হলো। রাসূল (সা.) সাহাবাদের নিবৃত করলেন। বললেন, তাকে তার হাজত পূরণ করতে দাও।

লোকটির হাজত শেষ হওয়ার পর রাসূল (সা.) তাকে বললেন, এটা আল্লাহর ঘর। এটা পবিত্র রাখা কর্তব্য। তিনি তাকে এমনভাবে বোঝালেন যে তার মনে এটার প্রভাব বিস্তার করলো। লোকটি চলে যাবার সময় রাসূল (সা.) নিজের একটা জামা তাকে উপহার দিলেন এবং যখন দেখলেন লোকটি পায়ে হেঁটে যাচ্ছে তখন তাকে একটি উটও দিয়ে দিলেন।

যখন ওই লোক তার গোত্রের কাছে ফিরে এলো তখন বসতির বাইরে থেকেই জোর গলায় বলতে লাগলো, আমার ভাই, বাবা, চাচা, দাদারা সবাই এদিকে আসো। তার কথায় সবাই তার চারপাশে সমবেত হলো। সে বলতে লাগলো, আজ আমি এমন এক ব্যক্তির সান্নিধ্য পেয়েছি যিনি অত্যন্ত শরিফ আদমি। আমি তাদের আল্লাহর ঘরে এমন কর্ম করার পরও তিনি আমাকে বকা দেননি, ধমক দেননি বরং ভালোবেসে আমার সঙ্গে কথা বলেছেন এবং আসার সময় আমাকে উপহারও দিয়ে দিয়েছেন।

সবাই বলতে লাগলো, তাহলে তো আমরাও তার সঙ্গে দেখা করতে যাবো। ওই গোত্রের ৩০০ লোক ছিলো, সবাই একসঙ্গে মুসলমান হয়ে গেলো।

মক্কাবিজয়ের দিন সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা:

মক্কাবিজয়ের দিনের দিকে দৃষ্টি দিলেই রাসূল (সা.) এর মানবতা বুঝে আসবে। তিনি সেদিন বিজয়ী বেশে মক্কায় প্রবেশ করছিলেন। তার সঙ্গে সৈন্য ছিলো, ইচ্ছে করলেই ওইসব কাফেরদের কঠিন শাস্তি দিতে পারতেন যারা তাকে বিভিন্নভাবে নির্যাতন করেছিলো। রাতের বেলা মক্কার নারীরা চিন্তায় পড়ে গেলো যে, আজ তাদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করা হবে! তারা জানতো বেলালের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করা হয়েছিলো, হজরত সুমাইয়া এবং অপরাপর সাহাবাদের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করা হয়েছিলো। রাতের শেষ প্রহরে মক্কার নারীরা তাদের স্বামীদের বলছিলো, কোথাও তো কোনো শব্দ পাচ্ছি না! কোনো গলিতে কোনো চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ আসছে না! মুসলমানরা কোথায় কী করছে? কখন যেন তারা হামলা করে আমাদের ইজ্জত ছিনিয়ে নিয়ে যাবে বা হত্যা করে ফেলবে। জানি না কালকের ভোর দেখতে পাবো কী পারবো না। আপনি গিয়ে একটু দেখেন না তারা কী করছে!

পুরুষরা ঘরের বাইরে এসে দেখে সারা মক্কা চুপ হয়ে আছে। মুসলমানদের খুঁজতে খুঁজতে তারা দেখলো রাসূল (সা.) এর সাহাবারা কাবাঘরের চারপাশে জড়ো হয়ে কেউ তাওয়াফ করছে, কেউ নামাজ পড়ছে, কেউবা হাজরে আসওয়াদ চুমু দিচ্ছে, কেউ কাঁদতে কাঁদতে দোয়া করছে। তারা বুঝতে পারলো, দুনিয়া পাল্টে গেছে।

সকাল হতেই তাদের অন্তর পরিবর্তন হয়ে গেলো। এ কারণে রাসূলের (সা.) চাচা হামযার কলিজা চর্বনকারী হিন্দা রাসূলের (সা.) সামনে এসে বলতে লাগলেন, আমাকে মুসলমান করে নিন। কেন সে চলে এলো? সে তো প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছিলো আর বলছিলো প্রতিশোধ একদিন না একদিন নেবোই! কোন জিনিস তাকে রাসূলের সামনে নিয়ে এলো? রাসূলের আখলাকই তাকে ইসলামের সামনে আসতে উৎসাহ দিয়েছে। একারণেই সে কালেমা পড়ে মুসলমান হয়ে যায়। যারা কালেমা পড়ছিলো তারা বলছিলো, কালকেও যখন কাফের ছিলাম তখন আপনার প্রতি এতোটা ঘৃণা ছিলো যা আর কারো প্রতি ছিলো না। আর আজ আপনার প্রতি এতোটা মহব্বত হয়েছে যা আর কারো প্রতি নেই। রাসূল (সা.) মক্কা ঘুরে ঘুরে সবাইকে আশ্বস্ত করেছেন। ইতিহাসে দেখুন, আর কোনো রাষ্ট্রনায়ক এমনভাবে বিজিত শত্রুর সঙ্গে ব্যবহার করেছে? জয়ীরা পরাজিতদের রক্তে রঙিন করেছে তাদের তরবারী। আর রাসূল (সা.) ক্ষমার মাধ্যমে রঙিন করেছেন তাদের ঈমান।

উসমান ইবনে তালহার ইসলাম গ্রহণ:

মক্কা মোকাররমায় বায়তুল্লাহ শরিফের চাবি উসমান ইবনে তালহার নিকট থাকতো। মক্কা বিজয়ের পর তিনি চাবিটি রাসূল (সা.) এর কাছে অর্পণ করেন। রাসূল (সা.) কাবাঘর খুলে সেখানে নামাজ আদায় করেন। একটু পর বের হয়ে চাবিটি উসমান (রা.) এর হাতে দিয়ে বলেন, এই চাবি আগেও তোমার কাছে ছিলো এখনো তোমার কাছেই অর্পণ করছি এবং কেয়ামত পর্যন্ত এই চাবি তোমার বংশধররা বহন করবে। কেউ তোমাদের কাছ থেকে নিতে পারবে না জুলুম ব্যতিরেকে। কুরাইশী, হাশেমী এবং অন্যান্য সাহাবারা আশ্চর্য হয়ে গেলেন, এই চাবি তো অন্য যে কাউকে দিয়ে দিতে পারতেন। তা না করে সেই উসমানের হাতেই দিলেন। উসমান হাতে চাবি পেয়ে বলতে লাগলো, আপনি তো কাবার চাবি আমাকে দিয়েছেন, এখন আমাকে আপনার জামার আস্তিন ধরতে দিন যাতে আমি কাবার প্রভুর সান্নিধ্য পেতে পারি। সে কালেম পড়ে মুসলমান হয়ে গেলো। সুবহানাল্লাহ!

হজরত ওমর (রা.) এর ইসলাম গ্রহণ:

আপনারা বলেন, ইসলাম তলোয়ার দিয়ে প্রসার ঘটেছে। তাহলে বলুন হজরত ওমর (রা.) এর ওপর কে তলোয়ার ধরেছিলো? তিনি নিজেই তো রাসূল (সা.)-কে হত্যা করার জন্য ছুটে গিয়েছিলেন। তাকে তো কেউ তলোয়ার ধরেনি তবুও তিনি কিসের পরশে ইসলাম কবুল করলেন?

হজরত খালিদ বিন ওয়ালিদের ইসলাম গ্রহণ:

হজরত খালিদ বিন ওয়ালিদকে দেখুন, কতো বড়ো সিপাহসালার ছিলেন। তবু তিনি যখন রাসূল (সা.) এর সামনে দুই হাঁটু মুড়ে বসে পড়তেন তখন জানা জরুরি যে কোন জিনিস তাকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করেছিলো। তার মতো বীর বাহাদুর, যাকে দেখে আরবের মানুষ ভয়ে কাঁপতো, যার তলোয়ারের সামনে দাঁড়ানোর মতো কেউ ছিলো না। তিনি রাসূল (সা.) এর সামনে এসে তলোয়ার সঁপে দিয়ে তার আস্তিনে আশ্রয় নিয়েছিলেন। সুহাইল বিন ওমর, সামামাহ বিন আসালকেও আমার নবী (সা.) আখলাকের মাধ্যমেই মুসলমান বানিয়েছিলেন।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর