,



মেধাস্বত্ব ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি বঞ্চিত হচ্ছি আমরা

একজন সৃষ্টিশীল মানুষের প্রতিটি কাজই নিজের সন্তানের মতো। ধরুন, আপনার লেখা একটি পান্ডুলিপি বই আকারে প্রকাশ পেল। বইটি বাজারে বেশ ভালো ব্যবসা করছে। সবাই আপনার লিখা নিয়ে আলোচনাও করছে। কিন্তু হঠাৎ একদিন দেখলেন, আপনার একই লিখা অন্য নামে বা অন্য কোনো বইয়ের নাম দিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। তখন কি করবেন আপনি? নিশ্চয়ই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চাইবেন।

কিন্তু যদি আপনার কপিরাইট না করা থাকে, আপনি কিছুই করতে পারবেন না। কারণ আপনার নিজস্ব সম্পত্তি প্রমাণ করার জন্য বইটি প্রকাশের সময়েই কপিরাইট করার দরকার ছিল।

আবার ধরুন, আমরা সবাই জানি নীলক্ষেতে সারাবছর ফটোকপি বইয়ের জমজমাট ব্যবসা চলে। মূল বইয়ের চেয়ে কম মূল্যের প্রিন্ট এবং সুলভমূল্যে এসব বই সরবরাহে লাভবান হন মূলত শিক্ষার্থীরা এবং আইন অমান্যকারী প্রকাশক। আমরা এদের নিম্ন আয়ের ক্রেতা বলেও অভিহিত করতে পারি। কারণ এদের চাহিদা রয়েছে বলেও এসব ব্যবসায়ীরা বই পাইরেসি করে থাকে।

এসবের কারণে অব্যাহত ক্ষতির শিকার হন লেখক এবং বইয়ের আইনসঙ্গত প্রকাশকগোষ্ঠী। পাইরেটেড বইয়ের পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে পাইরেটেড সিডি ডিভিডির বাজারও। পাশাপাশি প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ফলে ইন্টারনেটের মাধ্যমেও বাড়ছে গান, চলচ্চিত্র এবং বই বিনামূল্যে ডাউনলোডের পরিমাণ। এর ফলে ব্যাপকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন এসব ‘বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি বা ইনটেলেকচুয়াল প্রোপার্টি-এর প্রকৃত মালিক।

স্পষ্টত এই ভারসাম্যহীনতা একটি শ্রেণিকে ক্রমাগত সুবিধা দিয়ে অপর পক্ষকে (মেধাস্বত্বের মালিক) ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। যা নিঃসন্দেহে যে কোনো দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর একটি বড় দুর্বলতা। এই বৈষম্য দূর করার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক পরিমন্ডলে ১৯৮৬ সালে বার্ন কনভেনশনের মাধ্যমে ‘ইনটেলেকচুয়াল প্রোপার্টি রাইট’ বা ‘মেধাস্বত্বের স্বীকৃতি’ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার ট্রিপ চুক্তিতে এই কনভেনশন অন্তর্ভুক্ত করা হয়। যার ফলে এটি সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশ এই সংস্থার সদস্য হওয়ায় এই চুক্তি মেনে চলতে আইনগতভাবে বাধ্য। চুক্তির বিধান বাস্তবায়ন করতে তাই ২০০০ সালে বাংলাদেশে প্রণয়ন করা হয় ‘কপিরাইট আইন, ২০০০’।

মূলত আজ থেকে ২২৭ বছর আগে আজকের এই দিনে (১৭৯০ সালের ৩১ মে) আমেরিকা প্রথমবারের মত কপিরাইট আইন চালু করে বই, মানচিত্র এবং অন্যান্য প্রকৃত জিনিসগুলোকে রক্ষা করার জন্য। এরপর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে নিজেদের দেশে বাস্তবায়ন করেছে। ট্রিপ চুক্তিতে স্বাক্ষরের কারণে ‍কিংবা বিধানটির প্রয়োজনীতা অনুভব করে বাংলাদেশও কপিরাইট আইন চালু করে। কপিরাইট কার্যক্রম পরিচালনা শুরু করে। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো এই আইনের সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ এখনো অধিকাংশ জনগণই কপিরাইট সর্ম্পকে কোনো ধারণা রাখেন না।

আসুন আগে জেনে নেই কপিরাইট বিষয়টা কি? কপিরাইট একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইন। কপিরাইট দ্বারা লেখককে মৌলিক সৃষ্টিকর্মের জন্য নির্দিষ্ট সময়ের একচ্ছত্র অধিকার প্রদান করা হয়। কপিরাইট মূলত ‘লেখকের তার মৌলিক রচনার জন্য স্বত্ব প্রদান এবং বিনা অনুমতিতে যে কোন ধরনের পুন:মুদ্রণ, অনুবাদ বা অনুলিপি নিবৃত্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা’। সহজ কথায় বলতে গেলে, ধরুন আপনি একটি বই লিখলেন তো এখন আপনি যদি উক্ত বই এর জন্য একটি কপিরাইট করে নেন তবে পরবর্তীতে আপনার অনুমতি বা হস্তক্ষেপ ছাড়া কেউ আপনার লেখা বইয়ের কপি বাজারে ছাড়তে পারবে না। শুধু বই নয়, যে কোনো সৃষ্টিকর্মই সংরক্ষণ করা যায়। মূলত কপিরাইট আইন দ্বারা লেখক ও অন্যান্য মৌলিক কর্মের সৃষ্টিকর্ম সুরক্ষিত হয়।

‘কপিরাইট’ বলতে সাধারণত কপি করার অধিকারকে বোঝায়। নির্দিষ্ট সময়সীমার জন্য কারো ইনটেকলেচুয়াল প্রোপার্টি (যেমন বই, চলচ্চিত্র, সঙ্গীত, চিত্রকলা ইত্যাদি) কপি করার অধিকার শুধুমাত্র তার নিজের। তবে এই অধিকার সে হস্তান্তর করতে পারে। এই অধিকারকে সুরক্ষা-দান এবং সৃজনশীলতাকে উৎসাহ দেওয়ার লক্ষ্যেই কপিরাইট আইন, ২০০০-এর উৎপত্তি। এই আইন অনুসারে ‘কপিরাইট’ বলতে বোঝাবে পুস্তক, সঙ্গীত, চলচ্চিত্র, চিত্রকলা, ডিজাইন, কম্পিউটার সফটওয়্যার ইত্যাদি প্রকাশ, অনুবাদ, অভিযোজন, ভাড়া দেওয়া এবং বিক্রয় করার অধিকারকে।

কপিরাইটের মেয়াদ স্বত্বাধিকারীর মৃত্যুর পর ৬০ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এই আইনের আওতায় কপিরাইটের মালিক তার মেধাস্বত্ব কপিরাইট সমিতিতে নিবন্ধন করতে পারেন। কিংবা ক্ষেত্রবিশেষে অন্যকে কপি করার অধিকারের লাইসেন্সও দিতে পারেন। এক্ষেত্রে কপিরাইটের স্বত্বাধিকারী জীবিত না থাকলে এই আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত ‘কপিরাইট বোর্ড’ লাইসেন্স দেওয়ার অধিকার রাখে। লাইসেন্স লাভের পর প্রকৃত মালিক তার কাজ বা ইনটেলেকচুয়াল প্রোপার্টি অনুবাদ, অভিযোজন বা প্রকাশ করলে লাইসেন্স বাতিল বলে গণ্য হবে।

এই আইনের আওতায় ‘কপিরাইট লঙ্ঘন’ বলতে বোঝাবে লাইসেন্স ব্যতীত অন্যের ইনটেলেকচুয়াল প্রোপার্টি পুনরুৎপাদন, অভিযোজন, প্রকাশ, বিক্রয়, ভাড়া, আমদানি বা এমন কিছু করা যার অধিকার কেবল প্রোপার্টির প্রকৃত স্বত্বাধিকারীর রয়েছে। কপিরাইট লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে দেওয়ানি এবং ফৌজদারি দু’ধরনের প্রতিকার পাওয়া যায়। দেওয়ানি প্রতিকার হিসেবে নিষেধাজ্ঞা এবং ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান থাকছে। আর শাস্তি হিসেবে থাকছে জরিমানা এবং বিভিন্ন মেয়াদের কারাদন্ড।

চলচ্চিত্র ছাড়া অন্য মাধ্যমের কপিরাইট লঙ্ঘনের শাস্তি অনূর্ধ্ব ৪ বছরের কারাদন্ড এবং অনূর্ধ্ব ২ লাখ টাকা জরিমানা। অন্যদিকে চলচ্চিত্রের কপিরাইট ভঙ্গের শাস্তি অনূর্ধ্ব ৫ বছরের কারাদন্ড এবং অনূর্ধ্ব ৫ লাখ টাকা জরিমানা। তবে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে কপিরাইটের লঙ্ঘন না হলে আদালত এই শাস্তির পরিমাণ কমাতে পারেন।

উল্লেখ্য, বেশ কিছু কাজকে কপিরাইট লঙ্ঘনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। যেমন ইনটেলেকচুয়াল প্রোপার্টি বিষয়ে গবেষণা, ব্যক্তিগত ব্যবহার, সমালোচনা, পর্যালোচনা, সংবাদপত্র, ম্যাগাজিন কিংবা সাময়িকীতে প্রকাশ, যুক্তিসঙ্গত উদ্ধৃতিসহ জনসমক্ষে আবৃত্তি, বিনামূল্যের গ্রন্থাগারে পাওয়া যায় না- এমন বিদেশি পুস্তকের অনধিক তিন কপি অনুলিপি কপিরাইট লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে না। এছাড়া ভাষ্য সহকারে পুনর্মুদ্রণ হয়েছে এমন কোনো আইন এবং জনসাধারণের প্রবেশাধিকার আছে এমন স্থানে স্থায়ীভাবে অবস্থিত স্থাপত্য বা শিল্পকর্মের চিত্রাঙ্কন, রেখাচিত্র, খোদাই কিংবা আলোকচিত্র তৈরিও কপিরাইট লঙ্ঘন বলে গণ্য হবে না।

কপিরাইটের প্রয়োগের ফলে যাতে অর্থের চাপে জ্ঞান-প্রসারণ ব্যাহত না হয় সেজন্য পুস্তক প্রকাশের দুই মাসের মধ্যে প্রকাশকের নিজ খরচে জাতীয় গ্রন্থাগারে উন্নতমানের কপি সরবরাহের বিধান রাখা হয়েছে। এর ব্যত্যয়ে জরিমানার বিধানও রাখা হয়েছে।

কিন্তু খারাপ লাগার মতো বিষয় হচ্ছে- সারা পৃথিবীতে শিল্পসম্পদের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক হলেও কপিরাইট নিবন্ধন বাধ্যতামূলক নয়। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। কপিরাইট নিবন্ধন ঐচ্ছিক হওয়ায় বাংলাদেশে সৃজনশীল ব্যক্তিরা তাদের সৃজিত কর্মের নিবন্ধন করতে আগ্রহী হন না। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়- স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত মাত্র ৭২টি চলচ্চিত্রের কপিরাইট নিবন্ধন হয়েছে। ১৯৬২ সাল থেকে এ পর্যন্ত কপিরাইট অফিসে মেধাসম্পদের নিবন্ধন হয়েছে সর্বমোট মাত্র ১৫ হাজার ৮১টি। এ অসচেতনতার কারণে বাংলাদেশে কপিরাইট আইনের সঠিক প্রযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না।

আবার প্রচলিত কপিরাইট আইনে কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সুস্পষ্ট বিধান না থাকায় আইনটির প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন কঠিন হয়ে পড়েছে। এক্ষেত্রে আইনটি সংশোধন করা যেতে পারে।

সেক্ষেত্রে কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরছি :

>> কপিরাইট টাস্কফোর্সকে কপিরাইট আইনে অন্তর্ভুক্তকরণ ও কপিরাইট লঙ্ঘন এবং পাইরেসির শাস্তির পরিমাণ বৃদ্ধিকরণ,

>> কপিরাইট বিষয়ে উদ্ভূত বিরোধ নিরসনে মধ্যস্থতার কার্যক্রম পরিচালনার বিধান রাখা,

>> রেজিস্ট্রার অব কপিরাইটের রিভিউ ক্ষমতা প্রদান,

>> প্রতিটি সৃজনশীল কর্মের কপিরাইট রেজিস্ট্রেশন প্রদানের পৃর্বে উক্ত কর্মের মৌলিকত্ব যাচাই পদ্ধতি নির্ধারণ,

>> ডিজিটাল কর্মের কপিরাইট সুরক্ষার বিষয়ে সুস্পষ্ট ও বিস্তারিত বিধান আইনে সংযোজন এবং কপিরাইট আইনে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা।

তবে সর্বোপরি বিবেচনার বিষয় বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের প্রেক্ষিতে আইনটি কতটা বাস্তবসম্মত এবং যুক্তিযুক্ত, তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। ফটোকপি বইয়ের বিকল্প হিসেবে বিনামূল্যে লাইব্রেরির সুবিধা আমাদের দেশে শিক্ষার্থীদের সংখ্যার তুলনায় খুবই অপর্যাপ্ত। আবার ইন্টারনেটে গান, চলচ্চিত্র, বই ইত্যাদি ফ্রি ডাউনলোডের ফলে সৃজনশীল অংশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এবং নিরুৎসাহিত হচ্ছে। এর উল্লেখযোগ্য কোনো প্রতিকার নেই। একদিকে কপিরাইট লঙ্ঘন পুরোপুরি নির্মূল করা যেমন, সরকারের আয়ত্তের বাইরে, তেমনি পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা বা জনসাধারণের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত না করে ইনটেলেকচুয়াল প্রোপার্টিকে অর্থের বেড়াজালে বিত্তবান শ্রেণির গন্ডির ভেতর আবদ্ধ করে ফেললে শেষ পর্যন্ত জাতি মেধার সঙ্কটে ভুগবে।

তাই এ বিষয়ে উন্নত দেশের অন্ধ অনুকরণ না করে সরকারকে বিষয়টি নিয়ে নিরীক্ষা চালানো দরকার। একই সঙ্গে লাভক্ষতি বিবেচনা করে তবেই সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ নিতে হবে। না হলে সচেতনতার অভাবে আমাদের নিজেদের মেধাস্বত্ব ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি ক্রমাগত হারাতেই হবে।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর