,



শিক্ষার্থী ভর্তি ইচ্ছেমতো ফি আদায় বেসরকারি হাইস্কুলে

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ দেশের বেসরকারি হাইস্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তিতে ইচ্ছামতো বিভিন্ন ফি আদায় করা হচ্ছে। অনুসরণ করা হচ্ছে না সরকারের নির্দেশনা। রাজধানী ও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে খোঁজ নিয়ে এ তথ্য জানা গেছে। তবে এক্ষেত্রে ভিন্ন দৃষ্টান্তও আছে। কিছু প্রতিষ্ঠান ভর্তিতে নির্ধারিত অর্থ অন্যান্য বছরের তুলনায় কমিয়েছে।

এছাড়া কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে লটারির পরিবর্তে মৌখিক বা লিখিত পরীক্ষা আয়োজনের অভিযোগও উঠেছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীরা ভর্তি না হলে বই দেওয়া হচ্ছে না-এমন অভিযোগ করেছেন অভিভাবকরা। বিশেষ করে গত বছরের বকেয়া আদায়ের ব্যাপারে বেশি কঠোর অবস্থানে প্রতিষ্ঠানগুলো। সবমিলিয়ে অভিভাবকরা রীতিমতো জিম্মি হয়ে পড়েছেন।

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভর্তি ফি আদায়ের ক্ষেত্রে কেবল ঢাকা নয়, ঢাকার বাইরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইচ্ছামতো ফি আদায় করছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সর্বশেষ জারি করা নীতিমালায় অন্তত সাত খাতে ফি নিতে বারণ করা হয়েছে। কিন্তু এগুলোর ক্ষেত্রে উদাসীন বেশকিছু প্রতিষ্ঠান। পাশাপাশি লটারির পরিবর্তে পরীক্ষার আয়োজন এবং অর্থ পরিশোধ না করলে বই না দেওয়ার অভিযোগও তারা পেয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে মাউশি থেকে নির্দেশনা জারি করা হয়।

মাউশি মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সৈয়দ মোহাম্মদ গোলাম ফারুক বলেন, এবার ভর্তির ব্যাপারে সরকারি সিদ্ধান্ত হচ্ছে পরীক্ষা ছাড়া লটারিতে সম্পন্ন করতে হবে। আর প্রতিষ্ঠানের ছাত্রছাত্রীরা নিচের ক্লাস থেকে পরের ক্লাসে পদোন্নতি পাবেন পরীক্ষা ছাড়াই। এছাড়া করোনা পরিস্থিতির কারণে কোন খাতে ফি নেওয়া যাবে আর কোন খাতে নেওয়া যাবে না, সেই বিষয়ে আলাদা নির্দেশনা আছে। ভর্তি ফি এবং পরীক্ষার ক্ষেত্রে দেওয়া নির্দেশনা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেউ না পেয়ে থাকলে মাউশির ওয়েবসাইট থেকে নিতে পারবে। কিন্তু পাইনি এমন কথা বলে সরকারি নির্দেশনার বাইরে কাজ করা যাবে না। ঢাকার বাইরে পটুয়াখালীর বাউফলের বিভিন্ন স্কুলে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খোদ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মাউশির নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ফি কাঠামো নির্ধারণ করে দিয়েছেন। যুগান্তরের উপজেলা প্রতিনিধি আরেফিন সহিদ জানান, যেসব খাতে অর্থ আদায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেগুলোর মধ্যে সরকারের নিষেধাজ্ঞাকৃত খাতও আছে। শিক্ষকদের ডেকে বৈঠক করে এ কর্মকর্তা ১১টি প্রধান খাত নির্ধারণ করে দেন। এগুলো হচ্ছে-পুনঃভর্তি, সেশন চার্জ, আইসিটি, উন্নয়ন/মেরামত, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক, আবেদন ফরম, বিদ্যুৎ।

এছাড়া বোর্ড নির্ধারিত কয়েকটি খাত আছে। অন্যদিকে সেশন চার্জের মধ্যে আছে ভর্তি ফি, কন্ট্রিবিউশন, আন্তঃক্রীড়া, লাইব্রেরি, বিজ্ঞানাগার, ম্যাগাজিন, জাতীয় দিবস, রসিদ বই ও দরিদ্র তহবিল। এসব খাত মিলিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ২৬২০ টাকা, সপ্তম শ্রেণিতে ২৭২০, অষ্টম শ্রেণিতে ৩০২০, নবম শ্রেণিতে ৩২২০ এবং দশম শ্রেণিতে ৩৫২০ টাকা সেশন ফি নির্ধারণ করা হয়। তবে এখন ভর্তিকালে ৬০০ থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। ওই প্রতিনিধি আরও জানান, সাধারণত নির্ধারিত সব ধরনের ফি একবারে আদায় করা হয় না। বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীরা যা পরিশোধ করে তার অবশিষ্টটা বকেয়া হিসেবে থাকে। অর্ধবার্ষিক আর বার্ষিক পরীক্ষাকালে বাকিটা আদায় করা হয়।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাজমুল হক দাবি করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানরা অভিন্ন ফি কাঠামো নির্ধারণের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। চিঠিতে তিনি কেবল সেই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছেন।

প্রায় একই ধরনের কৌশল নিয়েছে ঢাকার ওয়াইডব্লিউসিএ উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে। প্রতিষ্ঠানটি দুই ভাগে অর্থ আদায় করছে। এর মধ্যে চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে এখন ২৬শ করে টাকা পরিশোধ করতে বলেছে। ফেব্রুয়ারি থেকে জুন মাসের মধ্যে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পরিশোধ করতে হবে ৮ হাজার ৬০০ টাকা।

চতুর্থ থেকে অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একই সময়ে ৮ হাজার আর নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ৯ হাজার ৫০০ টাকা জমা দিতে হবে। এর মধ্যে ষষ্ঠ-অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ১৪ জানুয়ারির মধ্যে ২৮শ আর নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ৩ হাজার টাকা জমা দিতে হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানগুলো এভাবে বিভিন্ন ধরনের কৌশল নিয়েছে। এ নিয়ে ক্ষোভ দেখা দিয়েছে অভিভাবকদের মধ্যে। তারা বলছেন, সরকার ফি নির্ধারণ করে দেওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানগুলো মানছে না। সন্তান লেখাপড়া করায় তারা রীতিমতো জিম্মি।

কেননা পরবর্তী সময়ে নানাভাবে হয়রানির আশঙ্কা আছে। তারা বলছেন, করোনাকালীন আয়-রোজগার কমে গেছে। এতে তারা বিপাকে পড়েছেন। অতিরিক্ত ফি আরোপ এবং ভর্তি না হওয়ায় বই বিতরণের একটি ঘটনার রেশ ধরে রোববার রাজধানীর বনানী বিদ্যানিকেতনে বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলেন অভিভাবকরা। তারা অধ্যক্ষকে ঘেরাও করেন। এ সময় তারা দাবি করেন, কোনো খাতে ফি কমানো হয়নি, উপরন্তু নির্ধারিত অঙ্কের বেশি অর্থ আদায় করা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ শিখা রানী হালদার দাবি করেন, তিনি মাউশির কোনো নির্দেশনা পাননি।

উল্লেখ্য, ফি নির্ধারণ করে দিয়ে গত ১৮ নভেম্বর নির্দেশনা জারি করেছে মাউশি। সেখানে বলা হয়, বেসরকারি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো (এমপিওভুক্ত ও এমপিওবিহীন) শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে শুধু টিউশন ফি গ্রহণ করতে পারবে। কিন্তু অ্যাসাইনমেন্ট, টিফিন, পুনঃভর্তি, গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার, ম্যাগাজিন ও উন্নয়ন বাবদ কোনো ফি গ্রহণ করবে না বা করা হলে তা ফেরত দেবে অথবা তা টিউশন ফির সঙ্গে সমন্বয় করবে। এছাড়া অন্য কোনো ফি যদি অব্যয়িত থাকে, তা একইভাবে ফেরত দেবে বা টিউশন ফির সঙ্গে সমন্বয় করবে।

নির্দেশনায় আরও বলা হয়, যদি কোনো অভিভাবক চরম আর্থিক সংকটে পতিত হন, তাহলে তার সন্তানের টিউশন ফির বিষয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ বিশেষ বিবেচনায় নেবেন। কোনো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন যেন কোনো কারণে ব্যাহত না হয়, সে বিষয়টি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সবাইকে যত্নশীল হতে হবে। পাশাপাশি বলা হয়, ২০২১ সালের শুরুতে যদি কোভিড-১৯ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হয়, তাহলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিফিন, পুনঃভর্তি, গ্রন্থাগার, বিজ্ঞানাগার, ম্যাগাজিন, উন্নয়ন ফির নামে অর্থ নিতে পারবে না।

ভর্তির নির্দেশনা : রোববার বেসরকারি হাইস্কুলে শিক্ষার্থী ভর্তির বিষয়ে পাঁচ দফা নির্দেশনা জারি করে মাউশি। এগুলো হচ্ছে-লটারির তারিখ নির্ধারণ করে ভর্তি তদারকি ও পরীক্ষণ কমিটিকে অবহিত করতে হবে; স্বাস্থ্যবিধি মেনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে লটারি কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা করতে হবে; লটারি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে নীতিমালা অনুযায়ী গঠিত ভর্তি তদারকি ও পরিবীক্ষণ, বিদ্যালয়ের ভর্তি পরিচালনা কমিটি, অভিভাবক প্রতিনিধি, ব্যবস্থাপনা কমিটির প্রতিনিধি ও শিক্ষক প্রতিনিধির উপস্থিতিতে নিশ্চিত করতে হবে; করোনা পরিস্থিতির কারণে জনসমাগম এড়ানোর লক্ষ্যে লটারির প্রক্রিয়াটি ফেসবুক লাইভে অথবা অন্য কোনো সোশ্যাল মিডিয়া সরাসরি প্রচারের ব্যবস্থা করতে হবে; সর্বোপরি লটারির মাধ্যমে শিক্ষার্থী নির্বাচন প্রক্রিয়াটি যেন কোনোভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর