,



আ.লীগের বিদ্রোহীরা বহিষ্কারেও দমছেন না

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ পৌরসভা নির্বাচনে দলীয় একক প্রার্থীর বিষয়ে এবার শুরু থেকে কঠোর অবস্থান নিয়েছে আওয়ামী লীগ। বিদ্রোহী হলেই সঙ্গে সঙ্গে আওয়ামী লীগ বা সহযোগী সংগঠনের পক্ষ থেকে বহিষ্কার করা হচ্ছে। আগে বিদ্রোহী ছিলেন এমন কাউকে এবার দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হচ্ছে না।

এতে ‘জনপ্রিয়’ হওয়ার পরও বাদ পড়েছেন বেশ কয়েকজন বর্তমান মেয়র। বিদ্রোহীদের বুঝিয়ে সরে যেতে কাজ করছেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা। কেন্দ্র থেকেও কঠোর হুঁশিয়ারি দেওয়া হচ্ছে। তবুও বিদ্রোহীদের দমাতে পারছে না ক্ষমতাসীন দলটি। প্রতিটি ধাপের নির্বাচনেই থাকছে দলের বিদ্রোহী প্রার্থী। ফলে নির্বাচনী মাঠে নিজেদের মধ্যে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাতের ঘটনা বাড়ছে।

জানা গেছে, অতীতে বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া, স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব ধরে রাখা এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে দলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নির্বাচনে অনড় বিদ্রোহীরা। এছাড়া কিছু কিছু জায়গায় ভুল প্রার্থী বাছাইয়ের অভিযোগও রয়েছে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য এবং প্রেসিডিয়াম সদস্য লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান বুধবার যুগান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগের মতো বড় রাজনৈতিক দলে মনোনয়ন প্রত্যাশীদের ভিড় থাকবেই। বিদ্রোহী প্রার্থী থাকার কিছু কারণও রয়েছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন শুরু হয়েছে খুব বেশি দিন হয়নি। ফলে এর সঙ্গে মানিয়ে নিতে একটু সময় লাগবে। এছাড়া আওয়ামী লীগ নেতা তৈরি করে ফলে প্রতিটি জায়গায় ১০ থেকে ২০ জন পর্যন্ত প্রার্থী থাকে। তারা যে যোগ্য নন, তা কিন্তু নয়। যোগ্য হওয়ার পরও অনেককেই আমরা মনোনয়ন দিতে পারি না। তবে তাদের বেশিরভাগ আবার দলের সিদ্ধান্ত মেনে সরে যান। দু-চারজন হয়তো শেষ পর্যন্ত বিদ্রোহী হন। তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া অতীতে যারা বিদ্রোহী ছিলেন তাদের আমরা এবার মনোনয়ন দিচ্ছি না।

প্রথম ধাপের ২৫টি পৌরসভায় আওয়ামী লীগের দলীয় ফরম কিনেছিলেন ১০৬ জন। দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করার পরও পৌরসভাগুলোয় ১৬ জন বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। এর মধ্যে কয়েকজন পর দলীয় সিদ্ধান্ত মেনে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। তবে শেষ পর্যন্ত স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে মাঠে ছিলেন ১০ জন বিদ্রোহী। এর মধ্যে দুজন জয়লাভও করেছেন। একই অবস্থা দ্বিতীয় ধাপের নির্বাচনেও। ৬১ পৌরসভায় ফরম কিনেছিলেন ৩১২ জন।

আজ এ পৌরসভাগুলোয় ভোট অনুষ্ঠিত হবে। এসব পৌরসভার ১৬টিতে ২১ জন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। তাদের অনেককে এরই মধ্যে দল থেকে বহিষ্কার বা বহিষ্কারের সুপারিশ করা হয়েছে। তবুও তারা নির্বাচনী মাঠ ছাড়ছেন না। এছাড়া তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপের নির্বাচনকে সামনে রেখেও দলীয় প্রার্থী বাছাইয়ের কাজ শেষ করেছে আওয়ামী লীগ। এ দুটি ধাপের নির্বাচনী মাঠেও বেশ কয়েকজন বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন।

বুধবার এ বিষয়ে আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, পৌরসভা নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে কেউ কেউ নির্বাচন করছেন। আবার কোনো কোনো দায়িত্বশীল নেতা ও জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহীদের মদদ দেওয়ার অভিযোগও আমরা পাচ্ছি।

তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ বৃহৎ রাজনৈতিক দল। প্রতিটি পৌরসভায় আওয়ামী লীগের একাধিক যোগ্য প্রার্থী রয়েছেন, মনোনয়ন বঞ্চিত হলেও একজন ত্যাগী ও যোগ্য নেতাকে অন্য পর্যায়ে মূল্যায়নের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। কিন্তু যারা দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নৌকা প্রতীকের বিরুদ্ধে প্রার্থী হয়েছেন বা হচ্ছেন তাদের ভবিষ্যতে আর আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়ার সুযোগ থাকবে না।

দিনাজপুরের বীরগঞ্জ পৌরসভায় বিদ্রোহী হিসাবে লড়ছেন বর্তমান পৌর মেয়র মোশাররফ হোসেন বাবুল। গত নির্বাচনেও তিনি বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে জিতেছেন। এবার বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় তাকে পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি পদ থেকে বহিষ্কারের সুপারিশ করেছে জেলা আওয়ামী লীগ।

জানা গেছে, মোশাররফ হোসেন বাবুলের পরিবার এলাকায় বেশ প্রভাবশালী। তার পরিবারের আরও একাধিক সদস্য আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। গত নির্বাচনে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থীর বিপক্ষে নির্বাচন করে বাবুল প্রায় ৪৬০০ ভোট পেয়ে জিতেছিলেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী পেয়েছিলেন মাত্র ১৬০০ ভোট।

সিরাজগঞ্জের বেলকুচিতে উপজেলা যুবলীগের সাবেক আহ্বায়ক সাজ্জাদুল হক রেজা লড়ছেন বিদ্রোহী হিসাবে। রেজার বড় ভাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান এবং আওয়ামী লীগের শিক্ষা ও মানবসম্পদ বিষয়ক সম্পাদক নুরুল ইসলাম সাজেদুল।

জানা গেছে, নৌকার প্রার্থীর পক্ষে কাজ না করে বিদ্রোহী প্রার্থীকে ‘মদদ’ দেওয়ার অভিযোগে তাকেসহ আরও কয়েকজনকে দল থেকে বহিষ্কারের সুপারিশ করা হয়েছে। অন্য পাঁচ নেতা হলেন- উপজেলা আ.লীগের যুগ্ম সম্পাদক আজিজুল হক, সহধর্ম বিষয়ক সম্পাদক হজরত আলী, বেলকুচি পৌর আ.লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহজাহান আলী প্রামাণিক, সহ-সভাপতি বদর উদ্দিন মণ্ডল, উপজেলা কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান হাবীব।

নাটোরের গুরুদাসপুর পৌরসভা নির্বাচনে মেয়র পদে ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী নিয়ে বিপাকে পড়েছে আওয়ামী লীগ। তাকে ঠেকাতে একাট্টা হয়েছেন জেলা ও উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতারা। একই সঙ্গে বিদ্রোহী প্রার্থী ও পৌর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলামকে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে দলের স্রোতধারায় ফিরে আসার আহ্বান জানানো হয়। পরে তাকে দল থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।

বগুড়ার সারিয়াকান্দি পৌরসভায় প্রথমে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছিলেন উপজেলা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আলমগীর শাহী সুমন। পরে প্রার্থী পরিবর্তন করে উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমানকে দেওয়া হয়। সুমন বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় দল থেকে তাকে বহিষ্কার করা হয়।

এছাড়া রাজশাহীর ভবানীগঞ্জে মামুনুর রশীদ মামুন, আড়ানীতে বর্তমান মেয়র মোক্তার আলী, গাইবান্ধা সদরে আহসানুল করিম লাচু ও সদস্য ফারুক আহমেদ এবং মতলুবর রহমান, সুন্দরগঞ্জ পৌরসভায় খায়রুল হোসেন মাওলা ও দেবাশীষ সাহা, ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আবুল কাশেম, ফুলবাড়িয়ায় গোলাম মোস্তফা, টাঙ্গাইলের ধনবাড়িতে মনিরুজ্জামান বকুল, কিশোরগঞ্জ সদরে শফিকুল গণি ডালি, মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জে হেলাল মিয়া ও আনোয়ার হোসেন, কুলাউড়া পৌরসভায় শফি আলম ইউনুস ও শাহজাহান মিয়া, হবিগঞ্জের মাধবপুরে শাহ মুসলেম ও পঙ্কজ সাহা দলীয় প্রার্থী ও দলীয় প্রতীকের বিরুদ্ধে লড়ছেন।

এছাড়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের বিভিন্ন স্থানে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাতে জড়াচ্ছেন আওয়ামী লীগের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। বাঘার আড়ানী পৌর নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বুধবার রাতে আওয়ামী লীগের দলীয় এবং বিদ্রোহী প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে দফায়-দফায় সংঘর্ষ এবং ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন।

আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় প্রভাব হারানোর ভয়ে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়াতে চান না অনেক মনোনয়ন বঞ্চিত প্রার্থী। অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় রাজনীতির সমীকরণ মেলাতে এমপি-মন্ত্রীসহ প্রভাবশালী বিভিন্ন মহল থেকে তাদের মদদও দেওয়া হয়। তবে এতে মূল সমস্যায় পড়েন দলের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা। তারা দ্বিধা-বিভক্ত হয়ে পড়েন। ভোটাররাও বিভ্রান্ত হন। ফলে অনেক ক্ষেত্রে দলীয় প্রার্থী পরাজিত হয়।

আবার কিছু কিছু ক্ষেত্রে তৃণমূলের ভোট ‘ম্যানেজ’ করে বা স্থানীয়ভাবে প্রভাব বিস্তার করে যোগ্য প্রার্থীকে মনোনয়ন বঞ্চিত করার অভিযোগও রয়েছে। এমন ঘটনায় দলীয় প্রার্থীর বিরুদ্ধে মাঠে নেতাকর্মীদের প্রতিবাদ করতেও দেখা গেছে। শেরপুর পৌর নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত প্রার্থীর সমর্থকরা দোকানপাট ভাঙচুর করেছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বুধবার রাতে শহরের রঘুনাথ বাজার ও মুন্সিবাজার এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর