,



নানা ঘটনা তৎপরতায়, শ্বাসরুদ্ধকর গুমোট হাওয়া

পীর হাবিবুর রহমান

ব্লগার থেকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক থেকে সমকামী যুগল খুন। আইএস বিতর্ক তলানীতে ফেলে মোসাদ বিতর্কের ঝড়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপির, পাল্টাপাল্টি বক্তৃতায়, কূটনৈতিক তৎপরতায়, যুদ্ধাপারাধী নিজামীর ফাঁসি নিয়ে পাকিস্তান ও তুরস্কের কূটনৈতিক শিষ্টাচার বহির্ভূত ও সীমালঙ্ঘন। সকল পরিস্থিতি মিলিয়ে দেশে শ্বাসরুদ্ধকর গুমোট হাওয়া বইছে। সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা, সন্ত্রাসবাদ দমনে জিরো টলারেন্স নিলেও, গোটা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর হলেও, দেশি-বিদেশি কারোর উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার অবসান যেমন হয়নি, তেমনি ফিরেনি স্বস্তি।

এক ধরণের অস্থিরতা-অস্বস্তি গ্রাস করেছে মানুষকে। দেশের প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে বিএনপি-জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ সরকার পক্ষ আনলেও কোনোটিরই রহস্যর জট খোলেনি। মানুষের নিরাপত্তার উদ্বেগ কাটেনি। বিএনপি পাল্টা বক্তৃতা বিবৃতিতে বলেই যাচ্ছে ক্ষমতাকে পাকা-পোক্ত করতে সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হচ্ছে। সম্প্রতি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক অধ্যাপক রেজাউল করিম সিদ্দিকী হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ দেশে এখনো চলছে। তারও আগে কুমিল্লার তনু হত্যার প্রতিবাদ থামেনি।

এখনো কোনোটির কূল-কিনারা হয়নি। প্রফেসর রেজাউল করিম সিদ্দিকীর রক্তের দাগ শুকাতে না শুকাতে ঢাকায় বাড়ির ভেতরে চাপাতির কোপে নিহত হয় আমেরিকা দূতাবাসের সাবেক কর্মকর্তা ও সমকামীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সক্রিয় কর্মী জুলহাজ মান্নান ও মাহবুব তনয়। এ হত্যাকাণ্ড ঝড় তোলে। কুষ্টিয়া থেকে এ হত্যাকাণ্ডে অস্ত্র সরবরাহের অভিযোগে জঙ্গি সংগঠন আনসারউল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য শরীফুল ইসলাম শিহাব গ্রেফতার হলেও এর রহস্য এখনো উদঘাটন হয়নি। এই হত্যাকাণ্ডের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক তৎপর হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে টেলিফোনে উদ্বেগ জানানোর পাশাপাশি সহকারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিশা দেশাইকে ঢাকায় পাঠান। নিশা দেশাই ঢাকা সফরকালে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ সকল মহলের সঙ্গে কথা বলেন। বাংলাদেশে বিশ্বনিন্দিত জঙ্গি সংগঠন আইএসের তৎপরতা আছে কিনা এ নিয়ে খোঁজ-খবর নেন। সরকার যেমন সন্ত্রসবাদ দমনে তার জিরো টলারেন্স অবস্থান জানিয়েছে, তেমনি যুক্তরাষ্ট্রও বরাবর সহায়তাদানের প্রস্তাব দিয়ে আসছে। নিশা দেশাই সফরের পর ভারতের পররাষ্ট্র সচিব ঢাকা সফরকালে সন্ত্রাসবাদ দমনে আগের মতোই সহযোগীতার আশ্বাস দেন। এরইমধ্যে বিএনপির নবনির্বাচিত যুগ্ম মহাসচিব চট্টগ্রামের রাজনীতি থেকে উঠে আসা আসলাম চৌধুরী ভারতে ইসরাইলের ক্ষমতাসীন দল লিকুদ পার্টির নেতা ও ইসরাইলের সেন্ট্রাল ফর ইন্টারন্যাশনাল ডিপ্লোমেসি অ্যান্ড এ্যাডভোকেসির প্রধান মেন্দি সাফাদির সঙ্গে দিল্লিতে একাদিক বৈঠকের ছবি গণমাধ্যমে উঠে আসায় বির্তকের ঝড় ওঠে।

আসলাম  চৌধুরীকে গ্রেফতারের পর প্রশাসন বলছে, আইএস নিয়ে প্রচারণা ও মোসাদ এজেন্টের সাথে বৈঠক একই সূত্রে গাঁথা। সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

সাফাদির সঙ্গে আসলাম চৌধুরীর ফুলের মালা গলায় নিয়ে প্রকাশিত ছবিটি ইঙ্গিতবহ। ইসরাইলের সঙ্গে বাংলাদেশের যেখানে কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, সেখানে রহস্যজনকভাবে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব পদে উঠে আসা আসলাম চৌধুরী ঐ দেশের গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট সাফাদের সঙ্গে বৈঠক রাজনীতিতে তাৎপর্যময়ই হয়ে ওঠেনি বিএনপিকে আরেক দফা বিতর্কের মুখে টেনে নিয়ে আসে। সাফাদি তার ফেসবুক পেজে আসলাম চৌধুরীর সঙ্গে তার ছবিটি প্রকাশই করেননি, তিনি স্ট্যাটাসও দিয়েছিলেন বাংলাদেশের সামনে সরকার পরিবর্তন হবে। এবং নতুন সরকারে ইসরাইলের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হবে। সাফাদি বিবিসিকে বলেছেন, বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর সঙ্গে তার দেখা হয়েছে গোপন বৈঠক হয়নি। আওয়ামী লীগের মন্ত্রী-নেতারা অভিযোগ করছেন, শেখ হাসিনার সরকারকে উৎখাত করতে বিএনপি ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল এবং দেশটির গোয়েন্দা মোসাদের সঙ্গে মিলে ষড়যন্ত্র করছে। বিষয়টি জেনে ঢাকায় নিযুক্ত ফিলিস্তিনের চার্জ দ্যা এ্যাফেয়ার্স বলেছেন, ইসরাইলের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন হবে রাজনৈতিক আত্মহত্যার শামিল।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, বিএনপি যে দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে তারই আরেক প্রমাণ তাদের দলের যুগ্ম মহাসচিবের মোসাদের সঙ্গে গোপন বৈঠক। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সকল অভিযোগ প্রত্যাখান করে বলেছেন, আসলাম চৌধুরীর সেই সফর ছিল ব্যাক্তিগত, এর দায় বিএনপি নেবে না। আসলাম চৌধুরী এখন রিমাণ্ডে। গোয়েন্দা পুলিশ জানতে চাইছে, আসলাম চৌধুরীর সঙ্গে বিএনপির নেতারা কতটা জড়িত। এদিকে যুদ্ধাপারাধী জামায়াতের আমীর মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসি নিয়ে পাকিস্তান পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়, পাকিস্তানের পার্লামেন্ট এবং তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় ও তাদের প্রেসিডেন্টের ক্ষুব্দ প্রতিক্রিয়ায় কূটনৈতিক সীমাই লঙ্ঘন করেনি, স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নগ্ন হস্তক্ষেপ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয়  এ বিষয়ে ছাড় দিয়ে কথা বলেনি। তবুও সার্বিক পরিস্থিতি মিলিয়ে দেশে চলমান ঘটনবালী ও বাইরের দুনিয়ার তৎপরতা ও প্রতিক্রিয়া মিলিয়ে পর্যবেক্ষক মহল মনে করছেন শ্বাসরুদ্ধকর গুমোট হাওয়ার ভেতর দিয়ে কঠিন সময় অতিক্রম করছে বাংলাদেশ। যেখানে কেউ স্বস্তিতে নেই।

নিশাই দেশাইর পর ঢাকা সফররত মার্কিন উপ-সহকারি পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম টডে ঢাকা সফরকালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। বৈঠেকে তারা জঙ্গি-সন্ত্রাস দমনে যৌথভাবে দু’দেশ কাজ করবে বলে মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেছেন। এদিকে সোমবার সকালে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. মঈন খানের নেতৃত্বে দলের ৬ সদস্যের প্রতিনিধি দল মার্কিন রাষ্ট্রদূত বার্নিকাটের বাসভবনে  উইলিয়াম টডের সঙ্গে প্রাত:রাশ বৈঠক করেছেন। বিএনপি নেতারা বলেছেন, তাদের প্রাত:রাশে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবে সেখানে রাজনীতিসহ সব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। সকাল সোয়া ৮টা থেকে ৯টা ৪৫ মিনিট পর্যন্ত দেড় ঘণ্টার বৈঠকে সরকারের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যর্থতার অভিযোগই আনেনি, সর্বশেষ ইউপি নির্বাচনের চিত্রও তুলেও ধরেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি ভিন্নমত দমনের ব্যাপারে সরকারের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেছে। উইলিয়াম টড অস্থিরতা নিরসনের পথ কি  জানতে চাইলে বিএনপি নেতারা বলেছেন, একটি গ্রহণযোগ্য জাতীয় নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত জনগণের সরকার সেই সমাধান দিতে পারে। তারা এ ব্যাপারে যুক্তরাষ্ট্রের জোরালো ভূমিকার আশা করেন। পর্যবেক্ষক মহল বলছেন, পরিস্থিতি এখন অবলোকন করার সময়।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর