,



তৃণমূলের ভোটযুদ্ধে নেই অধিকাংশ দল

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ তৃণমূলের ভোটে আস্থা নেই দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের। অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ ভোটের নিশ্চয়তা না-থাকায় মূলত আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের মতে, সুষ্ঠু ভোট আয়োজনের সাংবিধানিক দায়িত্ব নির্বাচন কমিশনের।

কিন্তু তারা এ দায়িত্ব পালনে বারবার ব্যর্থতার পরিচয় দিচ্ছে। বিশেষ করে সর্বশেষ অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের কয়েকটি আসনের উপনির্বাচন, উপজেলা এবং পৌরসভা নির্বাচনে ইসির (নির্বাচন কমিশন) ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।

তাদের আচরণেই সাধারণ মানুষের মধ্যে ভোটের প্রতি চরম আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। যে কারণে ভোটাররাও দিন দিন ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। পৌরসভায় কাউন্সিলরদের জন্য কিছু ভোটার কেন্দ্রে গেলেও অন্য নির্বাচনে তাদের উপস্থিতি হতাশাজনক।

বিশ্লেষকদের মতে, এখন নির্বাচনে জনমত নয়, প্রভাবশালী দলের প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন পাওয়াটাই মুখ্য। কারণ, মনোনয়ন পেলেই বিজয় নিশ্চিত। এ পরিস্থিতিতে ভোটারদের কেন্দ্রে নেওয়া, তাদের মন জয় করা-এসব গুরুত্বপূর্ণ নয়। কাজেই নিবন্ধিত হোক আর অনিবন্ধিতই হোক প্রভাবশালীদের সমর্থন না-থাকলে কেউ আর নির্বাচন করতে চাইছে না। এরই বিরূপ প্রভাব পড়েছে তৃণমূল নির্বাচনে।

এ প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচন এখন একটি অর্থহীন আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে। সরকারি দল যাকে মনোনয়ন দেবে, সেই প্রার্থী জয়ী হবে। কাজেই এমন নির্বাচনে অংশ নেওয়া না-নেওয়া একই কথা। এই বাস্তবতাটি দেশের সব রাজনৈতিক দল ও মানুষ বুঝে গেছে। এ কারণে এখন আর ভোট নিয়ে সরকারি দল ছাড়া আর কারও কোনো আগ্রহ বা মাথাব্যথা নেই।

নির্বাচন কমিশন ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ১১ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে প্রথম ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন। এদিন ৩৭১টি ইউপি নির্বাচনে ভোট হবে। ইতোমধ্যে মনোনয়নপত্র দাখিল শেষ হয়েছে। দেখা যাচ্ছে, ৩৭১টি ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন ১৭৫২ জন। এর মধ্যে ১০৯৯ জনই স্বতন্ত্র প্রার্থী, যাদের অধিকাংশই আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী। বাকি ৬৫৩ জন আওয়ামী লীগসহ ১১টি রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থী। গত ৩ মার্চ নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব মো. হুমায়ুন কবীর খোন্দকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন। ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আজ প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তৃণমূলের সবচেয়ে বড় এই ভোটে সক্রিয় অংশগ্রহণ নেই দেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের। নির্বাচন কমিশনের হিসাব অনুযায়ী দেশে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ৪১টি। এদের মধ্যে শাসক দল আওয়ামী লীগসহ মাত্র ১১টি রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে প্রার্থী দিয়েছে। নৌকা প্রতীক নিয়ে আওয়ামী লীগের হয়ে ভোটের মাঠে লড়ছেন ৩৫৮ জন।

এর বাইরে ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশ (হাতপাখা) ২২৭ জন, জাতীয় পার্টি (লাঙ্গল) ৩২ জন, জাকের পার্টি (গোলাপ ফুল) ১৫ জন, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি (হাতুড়ি) ৬ জন, জাতীয় পার্টি-জেপি (বাইসাইকেল) ৬ জন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল- জাসদ (মশাল) ৩ জন, বিকল্পধারা বাংলাদেশ (কুলা) ৩ জন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (কাস্তে) ১ জন, বাংলাদেশ কংগ্রেস (ডাব) ১ জন এবং ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (আম) ১ জন করে প্রার্থী দিয়েছেন প্রথম ধাপের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে। নিবন্ধিত বাকি ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী নেই এই নির্বাচনে। নিবন্ধন নেই এমন আরও অর্ধশত ছোট ছোট রাজনৈতিক দল থাকলেও তাদের কাউকেই ভোটের মাঠে দেখা যাচ্ছে না।

এমন পরিস্থিতির জন্য সরকার এবং নির্বাচন কমিশন যৌথভাবে দায়ী বলে মন্তব্য করেন সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার। তিনি যুগান্তরকে বলেন, ‘অতীতে বড়-ছোট সব দলের প্রার্থীরা মিলে নির্বাচনে অংশ নিতেন। সবার অংশগ্রহণে নির্বাচন একটি উৎসবে পরিণত হতো। বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা বাদ দিলে ভোট মোটামুটি শান্তিপূর্ণ হতো। ভোটাররাও তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারতেন। বর্তমান নির্বাচন কমিশনের আমলে এই চিত্র এখন পুরোপুরি উলটো।

সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্বাচন কমিশনের প্রতি চূড়ান্তভাবে অনাস্থা দেখিয়ে দেশের বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ না-নেওয়ার কথা আগেই জানিয়ে দিয়েছে।

ইসির প্রতি নানান ক্ষোভ এবং হতাশা সত্ত্বেও প্রধান বিরোধী দল জাতীয় পার্টি এই নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। এর বাইরে নিবন্ধিত বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে দলীয় প্রতীকে প্রার্থী দেয়নি। এক কথায় তারা নির্বাচনের মাঠ থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছে।

তবে বিএনপির অনেকেই দলের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে কোনো কোনো স্থানে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। ছোট দলগুলোর মধ্যে যারা ভোটের মাঠে নেই, তারা নিজেদের শক্তি, সামর্থ্য এবং পর্যাপ্ত জনসমর্থন না-থাকার পাশাপাশি নির্বাচনি ব্যবস্থার ওপরও চূড়ান্তভাবে তাদের অনাস্থার কথা জানিয়েছে।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর জানিয়েছেন, তারা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ না-নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যুগান্তরকে তিনি বলেন, ‘আমরা মনে করেছিলাম, সরকার অন্তত স্থানীয় সরকার নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করার ব্যবস্থা নেবে। নির্বাচন কমিশনও সুষ্ঠুভাবে ভোট পরিচালনা করবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত ইউপিসহ পৌরসভা-উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে যা হয়েছে, সেগুলো এত হতাশাজনক যে, আগামীতে অনুষ্ঠেয় ইউপি নির্বাচনগুলোয় দলীয়ভাবে অংশগ্রহণ না-করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর অভিযোগ করেন, ‘সম্প্রতি অনুষ্ঠিত নির্বাচনগুলোয় এটা প্রমাণিত হয়েছে যে, এই নির্বাচন কমিশন কোনো নির্বাচনই নিরপেক্ষ, অবাধ ও সুষ্ঠুভাবে করার যোগ্য নয়। বর্তমান অনির্বাচিত সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করাই এ নির্বাচন কমিশনের একমাত্র কাজ।’

বিএনপি ভোট বর্জন করলেও নির্বাচনি যুদ্ধে আছে জাতীয় পার্টি। তবে অতীত অভিজ্ঞতা তাদের জন্যও সুখকর নয় বলে জানিয়েছেন দলটির মহাসচিব জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু। যুগান্তরকে তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি সব সময়ই নির্বাচনমুখী দল। কিন্তু বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীন ভোটের নামে একের পর এক প্রহসন চলছে। মানুষের ভোটাধিকার হরণ করা হচ্ছে। জাতীয় পার্টির মহাসচিব বলেন, নির্বাচন কমিশন তার ওপর অর্পিত সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন তো করছেই না; বরং ভোটের কফিনে তারা পেরেক ঠুকে চলেছে। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদের বেশ কয়েকটি উপনির্বাচন এবং সদ্যসমাপ্ত উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনে সরকারি দল যাকে মনোনয়ন দিয়েছে, তিনিই জয়ী হয়েছেন। ভোটাররা ভোট দিতে পারেননি। ভোটের নামে একরকম প্রহসন চলছে। জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু বলেন, এসব তিক্ত অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও আমরা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। যদি একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে, তাহলে আমরা জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আন্দোলনে নামব।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) ৩৭১টি ইউপি নির্বাচনের মধ্যে মাত্র একটিতে অংশ নিচ্ছে। মাত্র একটিতে কেন-এমন প্রশ্নের জবাবে দলটির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম পালটা প্রশ্ন রেখে যুগান্তরকে বলেন, ‘কী হবে এই নির্বাচনে অংশ নিয়ে। ফলাফল তো সবাই জানে। সরকারি দল যাকে মনোনয়ন দেবে, জয়ী তাকেই ঘোষণা করা হবে। গত এক যুগ ধরে এভাবেই নির্বাচন হচ্ছে। ফলাফল পূর্বনির্ধারিত থাকে।

এ কারণে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বাদে আর কারও এখন নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে আগ্রহ নেই। জনগণেরও ভোটাধিকার প্রয়োগে কোনো আগ্রহ নেই।’ মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, সংসদ নির্বাচনসহ সব ধরনের নির্বাচন একতরফা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন কিছুদিন পরপর একটি করে প্রহসনের নির্বাচন মঞ্চস্থ করে। সরকারি দল যাকে মনোনয়ন দেয়, বিনা ভোটে সে জয়ী হয়। অথবা তাকেই জয়ী ঘোষণা করা হয়। এসব বাস্তবতা সত্ত্বেও আমরা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি-এটাই বড় কথা।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর