,



মুজিববর্ষের ঘর বরাদ্দে মেম্বার নিল ১৫ হাজার টাকা, পদে পদে খরচ

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকীতে গৃহহীনদের জন্য ঘর নির্মাণে সরকারের মানবিক উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘরের নির্মাণসামগ্রী ক্রয় ও পরিবহন খরচ প্রদানে বাধ্য করেই ক্ষান্ত হয়নি, এরপর নির্মাণ শ্রমিকদের পারিশ্রমিক এবং নিয়মিত খাবারের খরচও দিতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠেছে দরিদ্র পরিবারটির।

এর আগে ঘর পাওয়ার তালিকায় নাম ওঠাতে ইউপি মেম্বারকে নিজের পালন করা কয়েকটি ছাগল বিক্রির ১৫ হাজার টাকা উৎকোচ দিতে হয়েছে। সর্বশেষ টাকার জোগান দিতে না পারায় ঘর নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

ঘটনাটি ঘটেছে কুয়াকাটা পৌরসভা লাগোয়া কলাপাড়া উপজেলার লতাচাপলী ইউনিয়নের মুসুল্লীয়াবাদ গ্রামে। ঘর নির্মাণ কাজ বন্ধের অভিযোগে সরেজমিন গিয়ে এর সত্যতা পাওয়া যায়।

এরপর সংশ্লিষ্ট ইউপি মেম্বারকে ঘর দেওয়ার কথা বলে টাকার নেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি স্বীকার করে টাকা ফেরত দিতে সম্মত হন।

উপজেলার লতাচাপলী ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে উপজেলা প্রশাসন ৩০টি ঘর বরাদ্দ দেয়। এভাবে ঘর নির্মাণ নিয়ে উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় নানা অভিযোগ রয়েছে। উপজেলা প্রশাসন থেকে শুরু করে ইউপি মেম্বার ও ঠিকাদার পর্যন্ত দফায় দফায় অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠে এসেছে।

পটুয়াখালী জেলার মহিপুর থানার লতাচাপলী ইউনিয়নের মুসুল্লীয়াবাদ গ্রামের নওমুসলিম হাসান খান পেয়েছেন একটি ঘর। এ যাবত তার ৩০ হাজার টাকা খরচ হলেও ঘরটির ফ্লোর ও ছাউনির কাজ এখনও সম্পন্ন হয়নি। শুরুতে নির্মাণসামগ্রী পরিবহন ব্যয়ে সক্ষম হলেও ঠিকাদারের চাহিদা অনুযায়ী অন্যান্য ব্যয় মেটাতে না পারায় নির্মাণ কাজ বন্ধ রাখা হয়েছে।

এরপর হাসান খান বিষয়টি সংবাদকর্মীদের জানালে স্থানীয় ইউপি সদস্য (মেম্বার) মো. মজিবুর রহমান মুসুল্লী ১৫ হাজার টাকা কুয়াকাটা প্রেস ক্লাবে উপস্থিত হয়ে ফেরত দিয়েছেন।

নওমুসলিম হাসান খান যুগান্তরকে জানান, তার নামে সরকারি ঘর বরাদ্দ দেওয়ার কথা বলে লতাচাপলী ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. মজিবুর রহমান মুসুল্লী ১৫ হাজার টাকা নেয়। তার কাছে নগদ টাকা না থাকায় আটটি ছাগল বিক্রি করে এই টাকা দিয়েছেন। এরপর নির্মাণ কাজ শুরু করেন রাজমিস্ত্রি কাজের ঠিকাদার স্থানীয় শ্রমিক লীগ নেতা মো. ওয়াদুদ খান।

১০ দিন কাজ করে রাজমিস্ত্রি সহকারীর বেতন বাবদ ১০ হাজার নিয়েছেন। এছাড়াও নির্মাণ কাজে সংশ্লিষ্ট মিস্ত্রিদের দুপুরের খাবার বাধ্যতামূলক করা হয়। এর মধ্যে বালু শেষ হলে হাসান খানকে পরিবহন খরচ দিয়ে বালু আনতে বলেন। তিনি টাকার অভাবে বালু জোগাড় করতে না পারায় ফ্লোরের কাজ বন্ধ করে দেন ঠিকাদার ওয়াদুদ।

এ প্রসঙ্গে ওয়াদুদ খান যুগান্তরকে বলেন, প্রতিটি ঘরের মালিককে রাজমিস্ত্রির হেলপার (সহযোগী) দেয়ার কথা ছিল। হাসান খান সহযোগী না দেয়ায় আমার দুই ভাই হেলপারি (রাজমিস্ত্রির সহযোগী) করেছে। এজন্য হাসান খান প্রতিদিন ১ হাজার টাকা করে দিয়েছেন। আমি কোনো টাকা হাতে ধরি নাই।

রাজমিস্ত্রির হেলপার (সহযোগী) দেয়ার কথা কে বলেছেন- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি বলতে পারবো না।

এদিকে কাঠমিস্ত্রির ঠিকাদার যুবলীগ নেতা মো. সোহরাফ হোসেন তাদের নির্দিষ্ট স-মিল থেকে কাঠ আনতে বলেন। হাসান খান ২শ’ টাকা মোটরসাইকেল ভাড়া দিয়ে স-মিলে গিয়ে কাঠ না পেয়ে ফেরত আসেন। এখন কাঠমিস্ত্রি সোহরাফ হোসেন বারবার ফোন করছেন নিজ খরচে কাঠ ও টিন আনতে। ঘরের যাবতীয় লোহাসহ আনুষঙ্গিক মালামাল কিনতে হয়েছে হাসান খানকে। কিন্তু টাকার অভাবে স-মিল থেকে কাঠ ও আলীপুর বাজার থেকে টিন আনতে না পারায় কাঠমিস্ত্রিও কাজ শুরু করেনি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মুজিববর্ষ উপলক্ষে সরকারিভাবে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের জন্য এই ইউনিয়নে ৩০টি ঘর বরাদ্দ দেয় উপজেলা প্রশাসন। প্রতি ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ১টি, ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ১টি, সাধারণ সম্পাদক ১টি এবং তিনজন মহিলা ইউপি সদস্যা ১টি করে মোট ৩০টি ঘর বণ্টন করেন। সেখানেও বণ্টনকারীদের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে এসব ঘর নির্মাণের জন্য ইট, বালু, রড, সিমেন্ট, টিন ও কাঠ সরবরাহের দায়িত্ব পায় ইউপি চেয়ারম্যান মো. আনছার উদ্দিন মোল্লার অনুসারী সাবেক শ্রমিক লীগ নেতা মো. জাকির মল্লিক। তার বিরুদ্ধে নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী সরবরাহের অভিযোগ করছেন গৃহহীনরা।

এ প্রসঙ্গে মো. জাকির মল্লিক তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে যুগান্তরকে বলেন, আমি প্রত্যেকটি ঘরের জন্য ভালোমানের নির্মাণসামগ্রী সরবরাহ করেছি।

রাজমিস্ত্রির দায়িত্ব পায় ওয়ার্ড শ্রমিক লীগ সাধারণ সম্পাদক ওয়াদুদ খান। তার বিরুদ্ধে রয়েছে সিমেন্ট চুরির এন্তার অভিযোগ। ঘরপ্রতি ৪০ ব্যাগ সিমেন্ট বরাদ্দ থাকলেও হাসান খানের ঘরে ১২ ব্যাগ সিমেন্ট কম দেয়ার অভিযোগ আছে।

এদিকে ওয়াদুদ খান নিজেও একটি ঘর পেয়েছেন। তার প্রাপ্ত ঘরটিতে মুজিববর্ষের ঘরের ডিজাইন অনুসরণ না করে নিজস্ব ডিজাইনে কাজ চলছে। বিভিন্ন ঘরে নির্মাণসামগ্রী কম দিয়ে তার বাড়িতে নিয়ে বড় ঘর নির্মাণ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ বিষয়ে ওয়াদুদ বলেন, আমি একটি ঘর পেয়েছি, কিন্তু সরকারি খাসজমি পাইনি। খাসজমি খোঁজা হচ্ছে। যার কারণে আমার ঘরের নির্মাণসামগ্রী এখনো আনা হয়নি।

বাড়িতে নির্মাণকাজ চলমান থাকার বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, আমি নিজে একটি বিল্ডিং নির্মাণ করছি।

কাঠমিস্ত্রির কাজের দায়িত্ব পায় মাইটভাঙ্গা এলাকার যুবলীগ নেতা মো. সোহরাফ হোসেন। এ কাজের জন্য কাঠ ও টিনের পরিবহন খরচ এবং আনুষঙ্গিক লোহা-লক্কড় কিনতে হয় ঘরপ্রাপ্তদের। তিনি নিজেও সরকারি ঘর বরাদ্দ পেয়েছেন।

এ ব্যাপারে লতাচাপলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. আনছার উদ্দিন মোল্লা সাংবাদিকদের বলেন, মুজিববর্ষ উপলক্ষে ভূমিহীন ও গৃহহীনদের ঘর নির্মাণের জন্য কোনো লেনদেন হয়নি। যদি কেউ লেনদেন করে থাকে তা তাদের নিজস্ব ব্যাপার।

কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার আবু হাসনাত মোহাম্মাদ শহীদুল হক বলেন, মুজিবশতবর্ষ উপলক্ষে আমরা লতাচাপলী ইউনিয়নে ৩০টি ঘর বরাদ্দ দিয়েছি, এটি ইউপি চেয়ারম্যানের মাধ্যমে তালিকা করে কাজ শুরু করা হয়েছে। সেখানে অনিয়ম হয়ে থাকলে ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর