,



সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনে ১৬৮ কোটি টাকার প্রকল্প, উৎপাদন বাড়বে ডালের

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ আমিষের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি নাগরিকদের সুষম খাদ্য নিশ্চিত করতে বড় একটি ভূমিকা রাখে মুগ, মসুর থেকে শুরু করে বিভিন্ন ধরনের ডাল। এরই মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) সাত ধরনের ডালের ৪২টি উন্নত জাত এবং ৪১টি উন্নত চাষাবাদ প্রযুক্তি উদ্ভাবন করেছে। কিন্তু দেশের ডাল আবাদের অন্যতম এলাকা ফরিদপুর থেকে শুরু করে বরিশাল পর্যন্ত এলাকায় এখনো কৃষকরা সনাতন পদ্ধতিতে প্রচলিত জাতের ডাল আবাদ করছেন। ফলে প্রত্যাশিত মাত্রায় আসছে না ফলন, বিপুল পরিমাণ ডাল আমদানি করতে হচ্ছে।

এদিকে, দক্ষিণাঞ্চলের জমিগুলোতে লবণাক্ততা ও জলাবদ্ধতা এখন নিত্য সমস্যা। জমিতে এই দুই সমস্যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে। ফলে এসব এলাকায় ডালের আবাদ একদিকে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, অন্যদিকে সম্প্রসারিত হতে পারছে না। এ পরিস্থিতিতে গবেষণার মাধ্যমে জলবায়ু সহিষ্ণু ডালের জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি লবণাক্ত ও জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত জমিতে ডাল আবাদের জন্য লাগসই প্রযুক্তি উদ্ভাবনের উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার। আর এই উদ্যোগের আওতাতেই মাদারীপুরের আঞ্চলিক ডাল গবেষণাকেন্দ্রের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে। এর আওতায় একটি উন্নত মাসের গবেষণাগার স্থাপনের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে।

পরিকল্পনা কমিশন ও কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, বৃহত্তর বরিশাল ও ফরিদপুর অঞ্চলে আবাদের উপযোগী উচ্চ ফলনশীল জাত এবং লাগসই উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন, প্রকল্প এলাকার অনাবাদি ও একফসলি জমিতে ডাল আবাদের মাধ্যমে ডালের উৎপাদন বাড়ানো এই প্রকল্পের অন্যতম উদ্দেশ্য। এছাড়া বারি উদ্ভাবিত ডালের উন্নত জাত ও প্রযুক্তিগুলো কৃষকদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতেও প্রকল্পটি ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ‘আঞ্চলিক ডাল গবেষণাকেন্দ্র, মাদারীপুরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বৃহত্তর বরিশাল, ফরিদপুর অঞ্চলে ডালের উৎপাদন’ শীর্ষক প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬৮ কোটি টাকা।

কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, সুষম খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা পূরণে ডাল একটি গুরুত্বপূর্ণ ফসল। বাংলাদেশে বর্তমানে ডালের মোট চাহিদা প্রায় ২৬ দশমিক ৫ লাখ মেট্রিক টন হলেও উৎপাদন হয় প্রায় ৯ দশমিক ৩৮ লাখ মেট্রিক টন। ফলে প্রতিবছর প্রায় ১৭ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি ডাল আমদানি করতে হয়।

মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, দেশে বৃহত্তর ফরিদপুর ও বরিশাল অঞ্চল ডাল ফসলের অন্যতম উৎপাদন এলাকা। দেশের মোট ডাল উৎপাদনের ৬০ শতাংশ মুগ, ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ খেসারি, ১৫ থেকে ২০ শতাংশ মসুর এবং সার্বিকভাবে প্রায় অর্ধেক ডাল এই অঞ্চলেই উৎপাদিত হয়। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কারণে এই অঞ্চলে জলাবদ্ধতা ও লবণাক্ততা বাড়ছে। এর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে ডালের আবাদ কমছে। এ পরিস্থিতিতে ডালের আবাদ বাড়াতে হলে জলবায়ু সহিষ্ণু জাত উদ্ভাবনের পাশাপাশি প্রয়োজন আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার।

এ প্রেক্ষাপটেই ডালের তিনটি উচ্চ ফলনশীল জাত ও ১৫টি লাগসই উৎপাদন প্রযুক্তি উদ্ভাবন, দেশ-বিদেশ থেকে ডালের ৭৫০টি জার্মপ্লাজম সংগ্রহ এবং ডালের প্রায় ১৫০ মেট্রিক টন বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে কৃষি মন্ত্রণালয় প্রকল্পটি প্রস্তাব করেছে। এর আওতায় নতুন জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা গেলে ফরিদপুর-বরিশাল অঞ্চলে ১১টি জেলার ৫০টি উপজেলায় ১৫০০টি মাঠ পর্যায়ে সেগুলোর উপযোগিতা যাচাই করা হবে।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা সারাবাংলাকে জানিয়েছেন, কৃষি মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব পাওয়ার পর গত বছরের ৮ জানুয়ারি প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় কিছু সুপারিশ দেওয়া হয়েছিল। সেগুলো প্রতিপালন করায় প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। অনুমোদন পেলে চলতি বছর শুরু হয়ে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএআরআই)।

পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানি ও পল্লী প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য রমেন্দ্রনাথ বিশ্বাস প্রকল্পটি নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনে ইতিবাচক মতামত দিয়েছেন। তিনি বলেন, এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলে প্রতিকূল পরিবেশ সহিষ্ণু, স্বল্প মেয়াদি, উচ্চ ফলনশীল ও জলবায়ু অভিযোজনশীল ডাল বীজ এবং ডাল আবাদের আধুনিক কিছু প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা সম্ভব হতে পারে। এতে করে ডালের আবাদ সম্প্রসারণ করা যাবে। ফলে ডালের উৎপাদন ও ফলনের হার বাড়বে।

ডালের উৎপাদন বাড়ানোর এই উদ্যোগ সরকারের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার নীতির অংশ বলে জানাচ্ছেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম। তিনি সারাবাংলাকে বলেন, অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ফসল খাতকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ফসলের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বাড়ানো, ফলনের ব্যবধান কমানো, কৃষকের মুনাফা বাড়ানো ও জলবায়ু নির্ভরশীল উৎপাদনের জন্য ফসলের বৈচিত্র্য আনার লক্ষ্য রয়েছে পরিকল্পনায়। এর মূল কারণ হলো খাদ্য নিরাপত্তার সুরক্ষা ও পুষ্টি নিশ্চিত করা।

শামসুল আলম বলেন, এ ক্ষেত্রে ডালের উৎপাদন সাড়ে ১০ লাখ মেট্রিন টন থেকে সাড়ে ১২ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই প্রকল্পটির আওতায় বৃহত্তর বরিশাল ও ফরিদপুর অঞ্চলের উপযোগী জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা গেলে  ডালের আবাদ বাড়বে। এটি অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও ভূমিকা রাখবে।

প্রকল্প প্রস্তাবনা থেকে জানা গেছে, জাত ও প্রযুক্তি উদ্ভাবনের পাশাপাশি মাদারীপুর আঞ্চলিক ডাল গবেষণাকেন্দ্রের অবকাঠামোগত বেশকিছু উন্নয়ন করা হবে এই প্রকল্পের আওতায়। সেখানে নতুন একটি ল্যাবরেটরি ভবন নির্মাণ করা হবে। এছাড়া বিদ্যমান ট্রেনিং কমপ্লেক্স কাম গেস্ট হাউজটি সম্প্রসারণ করা হবে; সেচ ও পানি সরবরাহের ব্যবস্থার জন্য পানি শোধন প্ল্যান্টও স্থাপন করা হবে। এছাড়া গবেষণা প্লট স্থাপনের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ ও ভূমি উন্নয়নের কাজগুলোও প্রকল্পের অধীনে করা হবে।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর