,



রাজনৈতিক দলের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী সরকারের দিকে তাকিয়ে ইসি

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য অন্তর্ভুক্তির সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার বিষয়ে সরকারের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এ পর্যন্ত আইন মন্ত্রণালয়ে এ সংক্রান্ত তিন ধরনের প্রস্তাব পাঠিয়েছে কমিশন। প্রথমটি হচ্ছে-কমিটিতে নারী নেতৃত্ব রাখাসহ কয়েকটি বিষয় বাদ দিয়ে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ (আরপিও) আইনে রূপান্তর। দ্বিতীয়ত, প্রস্তাবিত ‘নির্বাচন কমিশনে রাজনৈতিক দলসমূহের নিবন্ধন আইন-২০২০’ পাশ এবং এতে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া। তৃতীয়ত, আরপিওর হুবহু বাংলা অনুবাদ, যেখানে ২০২০ সালের মধ্যে সব স্তরের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন।

এ তিনটির মধ্যে কোন প্রস্তাবটি আইন মন্ত্রণালয় গ্রহণ বা ভেটিং করছে সে বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানতে পারেনি ইসি। এমন পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক দলগুলোর সব পর্যায়ের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখার বিষয়ে কী ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া যায়-সেটিও নির্ধারণ করতে পারছে না কমিশন। যদিও সম্প্রতি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখা হয়েছে কী না সেই তথ্য জানতে চেয়ে চিঠি দিয়েছে ইসি। সংশ্লিস্ট সূত্রগুলো এসব তথ্য জানিয়েছে।

তবে ইসি ও আইন মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, এই মুহূর্তে আরপিওর হুবহু বাংলা অনুবাদের কাজ চলছে। শেষ পর্যন্ত হুবহু বাংলা অনুবাদ হলে আরপিও’র ৯০বি ধারায় রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয়সহ সব স্তরের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারীদের জন্য সংরক্ষণ ও এসব পদ পূরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সময়সীমা ২০২০ সালই বহাল রাখা হবে। ইতোমধ্যে ওই সময়সীমা শেষ হয়ে গেছে। বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ কেউই নির্দিষ্ট সময়ে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। এ লক্ষ্য অর্জন করা ইসিতে নিবন্ধন পাওয়ার অন্যতম শর্ত ছিল। এছাড়া আরপিও হুবহু বাংলা অনুবাদ হলে এটির সংশোধনে ইসির দেওয়া প্রস্তাবনা ও প্রস্তাবিত রাজনৈতিক দল নিবন্ধন আইন-এ দুটি প্রস্তাব আলোর মুখ দেখবে কী না তা নিয়ে নতুন করে সংশয় তৈরি হবে। এতে রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখার বাধ্যবাধকতা আরোপের লক্ষ্য অর্জনের বাধ্যবাধকতায় শিথিলতা আসতে পারে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে নির্বাচন কমিশনার মো. রফিকুল ইসলাম যুগান্তরকে বলেন, রাজনৈতিক দলের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখার লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সময় বাড়ানোর প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। এ প্রস্তাবের বিষয়ে যতক্ষণ কোনো সিদ্ধান্ত আমাদের (ইসিকে) জানানো না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত সেটি বিবেচনাধীন তাই ধরে নেব। তিনি বলেন, কমিটিতে নারী সদস্য রাখার সর্বশেষ অবস্থা জানাতে রাজনৈতিক দলগুলোকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। তাদের জবাব কমিশন সভায় উপস্থাপনের পর করণীয় কী হবে তা নির্ধারণ করা হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইন মন্ত্রণালয় ও ইসির একাধিক কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, প্রস্তাবিত রাজনৈতিক দল নিবন্ধন আইন পাশ করার কোনো উদ্যোগ নেই সরকারের। এই আইনটি পাশ করতে হলে আরপিও থেকে রাজনৈতিক দল নিবন্ধন সংক্রান্ত ষষ্ঠ-ক অধ্যায়টি বাদ দিতে হবে। সরকারের উচ্চমহলও প্রস্তাবিত এ আইনটির পক্ষে নয়। যদিও এ বিধানটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অপরদিকে কোনো রাজনৈতিক দলই শর্ত অনুযায়ী ২০২০ সালের মধ্যে সব স্তরের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখার শর্ত পূরণ না করায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়াও ইসির পক্ষে সম্ভব হবে না। সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন যুগান্তরকে বলেন, নির্বাচন কমিশন সরকারের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে। সরকার রাজনৈতিক দলগুলোর কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য রাখার নতুন সময়সীমা বেঁধে দেওয়ার ওই প্রস্তাব গ্রহণ করবে কিনা- সেটি সরকারের ওপরই নির্ভর করছে। নির্বাচন কমিশনকেও সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর ভরসা করতে হবে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোকে নতুন সময়সীমা বেঁধে দিতে হলে সংসদে আরপিও সংশোধনীর বিল তুলতে হবে। এটি সরকারের কাজ, নির্বাচন কমিশনের নয়।

আইন সংশোধনে জটিলতা তৈরি হয় ইসিতে : সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এর আগে ২০১৭ সালে রাজনৈতিক দলগুলোকে চিঠি দিয়ে নারী নেতৃত্ব লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী অর্জিত হয়েছে কিনা-তা জানতে চায় ইসি। ওই সময়ে আওয়ামী লীগ জানিয়েছিল, ২০১৬ সালের কাউন্সিলে গঠিত কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটিতে ১৫ জন সদস্য রয়েছেন। ২০২০ সালের মধ্যে সব পর্যায়ের কমিটিতে ৩৩ শতাংশ নারী সদস্য নিশ্চিত করা হবে। অপরদিকে বিএনপি জানিয়েছিল সব পর্যায়ের কমিটিতে ১৫ শতাংশ নারী রয়েছেন। অন্যান্য রাজনৈতিক দল তাদের অবস্থান জানিয়েছিল। ওই তথ্য পাওয়ার পর কমিটিতে নারী নেতৃত্বের লক্ষ্য অর্জনে নির্বাচন কমিশন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। আইন করে রাজনৈতিক দলগুলোকে সময় বাড়িয়ে দেওয়ার প্রস্তাব করে।

আরও জানা গেছে, প্রস্তাব পাঠানোর ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করে ইসি। একেক সময়ে একেক ধরনের প্রস্তাব পাঠায়। প্রথমে ২০২০ সালে আরপিও সংশোধনী প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠায় ইসি। ওই প্রস্তাবে প্রার্থিতা বাতিলে ইসির ক্ষমতা বাতিল, নারী নেতৃত্ব রাখাসহ অনেক মৌলিক বিষয় বাদ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আরপিও অধ্যাদেশ থেকে আইনে রূপান্তরের প্রস্তাব করে ইসি। সেটিতে আপত্তি জানায় আইন মন্ত্রণালয়। ইসির দুজন যুগ্মসচিব ওই ঘটনায় ভুল স্বীকার করে নতুন করে সংশোধনী পাঠায়। একই বছরের শেষদিকে আরপিও থেকে রাজনৈতিক দল নিবন্ধন সংক্রান্ত অধ্যায় ‘ষষ্ঠ-ক’ আলাদা করে পৃথক নির্বাচন কমিশনে রাজনৈতিক দল নিবন্ধন আইনের প্রস্তাব পাঠায় কমিশন। এতে নারী নেতৃত্ব অর্জনে রাজনৈতিক দলগুলোকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময় দেওয়া হয়। সেটিও কয়েক মাস ধরে আইন মন্ত্রণালয়ে পড়ে আছে। সর্বশেষ আরপিওর হুবহু বাংলা অনুবাদ আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে কমিশন। এতে নারী নেতৃত্ব অর্জনের সময়সীমা ২০২০ সালই রাখা হয়েছে। আরপিওতে এ সময়সীমা সংশোধনে নতুন করে কোনো প্রস্তাব আইন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়নি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসির ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা যুগান্তরকে বলেন, আরপিও নিয়ে ইসি থেকে বারবার সংশোধনী প্রস্তাব পাঠানোয় নানা ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে। এতে নারী নেতৃত্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের বাধ্যবাধকতা আরোপের বিষয়টি আড়াল হয়ে গেছে। এখন পুরো বিষয়টি আইন মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর করছে। অপরদিকে আইন মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, ইসি থেকে নতুন কোনো প্রস্তাব না আসায় তারা আরপিও হুবহু বাংলা অনুবাদ ভেটিংয়ের কাজ করছেন। ইসি নতুন কোনো প্রস্তাব দিলে আরপিও সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। ওই সংশোধন প্রক্রিয়া অনেক দীর্ঘ ও সময়সাপেক্ষ বিষয়।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর