,



ঢাকা ঘিরে ‘লকডাউন’ দূরপাল্লার বাস বন্ধ

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ ঢাকাসহ দেশের বেশির ভাগ এলাকায় এখন ছড়িয়ে পড়েছে করোনাভাইরাসের ডেল্টা ভেরিয়েন্টসহ আরো একাধিক ভেরিয়েন্ট। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার এবার ঢাকার পাশের নতুন কয়েকটি এলাকায় লকডাউন ঘোষণা করেছে, যার মাধ্যমে কার্যত রাজধানী ঢাকার সঙ্গে অন্য সব এলাকার যাতায়াত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে আজ মঙ্গলবার সকাল থেকে। ঢাকা থেকে সারা দেশে দূরপাল্লার বাস ও সব ধরনের যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ থাকবে। তবে ট্রেন চললেও যেসব এলাকায় লকডাউন জারি রয়েছে, সেসব জায়গায় থামবে না। ঢাকায়ও গণপরিবহন, শপিং মল ও রেস্টুরেন্টে স্বাস্থ্যবিধি মানতে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিমান চলাচলে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত নেই বলে জানিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।

গতকাল সোমবার রাতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ জানান, মঙ্গলবার থেকে সারা দেশে দূরপাল্লার বাস চলাচল বন্ধ থাকবে।

গতকাল মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এক প্রজ্ঞাপনে আজ (মঙ্গলবার) সকাল ৬টা থেকে ৩০ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত ঢাকাকে ঘিরে থাকা সাতটি জেলায় কঠোর লকডাউন ঘোষণা করে। জেলাগুলো হচ্ছে মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ী ও গোপালগঞ্জ। এই জেলাগুলোতে আগামী ৯ দিন জরুরি পরিষেবা ছাড়া সব ধরনের কার্যক্রম ও চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।

এনায়েত উল্লাহ জানান, সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি বাস চলাচল বন্ধ রাখার নির্দেশনাই পেয়েছে। তিনি বলেন, ‘ঢাকার চারপাশের জেলাগুলো দিয়েই অন্যান্য জেলার যানবাহন চলে। যেহেতু এসব এলাকা লকডাউন, তাই দূরপাল্লার যানবাহন বন্ধ থাকছে।’ দেশের যেকোনো স্থান থেকে ঢাকায় ঢুকতে হলে মানিকগঞ্জ কিংবা নারায়ণগঞ্জ কিংবা মুন্সীগঞ্জ কিংবা গাজীপুর হয়ে আসতে হয়।

এ ব্যাপারে গতকাল রাতে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের এক বৈঠক বসে। সূত্র জানায়, ওই বৈঠকে করোনা মোকাবেলায় আরো বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে ঢাকার বাইরে নতুন নতুন জেলায় সংক্রমণ বেড়ে গেছে দ্রুত। এমনকি কোথাও কোথাও আগের সব রেকর্ড ভেঙে শনাক্ত হার অনেক ওপরে উঠে গেছে। দিনাজপুরে ৮১ শতাংশ ছাড়িয়েছে শনাক্ত হার। বিশেষজ্ঞরা বিষয়টি চরম উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন। এমনকি ঢাকার লাগোয়া গাজীপুরেও শনাক্ত হার গতকাল উঠেছে ৪৪ শতাংশে। যদিও ঢাকায় তা ১২ শতাংশে ছিল। তবে যশোরে ৪৭ শতাংশ, চুয়াডাঙ্গায় ৫০ শতাংশ, পিরোজপুরে ২৬ শতাংশ বলে তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

এদিকে দেশের কোথাও কোনোভাবেই বিধি-নিষেধ বা ‘লকডাউন’ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। উপজেলা থেকে রাজধানী—একই অবস্থা। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্তরা বলছেন, জাতীয় কারিগরি কমিটি যেভাবে চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করতে বলে, বাস্তবে তা সম্ভব নয়। এর পরও প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হয়। কিন্তু স্থানীয় কিছু বাস্তবতা উপেক্ষা করার সুযোগ থাকে না। এই পরিস্থিতিতে এখন ঢাকাকে বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নিল সরকার। আজ সকাল ৬টা থেকে ৩০ জুন মধ্যরাত পর্যন্ত ঢাকাকে ঘিরে থাকা সাতটি জেলায় কঠোর লকডাউন ঘোষণা করে গতকাল সোমবার প্রজ্ঞাপন জারি করেছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের উপসচিব রেজাউল ইসলাম স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে মানিকগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, গাজীপুর, মাদারীপুর, রাজবাড়ী ও গোপালগঞ্জে এ বিধি-নিষেধের আওতায় থাকার কথা জানানো হয়েছে। এর বাইরে দেশের আরো কয়েকটি জেলায় আংশিক লকডাউনের কার্যক্রম চলছে। নতুন ঘোষিত সাতটি জেলার লকডাউনে সরকারি-বেসরকারি সব ধরনের প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে বলে মন্ত্রিপরিষদসচিব খন্দাকার আনোয়ারুল ইসলাম জানিয়েছেন। তবে প্রজ্ঞাপনে শিল্প-কলকারখানা বন্ধ নাকি খোলা থাকবে সে বিষয়ে কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেও নিশ্চিত কোনো তথ্য জানা যায়নি। গাজীপুরের ডিসি এস এম তরিকুল ইসলাম গতকাল সন্ধ্যায় কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ না থাকায় আমরাও বিষয়টি পরিষ্কার না। মন্ত্রিপরিষদ থেকে নির্দেশনা পাওয়ার অপেক্ষায় আছি।’ সন্ধ্যা ৭টার দিকে মন্ত্রিপরিষদসচিব খুলনার বিভাগীয় কমিশনারসহ বিভাগের সব জেলার ডিসিদের সঙ্গে বৈঠক করছিলেন বলে জানা গেছে।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘বিধি-নিষেধের সময়ে সাত জেলায় সার্বিক কার্যাবলি ও চলাচল (জনসাধারণের চলাচলসহ) বন্ধ থাকবে। তবে আইন-শৃঙ্খলা ও জরুরি পরিষেবা, যেমন—কৃষি উপকরণ (সার, বীজ, কীটনাশক, কৃষি যন্ত্রপাতি ইত্যাদি), খাদ্যশস্য ও খাদ্যদ্রব্য পরিবহন, ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা, কভিড-১৯ টিকা প্রদান, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস-জ্বালানি, ফায়ার সার্ভিস, বন্দরসমূহের (নদীবন্দর) কার্যক্রম, টেলিফোন ও ইন্টারনেট (সরকারি-বেসরকারি), গণমাধ্যম (প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া), বেসরকারি নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ডাক সেবাসহ অন্যান্য জরুরি ও অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ও সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অফিস, তাদের কর্মচারী ও যানবাহন এবং পণ্যবাহী ট্রাক-লরি এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে না।’

প্রজ্ঞাপন জারির পর মন্ত্রিপরিষদসচিব নিজেও গণমাধ্যমে কথা বলেন। তিনি জানান, মঙ্গলবার লকডাউন চলাকালে সরকারি-বেসরকারি সব অফিস বন্ধ থাকবে। মানুষও যাতায়াত করতে পারবে না। মালবাহী ট্রাক ও অ্যাম্বুল্যান্স ছাড়া কিছু চলবে না। শুধু কয়েকটা বিশেষ সার্ভিস ছাড় পাবে। জেলাগুলো ব্লকড থাকবে, কেউ ঢুকতে পারবে না।

অন্যদিকে উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা দিনাজপুর সদরে শনাক্তের হার সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ৮১.৬ শতাংশে ওঠায় সেখানকার লকডাউনের সময়সীমা আরো সাত দিন বৃদ্ধি করেছে জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটি। দ্বিতীয় পর্যায়ে বৃদ্ধি হওয়া কঠোর লকডাউন চলবে ২৮ জুন পর্যন্ত। দিনাজপুর এম আব্দুর রহিম মেডিক্যাল কলেজে আরেকটি পিসিআর ল্যাব স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

করোনাভাইরাস সংক্রমণের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় খুলনায় ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে খুলনা সিটি করপোরেশন (কেসিসি), জেলা প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও রাজনৈতিক দলগুলো। গতকাল নগরীর বিভিন্ন ওয়ার্ডে মাইকিং ও প্রচারণা চালানো হয়েছে। এর আগে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করে জেলা প্রশাসন। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, মহানগরীর তিনটি থানা ও জেলার একটি উপজেলায় কঠোর বিধি-নিষেধ দেওয়া হলেও ১৭ দিনে সংক্রমণ হারে তেমন কোনো প্রভাব পড়েনি। এ অবস্থায় কঠোর লকডাউন ছাড়া বিকল্প কিছু নেই। খুলনায় সর্বশেষ করোনা শনাক্ত হার দেখা গেছে ৩৩.৩ শতাংশ। বর্ধিত সময়সীমা অনুসারে খুলনায় আগামী ২৮ জুন পর্যন্ত লকডাউন চলবে। জেলার অভ্যন্তরে অথবা আন্ত জেলা গণপরিবহন চলাচল বন্ধ থাকবে। খুলনা রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেনের আগমন ও বহিরাগমন বন্ধ থাকবে।

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে ক্রমেই বাড়ছে করোনা রোগীর সংখ্যা। রাজশাহীসহ এর আশপাশের জেলা থেকে প্রতিনিয়ত হাসপাতালটিতে করোনায় আক্রান্ত এবং উপসর্গ নিয়ে রোগীরা ভর্তি হচ্ছে। তাদের জন্য একের পর এক ওয়ার্ড সংখ্যা বৃদ্ধি করা হচ্ছে। রামেকের করোনা ইউনিটে রবিবার সকাল ৮টা থেকে সোমবার (২১ জুন) সকাল ৮টা পর্যন্ত ১৩ জন মারা যায়। এ নিয়ে চলতি মাসে এই হাসপাতালে করোনা ইউনিটে মারা গেল ২১৬ জন।

রামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বলেন, করোনার জন্য ১০টি আইসিইউ নির্ধারণ করা হলেও পর্যায়ক্রমে বাড়িয়ে তা ২০টি করা হয়েছে। তবুও জায়গার সংকুলান হচ্ছে না। আরো একটি সাধারণ ওয়ার্ডকে কভিড ওয়ার্ডে রূপান্তর করার কাজ চলছে।

টাঙ্গাইলে সংক্রমণ বৃদ্ধি পাওয়ায় টাঙ্গাইল সদর ও এলেঙ্গা পৌর এলাকায় আজ থেকে সাত দিনের কঠোর লকডাউন জারি করেছে জেলা প্রশাসন। গত রবিবার দুপুরে জেলা করোনা প্রতিরোধ কমিটির সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জেলা প্রশাসক ড. মো. আতাউল গণি জানান, করোনাভাইরাস নিয়ন্ত্রণ করতে টাঙ্গাইল ও এলেঙ্গা পৌর এলাকায় ২২ থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত কঠোর লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছে।

বগুড়ায় গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় এক চিকিৎসকসহ তিনজন প্রাণ হারিয়েছে। গত পাঁচ দিনে এখানে করোনায় মৃত্যু হলো ১৬ জনের।

সংক্রমণ প্রতিরোধে ফরিদপুরে সোমবার ভোর থেকে সাত দিনের কঠোর লকডাউন শুরু হয়েছে। জেলা প্রশাসক অতুল সরকার রবিবার এক গণবিজ্ঞপ্তিতে ফরিদপুর, ভাঙ্গা ও বোয়ালমারী পৌর এলাকায় লকডাউনের ঘোষণা দেন।

এদিকে জয়পুরহাট, পাঁচবিবি ও কালাই পৌরসভায় বিকেল ৫টা থেকে পরের দিন ভোর ৬টা পর্যন্ত বিশেষ স্বাস্থ্যবিধি আরোপ করেছে স্থানীয় প্রশাসন। এ সময়ে ওষুধের দোকানসহ জরুরি কার্যক্রম ছাড়া সব কিছুই বন্ধ থাকছে। কিন্তু তাতেও কমছে না সংক্রমণের হার। প্রতিদিন নমুনা পরীক্ষায় আক্রান্তের হার শতকরা ২২-এর ওপরে থাকছে।

মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. জীবিতেশ বিশ্বাস বলেন, করোনা আক্রান্ত হয়ে রবিবার একজন ও সোমবার দুজন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে। এর আগে হাসপাতালে করোনায় মারা গেছে আরো পাঁচজন। সোমবার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৪ জন করোনা পরীক্ষা করিয়েছে। এর মধ্যে ছয়জনের পজিটিভ শনাক্ত হয়েছে।

ঝিনাইদহে গত ২৪ ঘণ্টায় করোনায় মারা গেছে আরো চারজন। নতুন শনাক্ত হয়েছে ৯৫ জনের। এ নিয়ে জেলায় মোট আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়াল তিন হাজার ৪৯১ জন। জেলা শহরসহ উপজেলাগুলোর পৌর এলাকা লগডাউন ঘোষণা করা হয়েছে। সিভিল সার্জন ডা. সেলিনা বেগম জানান, সোমবার সকালে ঝিনাইদহ ও কুষ্টিয়া ল্যাবে পরীক্ষা করা ২০৫ জনের মধ্যে ৯৫ জনের করোনা শনাক্ত হয়েছে।

নাটোরে আরপিটিসিআর পরীক্ষায় ৩২১ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৬০ জন, র‌্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্টে ১৭১ জনের নমুনা পরীক্ষা করে ৫৮ জন এবং জিন এক্সপার্টে ৫০ জনের জনের নমুনা পরীক্ষা করে ২৭ জনের করোনা পজিটিভ হয়েছে। শনাক্তের হার ৩৩.৭৯ শতাংশ।

এই প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন রাজশাহী, খুলনা, বগুড়া, রংপুর, নাটোর, ফরিদপুর, দিনাজপুর, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ, জয়পুরহাট, টাঙ্গাইল, ঠাকুরগাঁও, রাজবাড়ী, নওগাঁ, মোংলা, হিলি, লোহাগড়াসহ অন্যান্য এলাকার নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর