,



চ্যালেঞ্জ জেনেও খাবার ডেলিভারির কাজে নারী

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ নিজের আর্থিক সচ্ছলতার জন্য মেয়েরা আজ ডেলিভারি ওম্যানের কাজে যুক্ত হতেও পিছপা হচ্ছেন না। করোনা মহামারিতে অনেকেরই চাকরি চলে যায়। জীবন বাঁচাতে তারা খুঁজে নেন ভিন্ন জীবিকা। সেখানে চ্যালেঞ্জ আছে জেনেও এ দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের একজন শুক্লা। একটি খাবার পৌঁছে দেওয়ার প্রতিষ্ঠানে ‘ডেলিভারি ওম্যান’ হিসেবে কাজ করছেন জুলাই মাসের ৫ তারিখ থেকে। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অন্য একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করে সংসারের খরচ মেটাতে পারেন না বলে প্রথা ভেঙে যোগ দেন ‘ডেলিভারি ওম্যান’ হিসেবে। 

শুক্লা জানান, ভালো একটি চাকরি করতেন তিনি। করোনাকালে চাকরি চলে গেলে অসুস্থ বাবা, ছোট ভাইবোন ও মাকে নিয়ে বিপদে পড়ে যান। অল্প দিনের মধ্যে আর একটি চাকরি জোগাড় হলেও বেতন যা পান, তা দিয়ে বাবার ওষুধ, ছোট ভাইয়ের পড়ার খরচ, বোনের চাহিদা মেটানো সম্ভব ছিল না। সঙ্গে আছে ব্যাংক ঋণের কিস্তি। বাবার চিকিৎসার জন্য তাকে ব্যাংক থেকে ৭ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে চেন্নাই যেতে হয়। তাই অফিস ছুটির পরে রাত ১০টা পর্যন্ত ‘ডেলিভারি ওম্যান’ হিসেবে কাজ করছেন। প্রতিদিন পাঁচ-সাতটি অর্ডার পৌঁছে দিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে তার রাত ১১টা, সাড়ে ১১টা বেজে যায়। মা থাকেন অপেক্ষায়। শুক্লা মেয়ে বলেই কাজটা তার পছন্দ নয়।

কাজ করতে কেমন লাগছে জানতে চাইলে বলেন, এক দিন কাজ না করলে বাবার ওষুধ কেনা, সংসারের খরচে টানাটানি হয়। আজ অপেক্ষা করছি, কাল টাকা পেয়ে বাবার ওষুধ কিনব। সংসারের বড় সন্তান হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালনের কথা অকপটে স্বীকার করে শুক্লা বলেন, ‘বাবা যখন ভালো ছিলেন, আমরা অনেক উন্নত জীবন যাপন করেছি। বাবা মিরপুরে একটা ফ্ল্যাট কিনেছেন বলে এখন বাড়ি ভাড়া দিতে হচ্ছে না।’ মিরপুর বাঙলা কলেজ থেকে অ্যাকাউন্টিংয়ে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেছেন। একটি ফার্ম থেকে শুক্লা চার বছরের চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের কোর্সও করেছেন। একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে ভালো বেতনে চাকরি জুটেছিল। গত বছর করোনার কারণেই ছাঁটাই করা হয় তাকে। তারপর শুরু হয় ধারদেনা করে চলা। পাশাপাশি ব্যাংকের কিস্তি। তাই মোটরবাইক নিয়ে একটি খাদ্য সরবরাহ প্রতিষ্ঠানে যোগ দিতে বাধ্য হন।

শুক্লা জানান, ২০১৮ সালে এ সংস্থাতেই হিসাব বিভাগে কাজ করার সুযোগ হয় তার। সে সময় একটি দুর্ঘটনায় পায়ে ব্যথা পেলে তা আর করা হয়নি। আজ একই প্রতিষ্ঠানে অন্য পরিচয়ে কাজ করছেন। রাত-বিরাতে একজন ‘ডেলিভারি ওম্যানের’ জায়গায় শুক্লাকে দেখে মানুষের কেমন অনুভূতি হয়, কিংবা মেয়ে হিসেবে এই কাজ করতে সহযোগিতা কেমন পান প্রশ্ন করলে হেসে শুক্লা বলেন, “প্রতিষ্ঠান আমাদের পুরো সহযোগিতা করে। আমাদের দেশের মানুষ এখনো অনেক ভালো। আমি যখন খাবার নিয়ে যাই, তখন কারো কাছে ‘এই বাড়িটা কোন দিকে’ জানতে চাইলে তারা আমাকে সম্মানের সঙ্গে দেখিয়ে দেয়। একজন মেয়ে এই কাজ করছে বলে তাদের চোখে একরকমের ভালোলাগাও থাকে। ফোনে খাবার পৌঁছে দেওয়ার সময় একজন নারী কণ্ঠ শুনলে অনেক গ্রাহক নিচে নেমে এসে খাবার নিয়ে যান। আমাকে চার-পাঁচতলা সিঁড়ি ভাঙতে হয় না। আবার কেউ কেউ ঠিকানা না চিনতে পারলে রেগেও যান। তখন খারাপ লাগে।” শুক্লা জানান, তার কাজের এরিয়া মিরপুর। এখানে প্রথম দিকে কাজ করতে তার ভয় লাগত। কিন্তু এখন সব ভয়কে জয় করে কাজ করছেন তিনি। কীভাবে মোটরবাইক চালনা শিখলেন প্রশ্ন করলে বলেন, বাবা সব সময় বলতেন, মেয়েদের সব কাজ শিখে রাখা ভালো। কখন কোনটা কাজে লাগবে। তাই শখ করেই মোটরসাইকেল চালানো শিখেছিলেন। আর এর জন্যই চাকরিটা পেয়েছেন। বন্ধু আনুশকা একটা মোটরসাইকেল উপহার দেন। সেটা দুই-এক দিন পর পর বিগড়ে যায়। তার পরও আস্তেধীরে চালিয়ে শুক্লা খাবার পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব পালন করেন। নিজেকে নিয়ে স্বপ্ন কী জানতে চাইলে শুক্লা বলেন, ‘একটা ভালো চাকরি! আগে বাবা চোখে কম দেখতেন। এখন বাবার হার্টেরও সমস্যা। আমি যে পড়াশুনা করেছি, তাতে একটি ভালো বেতনের কাজ চাই, বাবার হার্টের চিকিত্সা করাতে, পাশপাশি সংসার চালাতে।’

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর