,



খাদ্য-পানি সঙ্কট, ভাঙনে দিশেহারা বানভাসিরা

বাঙালী কণ্ঠ নিউজঃ কয়েক দিন ধরে চলা বন্যায় দুর্ভোগ বেড়েছে বানভাসি মানুষের। রয়েছে খাদ্য ও খাবার পানি সঙ্কট। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে তীব্র নদীভাঙন। পানিবাহিত রোগে আক্রান্তের হারও বেড়েছে। গত দু’দিনে পানিতে ডুবে গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামে দুজন করে চারজনের মৃত্যু হয়েছে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় প্রধান নদীগুলোর পানি বাড়ার হার কমেছে। তিস্তা নদীর পানি কমায় লালমনিরহাটে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। অবনতি হয়েছে বগুড়া, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ ও জামালপুরে। অন্যদিকে ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে মৌলভীবাজারের বড়লেখায় বন্যা পরিস্থিতি ফের অবনতি হয়েছে।   গতকাল পানি উন্নয়ন বোর্ড বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের পূর্বাভাসে বলা হয়, ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, পদ্মা ও সুরমা নদীর পানি বাড়ছে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনা নদীর পানি আজ পর্যন্ত বৃদ্ধি অব্যাহত থাকতে পারে। তবে আগামীকাল স্থিতিশীল থাকতে পারে। পদ্মা নদীর পানি আগামীকাল পর্যন্ত বৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর পানি আজ পর্যন্ত স্থিতিশীল থাকতে পারে। ১০টি নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এদের মধ্যে যমুনা বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে ৮৬ সেন্টিমিটার ও সারিয়াকান্দিতে ৫৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় বাহাদুরাবাদে যমুনার পানি বেড়েছে ৬ সেমি ও সারিয়াকান্দি পয়েন্টে ৩ সেমি বেড়েছে। এ ছাড়াও ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, ঘাঘট, কপোতাক্ষ, ধলেশ্বরী, আত্রাই, সুরমা, কুশিয়ারা ও কংস নদীর পানি বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জেলার চারটি উপজেলার ২৯টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানিতে ডুবে সদর উপজেলার কামারজানি ইউনিয়নে বুধবার দেড় বছরের সুমাইয়া খাতুন এবং গতকাল দুপুরে ফুলছড়ি উপজেলার রতনপুর চরে মিনহাজ নামে চার বছরের এক শিশু মারা যায়। বর্তমানে বন্যা কবলিত এলাকার পানিবন্দি মানুষ খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি সঙ্কট, পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাসহ নানা সমস্যায় দিনাতিপাত করছে। তারা গো-খাদ্যের অভাবে গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি নিয়েও বিপাকে পড়েছে। জেলা প্রশাসক গৌতম চন্দ্র পাল জানান, ২৪টি বন্যা আশ্রয় কেন্দ্রে সাড়ে ৩ হাজার মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। এদিকে ২৪১ হেক্টর জমির পাট, আউশ ধান, আমন বীজতলা ও শাকসবজি বন্যার পানিতে নিমজ্জিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বগুড়া অফিস জানায়, যমুনার পানি গতকাল দুপুর পর্যন্ত না বাড়লেও বিপদসীমার ৫৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। চর এলাকায় তীব্র নদীভাঙন দেখা দিয়েছে। গত দু’দিনে সারিয়াকান্দির তিনটি ইউনিয়নের ৪৮০টি পরিবার গৃহহীন হয়ে পড়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, গত ১২ ঘণ্টায় যমুনার পানি স্থিতি অবস্থায় রয়েছে। বগুড়ার যমুনা তীরবর্তী তিন উপজেলা সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনটের ৯২টি গ্রামের প্রায় ৭২ হাজার মানুষ বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সারিয়াকান্দি উপজেলা। এখানে বন্যাকবলিত হয়েছে ৫৮টি গ্রামের ১১ হাজার ৭২০টি পরিবার। বন্যার্তদের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের আশ্রয় নেওয়া লোকজনের সংখ্যা। কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, প্লাবিত হয়ে পড়েছে নতুন নতুন এলাকা। এসব এলাকার পানিবন্দি দুই লক্ষাধিক মানুষ মানবেতর জীবনযাপন করছে। বুধবার বিকেলে বন্যার পানিতে ডুবে দুজনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতরা হলেন-চিলমারী উপজেলার শাখাহাতি গ্রামের সাইদুল ইসলামের মেয়ে লাইলী বেগম (২৮) ও সদর উপজেলার সদর উপজেলার খামার হলোখানা গ্রামের পনির উদ্দিনের ছেলে হামিদুল হক (১৭)। স্বাস্থ্য বিভাগের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীর ছুটি বাতিল করে জেলায় ৮৭টি মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। অন্যদিকে ব্রহ্মপুত্র নদের প্রবল সে াতে চিলমারী উপজেলার কাঁচকোলে ডান তীর রক্ষা প্রকল্পের ৫০ মিটার বাঁধ ও রৌমারী উপজেলার যাদুর চরে কত্তিমারী বাজার রক্ষা বাঁধ ভেঙে নতুন করে ৫০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। জেলার ৯ উপজেলার মধ্যে ৭ উপজেলার ৪২ ইউনিয়নের ৫শ’ গ্রামের দুই লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি জীবনযাপন করছে। অনেক পরিবার বাড়িঘর ছেড়ে উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিলেও এসব এলাকায় খাদ্য ও বিশুদ্ধ খাবার পানির তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, যমুনা নদীতে অব্যাহত পানি বৃদ্ধির ফলে সিরাজগঞ্জের বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। এতে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সর্বশেষ পাওয়া তথ্য মতে, এ পর্যন্ত জেলার ৫টি উপজেলার ৩৮টি ইউনিয়নের ২২২টি গ্রাম বন্যাকবলিত হয়েছে। গতকাল সন্ধ্যায়  সিরাজগঞ্জের কাছে যমুনা নদীতে বিপদসীমার ৭৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জামালপুর প্রতিনিধি জানান, বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়েছে। ফলে জেলার ৩২০টি গ্রামের প্রায় দুই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। বন্যার পানি ঢুকায় জেলায় ২৩০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ৮টি কলেজ, ৫০টি উচ্চ বিদ্যালয় ও ২৪টি মাদ্রাসা বন্ধ হয়ে গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অফিস জানায়, বন্যার পানি প্রবেশ করায় জেলার সাতটি উপজেলার ৪ হাজার ৯৯৬ হেক্টর জমির ফসল তলিয়ে গেছে। এদিকে বন্যাকবলিত এলাকায় বিশুদ্ধ খাবার পানি ও গো-খাদ্যের সঙ্কট দেখা দিয়েছে। সরিষাবাড়ী সংবাদদাতা জানান, জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে যমুনা ও যমুনার শাখা নদীগুলোতে বন্যার পানি ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। নিচু ও চরাঞ্চলের নতুন নতুন এলাকা প্রতিদিন প্লাবিত হচ্ছে। উপজেলার সাতপোয়া, পোগলদিঘা, আওনা, পিংনা, ভাটারা ও কামরাবাদ ইউনিয়নের শতাধিক ঘরবাড়ি নতুন করে প্লাবিত হওয়ায় মানবেতর জীবনযাপন করছে বন্যাকবলিত মানুষ। বন্যাকবলিত এলাকায় খাবার পানি ও খাদ্য সঙ্কট দেখা দিয়েছে। ছড়িয়ে পড়ছে নানা পানিবাহিত রোগব্যাধি। এ ছাড়া গবাদিপশু, শিশু, বৃদ্ধ ও রোগী নিয়ে বিপাকে পড়েছে মানুষ। বড়লেখা সংবাদদাতা জানান, মৌলভীবাজারের বড়লেখায় বন্যা পরিস্থিতি ফের অবনতি হয়েছে। গত কয়েক দিন ভারি বৃষ্টিপাত না হওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছিল। কিন্তু গতকাল রাতের কয়েক ঘণ্টার ভারি বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বন্যা পরিস্থিতি আবারও অবনতি হয়েছে। ফলে আবারও বাড়িঘর-রাস্তাঘাট ডুবতে শুরু করেছে। এতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বন্যার অবনতি ঘটায় উপজেলার তালিমপুর, বর্নি, সুজানগর, উত্তর শাহবাজপুর, দাসেরবাজারসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে ১৪টি আশ্রয় কেন্দ্র খোলা হয়। এসব আশ্রয় কেন্দ্রে বাড়িঘর তলিয়ে যাওয়া দুর্গত ২৫৩ পরিবার আশ্রয় নেয়। এদিকে গত কয়েক দিন তেমন ভারি বৃষ্টি না হওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছিল। অধিকাংশ গ্রামের রাস্তাঘাট ও বাড়িঘর থেকে পানি নামতে শুরু করায় অনেকেই বাড়ি ফিরতে শুরু করেছিলেন। লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানান, ভারি বর্ষণ ও ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল কিছুটা কমে যাওয়ায় লালমনিরহাটে সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি উন্নতি হয়েছে। গতকাল সকাল ৭টায় তিস্তা ব্যারাজের দোয়ানী পয়েন্টে পানি কমে প্রায় স্বাভাবিক অবস্থায় রয়েছে।   তবে এখনও নদী তীরবর্তী চরাঞ্চলের বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে অন্তত ৩০ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। এসব মানুষের দুর্ভোগ কমেনি। তাদের মাঝে যে পরিমাণ ত্রাণ বিতরণ করা হয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল বলে জানিয়েছে ভুক্তভোগীরা।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর