জোটের খেলা শেষ, ভোটের খেলা শুরু

সংসদ নির্বাচনে কোনো দল জোটগতভাবে অংশ নিয়ে জোটভুক্ত দলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করতে চাইলে তফসিল ঘোষণার তিন দিনের মধ্যে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) কাছে আবেদন করার বিধান রয়েছে। গত বুধবার দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়। সেই হিসাবে গতকাল শনিবার ছিল ইসিতে এ সংক্রান্ত আবেদন করার শেষ দিন। এ সময়কালে ১০টি দল জোটগতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়টি ইসিকে অবহিত করেছে। তার মধ্যে ৬টি দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করার কথা জানিয়েছে। জোটবদ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে ইসির বেঁধে দেওয়া সময়সীমা শেষ অর্থাৎ জোট বাঁধার খেলা শেষ।

শুরু হয়ে গেছে ভোটের খেলা। তফসিল ঘোষণার পরপরই মাঠে নেমেছে বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ছাড়াও ২টি দল ইতোমধ্যে মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু করেছে। একাদশ সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও নির্বাচনী মাঠে নেমে পড়ার বার্তা দিয়ে দিয়েছে; গতকাল ইসিতে জমা দিয়েছে দলের পক্ষ থেকে মনোনয়ন শনাক্তকারীর নাম। অন্যদিকে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠনের দাবিতে আন্দোলনরত বিএনপি ও সমমনা দলগুলোর নির্বাচনে অংশগ্রহণ এখনো অনিশ্চিত। ইতোমধ্যেই তারা ঘোষিত তফসিলও বর্জন করেছে।

নির্বাচনের মাঠে এ পর্যন্ত যে কয়টি দল নেমেছে, তাদের অধিকাংশই জোটবদ্ধ হয়েই লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ইসির অতিরিক্ত সচিব অশোক কুমার দেবনাথ গতকাল বলেন, আজ জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আবেদন জমা দেওয়ার শেষ দিন। আওয়ামী লীগ বলেছে, তারা জোটবদ্ধভাবে নৌকা প্রতীক নিয়ে সংসদ নির্বাচন করবে। আর সভাপতির স্বাক্ষরে তারা নমিনেশন দেবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ কোন কোন দলের সঙ্গে জোট করবে এ কথা তাদের চিঠিতে বলা নেই। সাম্যবাদী দল, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি বলেছে, নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করবে। গণতন্ত্রী পার্টিও নৌকা প্রতীকে ভোট করার কথা জানিয়ে চিঠি দিয়েছে।

ইসির অতিরিক্ত সচিব জানান, তারা জাপার দুটি চিঠি পেয়েছেন। জিএম কাদের তার চিঠিতে উল্লেখ করেছেন, তার স্বাক্ষরে দলীয় মনোনয়ন হবে। অন্যদিকে দলটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ বলেছেন, তারা জোটে ভোট করবেন। কোনটি আমলে নেবেন? এমন প্রশ্নে অশোক কুমার দেবনাথ বলেন, এটা কমিশন দেখবে। দুটি চিঠি এসেছে। কমিশন যেটি আমলে নেয়।

জানা গেছে, জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করার বিষয়টি ইসিকে জানিয়েছে যেসব দল, সেগুলো হচ্ছে- আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি (জেপি), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, তরীকত ফেডারেশন, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল, জাতীয় পার্টি (জাপা), বিকল্পধারা বাংলাদেশ ও তৃণমূল বিএনপি।

এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ছাড়াও জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি, তরীকত ফেডারেশন, জেপি, সাম্যবাদী দল ও গণতন্ত্রী পার্টি নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করবে বলে ইসিকে জানিয়েছে। এদিকে গণতন্ত্রী পার্টি দুই ভাগে বিভক্ত হওয়ায় কোন অংশটি নিবন্ধিত, তা পরিষ্কার নয়। গণতন্ত্রী পার্টির দুই অংশ ইসিতে পৃথক চিঠি দিয়েছে।

এর বাইরে জাতীয় পার্টি ও বিকল্পধারা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেবে বলে জানিয়েছে। তারা সুনির্দিষ্টভাবে নৌকা প্রতীক চায়নি। বিকল্পধারা বলেছে, পরবর্তী সময় জোটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জোটগত প্রতীকে তারা নির্বাচন করতে আগ্রহী। আর জাতীয় পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ চিঠি দিয়ে বলেছেন, নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থীরা দলীয় প্রতীক ‘লাঙল’ বা প্রার্থীর ইচ্ছা অনুসারে মহাজোটে জোটবদ্ধ হয়ে নির্বাচন করতে পারবেন।

এদিকে আওয়ামী লীগের চিঠিতে বলা হয়েছে, তারা জোটগতভাবে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করবে। তবে তাদের সঙ্গে কোন কোন দল থাকবে, সেটা চিঠিতে বলা হয়নি। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ জানিয়েছে দলটির সভাপতি শেখ হাসিনার স্বাক্ষরে তারা মনোনয়ন দেবে।

আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া বলেন, আমরা নির্বাচন কমিশনে চিঠি দিয়েছি। সেখানে বলেছি, আওয়ামী লীগ একক ও জোটবদ্ধ দুভাবেই নির্বাচন করবে। কোনো আসনে জোটবদ্ধ আর কোনো আসনে এককভাবে দলীয় প্রার্থী দেওয়া হবে, সেটা মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন ১৭ ডিসেম্বর জানানো হবে।

এ ছাড়া নতুন নিবন্ধন পাওয়া রাজনৈতিক দল তৃণমূল বিএনপি ইসিকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছে, প্রগতিশীল ইসলামী জোটের প্রার্থীরা তৃণমূল বিএনপির দলীয় প্রতীক সোনালি আঁশ নিয়ে নির্বাচনে অংশ নেবে। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এই জোটে ১৫টি রাজনৈতিক দল আছে। তবে এই দলগুলোর কোনোটিই নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত নয়। ইসিতে নিবন্ধিত না হলে কোনো দল আনুষ্ঠানিকভাবে জোটবদ্ধ হওয়ার সুযোগ নেই। এসব দলের কেউ সোনালি আঁশ প্রতীকে নির্বাচন করলে তারা সরাসরি তৃণমূল বিএনপির প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হবেন।

এদিকে আওয়ামী লীগ, বিএনএফ, জাসদ দলীয় মনোনয়নপত্র বিক্রি শুরু করেছে।

দলগুলোকে প্রার্থী মনোনয়নকারীর নাম-স্বাক্ষর জানাতে বলল ইসি

সংসদ নির্বাচনে দলগুলোকে প্রার্থী মনোনয়নকারীর নাম ও স্বাক্ষর জানাতে বলেছে ইসি। গতকাল শনিবার ইসি নির্বাচন পরিচালনা শাখা থেকে এ সংক্রান্ত চিঠি নিবন্ধিত ৪৪টি দলকে পাঠানো হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক বা সমপর্যায়ের পদাধিকারী বা তাদের কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির স্বাক্ষরিত মর্মে একটি প্রত্যয়নপত্র থাকবে যে, ওই প্রার্থীকে দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। প্রত্যয়নপত্রটি মনোনয়নপত্রের সঙ্গে প্রার্থীকে জমা দিতে হবে। প্রার্থী মনোনয়নে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি নাম, পদবি, সত্যায়িত নমুনা স্বাক্ষর তফসিল ঘোষণার ৭ দিনের মধ্যে রিটার্নিং কর্মকর্তাকে পাঠাতে হবে। আর এর অনুলিপি দিতে হবে নির্বাচন কমিশনকে।

চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, যদি কোনো নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের একাধিক প্রার্থীকে মনোনয়ন প্রদান করা হয়, সেক্ষেত্রে প্রার্থী মনোনয়নকারী প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষদিন বা তার পূর্বে রিটার্নিং অফিসারকে কোনো প্রার্থীর চূড়ান্ত মনোনয়ন সম্পর্কে অবহিত করবেন এবং ওই দলের অন্যান্য প্রার্থীর প্রার্থিতা স্থগিত হবে।

গত ১৫ নভেম্বর তফসিল অনুযায়ী, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ আগামী ৭ জানুয়ারি। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ তারিখ ৩০ নভেম্বর। বাছাই হবে ১ থেকে ৪ ডিসেম্বর। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ১৭ ডিসেম্বর। প্রতীক বরাদ্দ ১৮ ডিসেম্বর।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর