ভৌগোলিক নির্দেশক পণ্য: টাঙ্গাইল শাড়ির জিআই ভারত নিতে পারে না

প্রতিবেশী দেশ ভারত গত শনিবার টাঙ্গাইলের শাড়ি তাদের দেশের জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন বা ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে নিবন্ধন দিয়েছে, যা ভারত দিতে পারে না বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশের জিআই সনদ দেওয়া প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা।

তাঁরা বলছেন, এটা নৈতিকতা বিরোধী। একই সঙ্গে জাতিসংঘের অধীন প্রতিষ্ঠান বিশ্ব মেধাসম্পদ সংস্থা বা ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশনে (ডাব্লিউআইপিও) আপত্তি জানানোর সুযোগ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

 

যেসব পণ্য কোনো নির্দিষ্ট এলাকা বা অঞ্চলকেন্দ্রিক হয়ে থাকে, একই সঙ্গে আঞ্চলিকভাবে খ্যাতি রয়েছে, ৫০ বছরের বেশি সময়ের ঐতিহ্য রয়েছে, এসব পণ্য জিআই সনদ পাওয়ার যোগ্যতা রাখে। এসব পণ্যের গুণাগুণের প্রমাণ বিভিন্ন দালিলিক নথি, প্রাচীন সাহিত্য ও পুথিতে থাকতে হয়। একই সঙ্গে ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য থাকতে হয়। অর্থাৎ, ওই পণ্য শুধু নির্দিষ্ট অঞ্চলের হতে হবে

তাহলেই সেই পণ্যকে জিআই হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয়। এ জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান, সংগঠন বা ব্যক্তিকে তথ্য-উপাত্তসহ শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীন প্রতিষ্ঠান পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেড মার্কস অধিদপ্তরে (ডিপিডিটি) আবেদন করতে হয়। তখন তারা যাচাই-বাছাই শেষে যৌক্তিক মনে হলে সনদ দেয়। এরপর দেশের মধ্যে একক মর্যাদাসম্পন্ন হয় ওই পণ্য।

জিআই সনদ নেওয়ার উদ্দেশ্য হলো, আন্তর্জাতিক মহলে পণ্যের ব্র্যান্ডিং। জিআই মার্ক থাকলে ক্রেতারা সহজেই বিশ্বাস করেন যে এটা আসল পণ্য। কোনো পণ্য জিআই পণ্যের সনদ পেলে তারা নিশ্চিত থাকতে পারে ওই পণ্যটা অথেনটিক বা প্রকৃত গুণাগুণ সম্পন্ন। সে ক্ষেত্রে ক্রেতারা নিঃসন্দেহে মানসম্পন্ন আসল পণ্য কিনতে পারে। তিন শ্রেণির পণ্যকে জিআই মর্যাদা দেওয়া হয়।

কষি, হস্তশিল্প ও প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন পণ্য। এ জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান, সংগঠন বা ব্যক্তিকে তথ্য-উপাত্তসহ ডিপিডিটির কাছে আবেদন করতে হয়। টাঙ্গাইলের শাড়ির ক্ষেত্রে টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসকের আবেদন করার কথা। 

ডিপিডিটির প্রধান কর্মকর্তা বা মহাপরিচালক মো. মুনিম হাসান এখন দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। এতে তাঁর অধীন কর্মকর্তারা টাঙ্গাইলের শাড়ির জিআইয়ের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছেন না।

কর্মকর্তারা বলছেন, ভারত টাঙ্গাইলের শাড়ি জিআই করে নিতে পারে না। টাঙ্গাইল থেকে কোনো জনগোষ্ঠী ভারতে গেলে পণ্যের নাম সহকারে নিয়ে যেতে পারে না। তবে দেশের কেউ ডিপিডিটির কাছে টাঙ্গাইলের শাড়ির জিআই সনদ নেওয়ার জন্য আবেদন করেনি।

এ বিষয়ে ডিপিডিটির পরিচালক আলেয়া খাতুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘টাঙ্গাইল বাংলাদেশের একটি ভৌগোলিক এলাকা। ভারত কিভাবে জিআই দেয়? তারা তাদের এলাকারটা দেবে। টাঙ্গাইল বাংলাদেশের জেলা, এমনকি ভারতের সঙ্গে সীমান্ত জেলাও না। এটা তারা দিতেই পারে না। জেলা প্রশাসকও আবেদন করে নাই। তারা আবেদন করেছে টাঙ্গাইলের চমচম নিয়ে। সেটার জিআই আমরা দিয়েছি। দেশের অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানও আবেদন করেনি। করলে আমরা দিয়ে দিতাম।’

তিনি বলেন, ‘ভারতে টাঙ্গাইল নামে কোনো অঞ্চল নেই। এটা স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের জেলা। তারা এটা দিতেই পারে না। এ ক্ষেত্রে আমাদের খোঁজ নিতে হবে। ডিজি স্যার দেশের বাইরে আছেন, তাঁর সঙ্গে কথা বলব। ভারত কিভাবে জিআই দিল, এটা জানার অধিকার আমাদের আছে। আমরা জানতে চাইতে পারি।’

ডিপিডিটির পেটেন্ট বিভাগের সহকারী পরিচালক নীহার রঞ্জন বর্মন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভারত এথিক্যালি এই জিআই দিতে পারে না। আমার মনে হয় যে ঘটনা ঘটেছে, ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের সময় কিছু লোক টাঙ্গাইল থেকে চলে যায় ভারতে। একাত্তর সালেও হয়তো কিছু গেছে। তারাই যে শাড়ি তৈরি করছে, সেটাকে টাঙ্গাইল শাড়ি বলছে। কিন্তু জিআই হিসেবে তারা দিতে পারে না। জিআই মানে ভৌগোলিকভাবে ওই অঞ্চলের হতে হবে।’

জাতিসংঘে আপত্তি জানানোর সুযোগ আছে জানিয়ে এই কর্মকর্তা বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সিদ্ধান্ত নেবেন। তবে এ ক্ষেত্রে আপত্তি জানানোর সুযোগ আছে। আমরা চাইলে আন্তর্জাতিকভাবে কথা বলতে পারি। বিশ্ব মেধাসম্পদ সংস্থা বা ওয়ার্ল্ড ইন্টেলেকচুয়াল প্রপার্টি অর্গানাইজেশনে (ডাব্লিউআইপিও) আপত্তি জানানো সম্ভব। সুযোগ আছে। এই সিদ্ধান্ত আমাদের ওপরের পর্যায় থেকে নিতে হবে।’

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর