নতুন কৌশল সাজাচ্ছে বিএনপি, আসতে পারে যেসব কর্মসূচি

সরকারবিরোধী আন্দোলনে আবারও ঢেউ তুলতে চায় বিএনপি। এজন্য নানা হিসাব-নিকাশ কষে ধীরগতিতে এগোচ্ছেন দলের শীর্ষ নেতারা। এখনই বড় কোনো কর্মসূচিতে না গেলেও মাঠ গোছাতে তৎপর তারা। কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রথমেই নজর তৃণমূলে। বিগত দিনের অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মাঠ পর্যায় থেকে দলকে সুসংগঠিত করতে কাজ করছেন নেতারা। পাশাপাশি সরকারবিরোধী আন্দোলনে গ্রেফতার নেতাদের মুক্তিতে জোর দিয়েছে বিএনপি। একই সঙ্গে পলাতক নেতাদের জামিন ও মামলার সুনির্দিষ্ট তালিকা প্রস্তুত করছে। দল ও স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনকে শক্তিশালী করতে নিষ্ক্রিয়দের সক্রিয় করতে বিভিন্ন মাধ্যমে কাউন্সেলিং করছেন কেন্দ্রীয় নেতারা।

তৃণমূল নেতাদের মনোবল বৃদ্ধি ও দল গুছিয়ে জেলা এবং বিভাগীয় কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ঢাকাকেন্দ্রিক আন্দোলনের পরিকল্পনাও আছে। তবে কর্মসূচির বিষয় এখনো চূড়ান্ত হয়নি। সামনে এসএসসি পরীক্ষা ও রমজান থাকায় ইস্যুভিত্তিক কর্মসূচি দিয়েই আপাতত নেতাদের সক্রিয় রাখতে চান বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। আগামী সপ্তাহে মিয়ানমার ইস্যুতে কর্মসূচি আসতে পারে। দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোটেক রুহুল কবির রিজভী যুগান্তরকে বলেন, ‘বিএনপির কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায়ে আমাদের বিভিন্ন কার্যক্রম চলছে। এতে দল ও সংগঠন শক্তিশালী হয়। নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হয়। আমাদের আন্দোলন চলমান। তাই এই আন্দোলন কর্মসূচি বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই সংগঠনগুলো আরও শক্তিশালী হচ্ছে। নেতাকর্মীরা একটি আদর্শের জন্য লড়াই করছে। নির্যাতন-নিপীড়ন ভোগ করে তারা যে কাজ করছে, এ কারণে আরও বেশি সক্রিয় হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘নেতাকর্মীদের কারামুক্তিতে আমাদের আইনজীবীরা কাজ করছেন। একদফার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দিকে মুক্তি আমাদের চলমান আন্দোলনের অংশ। কারামুক্তির বিষয়টি অব্যাহত রয়েছে।’

দলীয় সূত্র জানায়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায় ও স্তরের নেতাদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ধারাবাহিক বৈঠকগুলোতে ঢাকাসহ তৃণমূলের নানা সংকটের বিষয় উঠে আসে। নীতিনির্ধারকরা আন্দোলনের পাশাপাশি দলকে শক্তিশালী করতে জোর দেওয়ার কথা জানান। সেই সঙ্গে ২০২২ ও ২০২৩ সালের মতো ফের আন্দোলনের ঢেউ তুলে কর্মপরিকল্পনার বার্তা দেন। এজন্য কারাবন্দি নেতাদের মুক্তি ও নেতাদের সক্রিয়তা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখছে বিএনপি। এছাড়া তৃণমূল পর্যায়ে সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় নেতাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দল মিটিয়ে দল ও বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনকে ঢেলে সাজানোর কথাও বলছেন কেউ কেউ।

সূত্র জানায়, কারাবন্দি নেতাদের পাশাপাশি আন্দোলনকালে নিহত, পঙ্গু, নির্যাতিত নেতাদের পরিবারের তালিকা করছে বিএনপি। সে অনুযায়ী পরিবারগুলোর খোঁজ খবর নিচ্ছেন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। এছাড়া কেন্দ্রীয় ও তৃণমূলের প্রভাবশালী নেতাদের মুক্ত করতে তোড়জোড় চালাচ্ছেন। বিএনপি মহাসচিবসহ কারাবন্দি নেতাদের মুক্তির দাবি জানিয়ে রাজধানীসহ সারা দেশে পোস্টার লাগাচ্ছে দলটি। পোস্টার লাগানোর মধ্য দিয়ে তৃণমূলে সরকারদলীয় ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা পর্যবেক্ষণ করবেন নেতারা।

এদিকে ৭ জানুয়ারির দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়নি বিএনপি। দলটির নেতাদের দাবি, নির্বাচনে অংশ না নিলেও তারা সফল। তাদের ডাকে সাড়া দিয়ে জনগণ ভোট বর্জন করছে। ভোটারা ভোটকেন্দ্রে যায়নি। উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘনিয়ে এলেও বিএনপি নিশ্চুপ। দলটির নীতিনির্ধারকরাও এ নিয়ে মুখ খুলছেন না। ফলে বিএনপির তৃণমূল পর্যায়েও উপজেলা নির্বাচন নিয়ে আগ্রহ দেখাচ্ছে না কেউ। অনেকেই বলছেন, জাতীয় নির্বাচন বর্জন করে উপজেলা নির্বাচনে যাওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। দলীয় নির্দেশনা এলে জাতীয় নির্বাচনের মতো উপজেলা নির্বাচনও বর্জনে মাঠে থাকবেন নেতারা।

কয়েকটি জেলা ও মহানগরের একাধিক নেতা প্রায় অভিন্ন তথ্য দিয়ে জানান, একদফার আন্দোলনে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। দলীয় পদ-পদবির বাইরেও অসংখ্য নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছেন। নির্যাতিত হয়েছেন। বিএনপি শীর্ষনেতারা এবার সবার আগে বন্দিদের মুক্ত করতে কাজ করছেন। ইউনিয়ন, থানা ও জেলার গ্রেফতারকৃতদের তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। তালিকা অনুসারে নেতাকর্মীদের মুক্তি ও জামিনের চেষ্টা চলছে। অনেকেই জামিনে মুক্ত হয়েছেন। যারা একাধিক মামলায় কারাগারে আছেন, তাদেরও মুক্ত করতে জেলা ও ঢাকার আইনজীবীদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন দায়িত্বশীল নেতারা। তারা জানান, এই মুহূর্তে বিএনপি নীতিনির্ধারকদের নির্দেশনা অনুযায়ী কারাবন্দিদের মুক্তির পাশাপাশি পৃথক মামলার তালিকা হচ্ছে। পাশাপাশি পদধারী নেতাদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করছে বিএনপি।

বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদক তাইফুল ইসলাম টিপু যুগান্তরকে বলেন, ‘শৃঙ্খলিত ও সরকার নিয়ন্ত্রিত বিচারব্যবস্থার মধ্যে জাতীয় নেতারাসহ তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের জেল থেকে বের করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান নিজে উদ্যোগ নিয়ে সারা দেশে মামলা, হামলা, গ্রেফতার, পঙ্গুসহ নিহতদের পরিবারগুলোর তদারকি করছেন। কেন্দ্র থেকে তৃণমূলে সব বিষয়ে খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে।’

ভোলা জেলা বিএনপির সদস্য সচিব মোহাম্মদ রাইসুল আলম যুগান্তরকে বলেন, ‘আমাদের যত নেতা কারাবন্দি ছিল তাদের বের করতে সক্ষম হয়েছি। এখন সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধি করতে কাজ করছি। কেন্দ্র থেকে যখন যে নির্দেশনা আসবে, আমরা তৃণমূল তা বাস্তবায়ন করব। উপজেলা নির্বাচন নিয়ে আমাদের কোনো নির্দেশনা আসেনি। এসব নিয়ে আমাদের ভাবনা নেই। তৃণমূলে আমাদের অবস্থান মজবুত হচ্ছে।’

জামালপুর জেলা বিএনপির সভাপতি ফরিদুল কবীর তালুকদার শামীম বলেন, ‘সরকারবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে আমাদের যেসব নেতাকর্মী গ্রেফতার হয়েছেন, তাদের মুক্ত করতে কাজ করছি। ইতোমধ্যে অনেকেই জামিনে মুক্ত হয়েছেন। এখনো যারা বন্দি তাদের দ্রুত সময়ে কারামুক্ত করতে কাজ চলছে।

মামলা ও হামলার কারণে যারা পালিয়ে আছেন, আত্মসমর্পণ করেনি, তাদের বিষয়েও আমরা চেষ্টা করছি জামিন নিতে। এর বাইরে যদি কেন্দ্র থেকে কোনো কর্মসূচি কিংবা নির্দেশনা দেয়, সেগুলোও পালন করব।’

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর