জুয়েলারির আধুনিকায়নে ডলার সংকট কমবে

দেশের জুয়েলারি শিল্পকে নীতি সহায়তা দিয়ে আধুনিক করতে পারলে দেশের তরুণরা এ খাতে আগ্রহী হবে। এতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। অন্যদিকে দেশে গয়নার বাজার অনেক ছোট হওয়ার কারণে রপ্তানির দিকে মনোযোগ দিতে হবে, এতে বর্তমানের ডলার সংকট কমাতে সহায়ক হবে। শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) রাজধানীর ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সিটি বসুন্ধরার (আইসিসিবি) নবরাত্রি হলে আয়োজিত বাজুস ফেয়ারে উপস্থিত দেশবরেণ্য অর্থনীতিবিদরা এসব কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভিশন-২০৪১ সফলভাবে বাস্তবায়ন এবং দেশের জুয়েলারি শিল্পীদের হাতে গড়া অলংকার দেশে-বিদেশে তুলে ধরতে ও পরিচিতি বাড়াতে এই মেলার আয়োজন করা হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি সাবেক পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘জুয়েলারি একটি সম্ভাবনাময় শিল্প। আমরা এই শিল্পে উন্নতি করছি। ভারতের মতো না হলেও এই অঞ্চলের কিছু গুণাগুণ ও ঐতিহ্য আমাদের মধ্যেও আছে। সেটাকে ধরে আমরা এগোতে পারি। ’

তিনি বলেন, ‘বেজা, বেপজায় যে জায়গা আছে, সেখানে একটা জায়গা বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। সরকারের যে সহায়তা দেওয়া দরকার, অবশ্যই দেশের প্রয়োজনে আমরা তা দিয়ে যাব। ভার্টিক্যাল গ্রোথ না হলে কিন্তু আমরা আন্তর্জাতিক মার্কেটে ঢুকতে পারব না। ভার্টিক্যাল গ্রোথ শুধু শারীরিক নয়, ডিজাইনেও দরকার। ’

দেশবরেণ্য অর্থনীতিবিদ, ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিকসের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ বলেন, ‘যখন কোনো খাত নিয়ে কথা বলি, তখন তথ্য প্রয়োজন। এ খাতে তথ্যের ঘাটতি আছে। তথ্যগুলো সংগ্রহ করা উচিত এবং সেটার বিশ্লেষণ করা উচিত। শিল্প, গবেষক ও সরকার সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে আমরা বাস্তবতার নিরিখে একটি সুষ্ঠু নীতিমালা পাই। সোনা কোথা থেকে আসে, কোথায় যায়, সেটা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আমদানি কতটুকু হচ্ছে তা জানি না। যেটা আসছে সেটা আবার চলে যায়। এ তথ্যগুলো আমাদের দরকার। ’

তিনি বলেন, ‘৪৭ শতাংশ তরুণ বিদেশে যেতে চায়। তাদের দেশে থাকার পারিপার্শ্বিকতা সৃষ্টি করতে হবে, সুযোগ দিতে হবে এগিয়ে যাওয়ার। সেই সুযোগ স্বর্ণশিল্প খাতেও তৈরি করা যায়। অর্থনৈতিক অঞ্চলের একটা জায়গা এই খাতে দেওয়া যায়। বিডার সহায়তা করা উচিত। সোনা একটি পরিবার বারবার কিনবে, সেটিও সম্ভব নয়। কাজেই রপ্তানির দিকে জোর দিতে হবে। ’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর, উন্নয়ন সমন্বয়ের চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ ড. আতিউর রহমান বলেন, ‘যাঁরা অংশীজন আছেন, তাঁদের সঙ্গে নীতিনির্ধারকদের আরও গভীরভাবে আলোচনা করা উচিত। যে রকম পলিসি দরকার সেটা করা উচিত। ডলার সংকট সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশীয় শিল্পের বাইরেও এটাকে একটি মডার্ন শিল্প হিসেবে গড়তে হবে। তাহলে যে পরিমাণ রপ্তানি করতে পারব, তার বিনিময় যে পরিমাণ ডলার আসবে, সেটি ম্যাক্রো ইকোনমিকে আরও জোরদার করবে। ’

তিনি বলেন, ‘এখন স্বর্ণ আমদানিতে ৫-১০ শতাংশ কাস্টমস ডিউটি আছে এবং অন্যান্য যে আরও শুল্ক আছে, সেগুলোর দিকে নজর দিয়ে পাশের দেশে যে পরিমাণ শুল্ক নেয়, সেটাই নিতে হবে। তা ছাড়া প্রতিযোগিতা করার সুযোগ পাব না। চোরাচালান বন্ধে স্পষ্ট নীতি নিতে হবে। দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করতে হবে। আমরা যদি গার্মেন্টসশিল্পে পারি, তাহলে এখানে পারব না কেন?’

মূল প্রবন্ধে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘আমাদের সাপ্লাই চেইন একটি কাঠামোর মধ্যে নিতে পারিনি। এটি জুয়েলারিশিল্পের জন্য অনেক বড় প্রতিবন্ধকতা। সব ধরনের ট্রেড ফরমাল ডিলারের মাধ্যমে হওয়া উচিত। দেশের ভেতর যত সোনা আসবে, তা শুধু ডিলাররাই যেন আনতে পারেন। এখানে নানা ধরনের ইনফরমাল পথে লেনদেন হচ্ছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশকে ব্যবহার করে যেসব ট্রেড হচ্ছে সেটা জুয়েলারিশিল্পের জন্য বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ’

সভাপতির বক্তব্যে বাজুসের সহসভাপতি ও আপন জুয়েলার্সের কর্ণধার গুলজার আহমেদ বলেন, ‘আমার ব্যবসার ৪০ বছরে এ রকম স্থানে বসে কথা বলতে পারিনি। আমার সামনে ও পাশে অনেক গুণী ব্যক্তি বসে আছেন। এই ক্ষুদ্র খাত অনেক বড় হওয়ার আশা দেখতে পারছি। আমাদের রিফাইনারি ফ্যাক্টরিটা যেন তাড়াতাড়ি উদ্বোধন করা হয়, তাহলে সাধারণ ব্যবসায়ীরা এর মাধ্যমে চোরাকারবারিদের হাত থেকে মুক্ত হতে পারি। ’

তিনি বলেন, ‘এখানে আমাদের বসার জায়গা যিনি করে দিয়েছেন, তিনি আমাদের প্রেসিডেন্ট সায়েম সোবহান আনভীর সাহেব। তাঁর উদ্যোগেই আজকে বাজুসের নামটি গ্রাম-গঞ্জ থেকে শুরু করে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে গেছে। ’

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাজুসের সাধারণ সম্পাদক বাদল চন্দ্র রায়, এফবিসিসিআইয়ের প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল আলম, বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ড. জামালউদ্দিন আহমেদ, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর উপমহাপরিচালক (যুগ্ম সচিব) পরিমল চন্দ্র বসু, বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের উপপ্রধান মাহমুদুল হাসান, বেজার পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী সদস্য সালেহ আহমদ, বিডার স্ট্র্যাটেজিক ইনভেস্টমেন্ট বিভাগের নির্বাহী সদস্য অভিজিৎ চৌধুরী প্রমুখ।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর