সংসদ নির্বাচনে হেরে এবার উপজেলায় প্রার্থী

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হয়ে আবার উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামছেন এক ডজনের বেশি সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান। তাঁরা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে উপজেলা পরিষদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। এলাকায় নিজের অবস্থান ধরে রাখতে তাঁরা আবারও উপজেলায় প্রার্থী হচ্ছেন। বিভিন্ন উপজেলায় খোঁজ নিয়ে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র জানায়, সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য উপজেলা চেয়ারম্যান পদ ছেড়ে দেওয়া নেতাদের নিজেদের এলাকায় একটি বিশেষ অবস্থান রয়েছে। প্রত্যেকেরই নিজস্ব কর্মীবলয় ও সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে। উপজেলা চেয়ারম্যান থাকাকালে তাঁরা নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকতেন। পদত্যাগকারী চেয়ারম্যানদের মধ্যে যাঁরা সংসদ নির্বাচনে জিততে পারেননি, তাঁরা অনেকটা দুই কূল হারানোর দশায় পড়েছেন।

এমন অবস্থায় তাঁরা চাইছেন আবারও উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়ে নিজের কর্মী-সমর্থকদের ধরে রাখতে।

সংসদ নির্বাচনের পর উপজেলা নির্বাচন ঘিরেও স্থানীয় আওয়ামী লীগের কোন্দল বাড়ছে। সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যানরা সংসদ নির্বাচনে যে সংসদ সদস্যদের কাছে হেরেছেন তাঁদের সঙ্গে বিরোধ আবারও চাঙ্গা হচ্ছে। সংসদ সদস্যরা চাইছেন তাঁদের পছন্দমতো প্রার্থীকে চেয়ারম্যান করতে।

আর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যানরা চাইছেন উপজেলায় জিতে সংসদ নির্বাচনে হারের কিছুটা শোধ তুলতে। 

গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন কাবির মিয়া। তিনি বিগত জাতীয় নির্বাচনের আগে চেয়ারম্যান পদ ছেড়ে গোপালগঞ্জ-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ধর্মবিষয়ক উপকমিটির সদস্য কাবির মিয়া দলের সভাপতিমণ্ডলীর প্রভাবশালী সদস্য মুহম্মদ ফারুক খানের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়েন। কাবির মিয়া ১১ হাজার ৭৬৯ ভোটে পরাজিত হন।

এখন আবার উপজেলা নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন তিনি।

কাবির মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগের লোক। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে সুযোগ ছিল সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করার, তাই করেছিলাম। আমি নৌকার বিরুদ্ধে নির্বাচনে যাইনি। নির্বাচন করেছিলাম নৌকার মাঝির বিরুদ্ধে। এবার উপজেলা পরিষদেও আমি চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করব। কারণ আমি জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হতে চাই না। আগে যেখানে ছিলাম আবারও সেখানে ফিরে গিয়ে জনগণের সুখ-দুঃখের সাথি হতে চাই।’

খুলনার ফুলতলা উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ আকরাম হোসেন উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করে স্বতন্ত্র এমপি প্রার্থী হন। সেই নির্বাচনে বর্তমান ভূমিমন্ত্রী নারায়ন চন্দ্র চন্দের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়লেও পরাজিত হন আকরাম হোসেন। নারায়ন চন্দ্র চন্দ পান এক লাখ ১৩ হাজার ৫৮০ ভোট, আকরাম হোসেন পান ৯৩ হাজার ১৫০ ভোট। আসন্ন উপজেলা নির্বাচনে আবারও প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন শেখ আকরাম হোসেন।

দিনাজপুর-৪ (খানসামা-চিরিরবন্দর) আসনে স্বতন্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন চিরিরবন্দর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক তারিকুল ইসলাম তারিক। এ জন্য তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান পদ ছাড়েন। সংসদ নির্বাচনে পরাজিত হয়ে এখন উপজেলা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারিকুল ইসলাম তারিক।

তারিকুল ইসলাম তারিক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখনো চিরিরবন্দর উপজেলা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়নি। আমি আমার লোকজন নিয়ে বৈঠক করে সিদ্ধান্ত নেব নির্বাচন করব কি না। তবে জনপ্রতিনিধি হলে মানুষের সেবা করা সহজ হয়।’

চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান গাজী মাইনউদ্দিন পদ ছেড়ে সংসদ নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছিলেন। সে নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের প্রার্থী রফিকুল ইসলাম বীর-উত্তমের কাছে পরাজিত হন। গাজী মাইনউদ্দিন এখন আবার উপজেলা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

গাজী মাইনউদ্দিন বর্তমানে উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পদে আছেন। তিনি একসময়ে বর্তমান সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলামের ঘনিষ্ঠ ছিলেন। নানা কারণে তাঁদের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়েছে। আসন্ন উপজেলা নির্বাচন ঘিরে তাঁদের বিরোধ আরো বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা।

গাজী মাইনউদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার বিপুলসংখ্যক কর্মী-সমর্থক আছে, দলের পদেও আছি। সুতরাং কর্মী-সমর্থকদের সমর্থন এবং দলীয় হাইকমান্ডের সবুজ সংকেত পেলে ভোটে অংশ নেব।’

দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেন মোখছেদুল মোমিন। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি পদে থাকা এই নেতা স্বতন্ত্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে পরাজিত হন। তিনি এখন আবার উপজেলা পরিষদে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

চকরিয়ায় লড়বেন সাবেক এমপি জাফর আলম

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা পরিষদে চেয়ারম্যান পদে লড়বেন সদ্য সাবেক সংসদ সদস্য জাফর আলম। তিনি একাদশ জাতীয় সংসদে কক্সবাজার-১ আসনে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত এমপি ছিলেন। বিগত জাতীয় নির্বাচনে আসন সমঝোতার হিসেবে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম বীরপ্রতীককে আসনটি ছেড়ে দেয় আওয়ামী লীগ। দলের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হন জাফর আলম। সে নির্বাচনে পরাজিত হয়ে এবার উপজেলা পরিষদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন জাফর আলম। তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার আগে চকরিয়া উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ছিলেন।

চকরিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু মুছা কালের কণ্ঠকে বলেন, কক্সবাজার-১ আসনে দলের সংসদ সদস্য না থাকায় নেতাকর্মীরা হতাশ হয়ে পড়েছেন। এর আগে রাজপথে আন্দোলন সংগ্রাম, আগুন সন্ত্রাস মোকাবেলায় নেতৃত্ব দিয়েছেন জাফর আলম। সে কারণে দলের নেতাকর্মীরা চাইছেন জাফর আলম উপজেলায় নির্বাচন করুক।’

জানতে চাইলে সাবেক সংসদ সদস্য জাফর আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি জনগণের ভোটে ইউনিয়ন পরিষদ থেকে একাধারে পৌরসভার মেয়র, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান, এমপি নির্বাচিত হয়েছিলাম। দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মী, সাধারণ জনগণ আমাকে বেশি ভালোবাসেন। তাই তাঁদের ভালোবাসা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে চাই না।’

(প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করেছেন আমাদের দিনাজপুর প্রতিনিধি এমদাদুল হক মিলন, চাঁদপুর প্রতিনিধি ফারুক আহম্মদ, গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি প্রসূন মণ্ডল, চকরিয়া (কক্সবাজার) প্রতিনিধি ছোটন কান্তি নাথ, সৈয়দপুর (নীলফামারী) প্রতিনিধি তোফাজ্জল হোসেন লুতু ও খুলনা অফিস

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর