,



বিএনপির বিকল্প জোবায়দা

দুর্নীতির দুই মামলায় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ‘সাজা’ হতে পারে— এমন আলোচনা এখন বিএনপির ভিতরে-বাইরে। নেতা-কর্মীদের শঙ্কা— ‘আদালতের ঘাড়ে বন্দুক’ রেখে সরকার সাজা দেওয়ার অপতত্পরতা চালাচ্ছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার অবস্থানদৃষ্টে তাই মনে হচ্ছে। একই পরিণতি হতে পারে দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানেরও। তারও দেশে ফেরার সম্ভাবনা ক্ষীণ। জিয়া পরিবারের শীর্ষ এ দুই নেতাকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার অপচেষ্টা চলছে বলে মনে করেন নেতা-কর্মীরা।

তাদের মতে, বিএনপিকে রাজনীতিশূন্য করতে চায় সরকার। এ অবস্থায় দলের হাল ধরবেন কে— ঘুরেফিরে এ প্রশ্নই আসছে। বিকল্প চিন্তায় অবশ্য তারেক রহমানের সহধর্মিণী ডা. জোবায়দা রহমানের নামও আলোচনায় শীর্ষে। কিন্তু বিষয়টি এখনই ভাবতে চান না বিএনপির নীতিনির্ধারকরা। পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তবে দলের ভাঙন ঠেকাতে ঐক্যবদ্ধ রাখতে শেষমেশ জোবায়দা রহমান দলে ফিরলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না বলেও দলীয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। সূত্রে জানা যায়, বিএনপি চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার বিচারপ্রক্রিয়া অনেক দূর এগিয়েছে। প্রতি সপ্তাহের মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ ধার্য করা হচ্ছে। সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে যুক্তিতর্ক। এরপর রায়। রায়ে ন্যায়বিচার না পাওয়ার শঙ্কায় জিয়া পরিবারের আইনজীবীরাও। তার পরও হাল ছাড়তে নারাজ তারা। এ মামলার পরবর্তী সাক্ষ্য গ্রহণ আগামীকাল। আগামী ২ জুন জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলায় হাজিরা না দিলে বিএনপি-প্রধানের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হবে। তার বিরুদ্ধে যাত্রাবাড়ী থানায় বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের মামলাও আজ উঠবে মহানগর দায়রা জজ আদালতে। গ্যাটকো, নাইকো ও বড়পুকুরিয়া মামলাও চলছে সমানতালে। ডান্ডি ডাইয়িং ঋণখেলাপি মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে আগামী ১৯ জুন। প্রতিদিনই কোনো না কোনো মামলার জন্য আদালতের দ্বারে দ্বারে যেতে হচ্ছে সত্তরোর্ধ্ব সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীকে।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন গতকাল সন্ধ্যায় বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘চেয়ারপারসনের বিরুদ্ধে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলা যেভাবে চলছে, তাতে মনে হয় সরকারের “অসৎ” উদ্দেশ্য রয়েছে। কারণ, একটি মামলার সাধারণত চার-পাঁচ সপ্তাহ পরপর তারিখ ধার্য হয়। কিন্তু বেগম জিয়ার মামলার ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। প্রতি সপ্তাহেই তারিখ নির্ধারণ করা হচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বিএনপি-প্রধানকে “সাজা” দেওয়ার চিন্তা কিংবা দলকে “চাপে” রাখার কৌশল নিয়েছে সরকার।’

বিএনপি চেয়ারপারসনের ‘সাজা’ হলে দল কীভাবে চলবে— এমন প্রশ্নে ড. মোশাররফ বলেন, ‘দল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় চলবে। দলের স্থায়ী কমিটিসহ নির্বাহী কমিটি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান দেশে আসতে না পারলে পরিস্থিতি বিবেচনায় ডা. জোবায়দা রহমানকে নিয়েও ভাবা হতে পারে। তবে এখনই এ বিষয়ে ভাবনার সময় আসেনি। পরিবর্তিত পরিস্থিতি অনুযায়ীই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’ জানা যায়, শুধু জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধেই ৭৫টি মামলা ঝুলছে। অবশ্য একটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত বেগম খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকো মারা গেছেন। এর মধ্যে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মোট ১৯টি মামলা রয়েছে। তার মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) করা মামলার সংখ্যা পাঁচটি। বাকিগুলো ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন থানায় করা সহিংসতা, নাশকতা, রাষ্ট্রদ্রোহ ও মানহানির পিটিশন মামলা। অন্যদিকে তারেক রহমানের বিরুদ্ধেও রয়েছে অন্তত অর্ধশত মামলা। এ ছাড়াও সারা দেশে ২০ হাজারেরও বেশি মামলায় আসামি রয়েছেন পাঁচ লক্ষাধিক বিএনপি নেতা-কর্মী।

বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক নেতা বলেছেন, ওয়ান ইলেভেন বিএনপিকে লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে। ওই বৈরী পরিস্থিতির রেশ কাটিয়ে উঠতে দলকে এখনো অনেক খেসারত দিতে হচ্ছে। ‘কথিত’ সংস্কারপন্থি ইস্যুতে এখনো দলে সন্দেহ-অবিশ্বাস প্রকট আকার ধারণ করেছে। এরপর বর্তমান সরকারের দুই মেয়াদে নেতা-কর্মীরা মামলায় পর্যুদস্ত। বিগত সরকারবিরোধী আন্দোলনেও ফলাফল ঘরে তুলতে না পারায় হতাশা আরও জেঁকে বসেছে। এ অবস্থায় কাউন্সিলের মাধ্যমে দলকে টেনে তোলার চেষ্টা করছেন বেগম জিয়া। কিন্তু কমিটির দীর্ঘসূত্রতা নেতা-কর্মীদের মধ্যে হতাশা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। আগামী ঈদুল ফিতরের পর অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বেগম জিয়া ও তারেক রহমানের বিরুদ্ধে যে কোনো রায়ের জন্যই নেতা-কর্মীদের প্রস্তুত থাকতে হবে বলে জানিয়েছেন আইনজীবীরা।

জানা যায়, রাজনীতিতে শীর্ষ এ দুই নেতার অনুপস্থিতিতে দল ভাঙনের শঙ্কাও রয়েছে। বিশেষ করে সরকার সে ধরনের অপতত্পরতা চালাতে পারে বলে মনে করছেন নেতা-কর্মীরা। এ অবস্থায় দলের ঐক্য ধরে রাখাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ। বিএনপিকে এ বিষয়টি এখনই বিবেচনায় নেওয়ার সময় এসেছে বলে মনে করছেন দলের দায়িত্বশীল একাধিক নেতা। তবে ডা. জোবায়দা রহমানকে নিয়ে নেতা-কর্মীদের মধ্যে আলোচনায় থাকলেও এ বিষয়ে কোনো কিছুই স্পষ্ট করছেন না বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান। বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও জিয়া পরিবারের আইনজীবী অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ‘বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে মামলাগুলো স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চলছে না। সরকার “আদালতের ঘাড়ে বন্দুক” রেখে বিএনপি চেয়ারপারসনকে সাজা দিয়ে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করতে পারে। ঘন ঘন তারিখ দেওয়ায় সেটাই মনে হচ্ছে। প্রচলিত আইনে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় বিচার হলে বেগম খালেদা জিয়া নির্দোষ প্রমাণিত হবেন। কিন্তু আমরা অশুভশক্তির ইঙ্গিত পাচ্ছি। বিএনপিকে নিশ্চিহ্ন করে সরকার যে একদলীয় বাকশাল কায়েমের নীলনকশা করে যাচ্ছে, তা কখনই বাস্তবায়ন করতে দেওয়া হবে না।’ তিনি বলেন, ‘বিএনপি দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল। লাখ লাখ নেতা-কর্মীর দল। বিএনপি চেয়ারপারসনের সাজা হলে কিংবা তারেক রহমান দেশে আসতে না পারলে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় লিডারশিপ তৈরি করা হবে। তারেক রহমানের সহধর্মিণী জোবায়দা রহমানকে দেশে আনার প্রয়োজনীয়তা পড়বে কিনা, ওই সময়কার পরিস্থিতি বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এখনই এ বিষয়ে কিছু বলা সম্ভব হবে না।’

কাল আদালতে উঠছে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলা : জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতির মামলায় খালেদা জিয়াসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য গ্রহণের তারিখ পিছিয়েছে আদালত। আগামীকাল বৃহস্পতিবার সাক্ষ্য গ্রহণের জন্য দিন ধার্য করা হয়েছে। ঢাকার বকশীবাজারে কারা অধিদফতরের প্যারেড মাঠে স্থাপিত তৃতীয় বিশেষ জজ আদালত এ আদেশ দেয়। এর আগে ২৮ এপ্রিল বিএনপি চেয়ারপারসনের পক্ষে বাদী হারুন অর রশিদের জেরা শেষ হয়। মামলার অন্যতম আসামি তারেক রহমানের পক্ষে বাদী হারুন অর রশিদকে চতুর্থ দিনে জেরার জন্য দিন ধার্য ছিল।

২ জুন আদালতে হাজির না হলে খালেদার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা : জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার প্রধান আসামি খালেদা জিয়াকে ২ জুন আদালতে হাজিরের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। গত ১৯ মে রাজধানীর বকশীবাজারে কারা অধিদফতরের প্যারেড মাঠে স্থাপিত তৃতীয় বিশেষ জজ আবু আহমেদ জমাদারের আদালত এ আদেশ দেয়। খালেদা জিয়া আদালতে হাজির না হওয়ায় এ মামলায় তার আত্মপক্ষ সমর্থন পঞ্চমবারের মতো পিছিয়ে যায়। বিএনপি-প্রধানের অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তার অন্যতম আইনজীবী সানাউল্লাহ মিয়া সময়ের আবেদন করেন। ওই আবেদন ?শুনে আদালত মামলার নতুন দিন ধার্য করে সেদিন খালেদা জিয়াকে হাজির হতে নির্দেশ দেয়।

নাইকো দুর্নীতি মামলা : কানাডার কোম্পানি নাইকোর সঙ্গে অস্বচ্ছ চুক্তির মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতিসাধন ও দুর্নীতির অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর রাজধানীর তেজগাঁও থানায় নাইকো দুর্নীতি মামলা করে দুদক। ২০০৮ সালের ৫ মে এ মামলায় খালেদা জিয়াসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। অভিযোগপত্রে প্রায় ১৩ হাজার ৭৭৭ কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় ক্ষতির অভিযোগ আনা হয়। এ মামলার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে খালেদার করা রিট আবেদন ও মামলা বাতিল-সংক্রান্ত রুল খারিজ করে বিচারিক আদালতে এ মামলার কার্যক্রম চলার ওপর হাইকোর্টের দেওয়া স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করা হয়। এ প্রসঙ্গে বেগম খালেদা জিয়ার আইনজীবী ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল বলেন, ‘একই বিষয়ে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা হাইকোর্ট বাতিল করায় আমরা আশা করেছিলাম, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মামলাও বাতিল করা হবে। সেভাবেই শুনানি ও যুক্তিতর্কে অংশ নিয়েছিলাম। কিন্তু হাইকোর্টের এ রায়ে আমরা সংক্ষুব্ধ। আশা করি আপিল বিভাগে আমরা ন্যায়বিচার পাব।’

গ্যাটকো ও বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলা : গ্যাটকো ও বড়পুকুরিয়া কয়লাখনি দুর্নীতি মামলা বাতিলেও খালেদা জিয়ার রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে রুল জারি ও মামলার কার্যক্রম স্থগিত করেছিল হাইকোর্ট। মামলাগুলোর রুল শুনানি পেছাতে খালেদার আইনজীবীদের চারটি সময়ের আবেদন খারিজ করার পর গ্যাটকো দুর্নীতি মামলায় রুল শুনানি শুরু হয়। গ্যাটকো ও বড়পুকুরিয়া মামলায় উচ্চ আদালত স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করায় নিম্ন আদালতে এ দুই মামলা চলতে কোনো বাধা নেই।

তারেকের বিরুদ্ধে মামলা : বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মাথার ওপর এ পর্যন্ত প্রায় অর্ধশত মামলার খড়্গ ঝুলছে। এর মধ্যে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগে বেশ কয়েকটি মামলা করা হয়েছে। তারেকের বিরুদ্ধে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় দায়ের করা হত্যা ও বিস্ফোরকদ্রব্য আইনের দুটি মামলা ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১-এ বিচারাধীন। এ মামলাগুলোর সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। এ ছাড়া তার বিরুদ্ধে সোনালী ব্যাংকের ঋণ খেলাপের দায়েও একটি মামলা হয়।

গ্রেনেড হামলা মামলা : ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলার দুটি মামলা করে পুলিশ। একটি হত্যা ও আরেকটি বিস্ফোরকদ্রব্য আইনে করা মামলা। বর্তমান সরকারের আমলে এ দুটি মামলার সম্পূরক অভিযোগপত্রে তারেক রহমানকে আসামি করা হয়।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর