,



নতুন বিতর্কে বিসিবি

‘কুইনিন জ্বর সারাবে বটে; কিন্তু কুইনিন সারাবে কে?’ অনেক পুরনো প্রবচন। কুইনিন ম্যালেরিয়া জ্বরের প্রতিষেধক। ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগীদের কুইনিন খেতে দেয়া হয়…। তাতে কাজও হয়; কিন্তু বিপত্তিটা অন্য জায়গায় ; কুইনিন যে বেজায় তেতো! মুখে দেয়া যায় না। মুহূর্তে মুখ তিতা হয়ে যায়। তাই ম্যালেরিয়া আক্রান্ত রোগীরা কুইনিন আতঙ্কেই ভোগেন সবচেয়ে বেশি। তারা জানেন কুইনিন অব্যর্থ ঔষধ। খেলে জ্বর নিরাময় নিশ্চিত; কিন্তু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সাংঘাতিক। কুইনিন পানের সঙ্গে সঙ্গে যে মুখ তেতো হয়ে যায়, তা কাটানোর তো কিছু নেই। সেই তোতো কাটবে কী করে? তা নিয়েই রাজ্যের চিন্তা।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের সাম্প্রতিক এক সিদ্ধান্ত দেখে-শুনে আমার বার বার ওই প্রবচন মনে পড়ছে। বিসিবি জাতীয় ক্রিকেট দলের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় হঠাৎ নতুনত্ব এনেছে। যে প্রক্রিয়া নিয়ে নানা কথা। কেউ কেউ এটাকে নজিরবিহীন আখ্যা দিয়েছেন। কারো মতে এটা অভিনব। আবার কেউ বলছেন, এ সিদ্ধান্ত বুমেরাং হবে। বোর্ড জাতীয় দলের নির্বাচক প্রক্রিয়াটিকে হঠাৎ জটিল করে পুরো বিষয়টাকে দু’স্তরে বিভক্ত করে ফেলেছে। যার একটি ‘নির্বাচক প্যানেল।’ যেখানে থাকবেন তিন নির্বাচক।

তাতে নতুন মুখ নেই। সেই পূরণো তিনজন; ফারুক আহমেদ, মিনহাজুল আবেদিন নান্নু ও হাবিবুল বাশার। তাদের তিনজনের একজন যথারীতি প্রধান নির্বাচক হয়েই থাকবেন; কিন্তু ক্রিকেটার বাছাই তথা দল নির্বাচনে সেটাই শেষ কথা নয়। তার ওপর নজরদারি ও খবরদারির জন্য গড়া হয়েছে আরেক স্তর; যার নাম রাখা হয়েছে ‘নির্বাচক কমিটি।’

নির্বাচক প্যানেল বসে একটা দল সাজাবে। তা পর্যালোচনা হবে। সে কাজটিই করবে নির্বাচক কমিটি। যার প্রধান ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান আকরাম খান। সঙ্গে কোচ চন্ডিকা হাতুরুসিংহে ও ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ সুজন। কেন এই পরিবর্তন? কেনইবা এক স্তরের দল সাজানো প্রক্রিয়াটিকে দুই ভাগ করা?

বোর্ডের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দেয়া হয়েছে, অতীতে ক্রিকেটার বাছাই তথা দল সাজানো নিয়ে নির্বাচকদের সঙ্গে কোচ চন্ডিকা হাতুরুসিংহের মাঝে কিছু ভুল বোঝাবুঝি বা যোগাযোগে ঘাটতি ছিল। যা থেকে একটা অনাকাঙিক্ষত দূরত্বও তৈরি হয়েছিল, যা নিয়ে কাদা ছোড়াছুড়িও হয়েছে বেশ। তা নিরসনেই নির্বাচক প্রক্রিয়ায় নতুনত্ব আনা।

ইতিহাস সাক্ষী দিচ্ছে, সত্যিই গত বিশ্বকাপ স্কোয়াড গঠন নিয়ে ফারুক আহমেদ এন্ড কোং আর কোচ হাতুরুসিংহে পরষ্পরবিরোধী অবস্থানে ছিলেন। কোচের পছন্দ ছিল লেগস্পিনার জুবায়ের হোসেন। তাকে বিশ্বকাপ দলে রাখার একান্ত ইচ্ছে ছিল হাতুরুর; কিন্তু নির্বাচকরা তা আমলে আনেননি।

লঙ্কান হাতুরু মিডিয়ার সামনে একাধিকবার প্রকাশ্যে নির্বাচকদের সে সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। জুবায়েরকে দলে রাখার পক্ষে তার অবস্থানও ব্যাখ্যা করেন। এরপরও কয়েকবার দল নির্বাচন নিয়ে কোচকে প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করতে দেখা গেছে, যা শুধু দেখতেই খারাপ লাগেনি, টিম বাংলাদেশের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথেও একটা বাধা হিসেবে পরিগণিত হয়েছে।

সবাই বলাবলি করেছেন, কোচ ও নির্বাচকরা যদি দল নিয়ে একমত হতে না পারেন, তাহলে আদর্শ দল হবে কী করে? আর সবার মতামতে সময়ের সেরা দল খেলতে না পারলে সাফল্য ধরা দেবে কী করে? কোচ একরকম ভাববেন আর নির্বাচকদের চিন্তা হবে অন্যরকম- কোনভাবেই কাঙিক্ষত সাফল্য ধরা দেবে না। বরং ভালো খেলার পথ দিনকে দিন সংকুচিত হবে।

কোচ-নির্বাচকের দ্বন্দ্বে দলের সম্প্রীতি ও ঐক্য কমে যাবে। অভ্যন্তরীণ কোন্দলও পৌঁছাবে চরমে। মোদ্দা কথা, টিম বাংলাদেশের বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। মানা গেল ওই পরিস্থিতি যাতে না হয়, বাংলাদেশ জাতীয় দল যাতে করে সময়ের সেরা পারফরমারে সাজানো একটি ভালো দল হিসেবে মাঠে নামতে পারে- সে কথা ভেবেই নির্বাচক কমিটিকে নতুন করে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ বিসিবির।

BCBসে ক্ষেত্রে কোচকে নির্বাচন প্রক্রিয়ার অংশ করে ফেললেইতো ল্যাঠা চুকে যেত। চন্ডিকা হাতুরুসিংহেকে চতুর্থ নির্বাচক হিসেবে নিয়ে নিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যেত। সেটাই ছিল সহজতম সমাধান। সবাই যেটাকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বলেই ধরে নিত; কিন্তু তার বদলে যেটা করা হয়েছে, তা অস্বাভাবিক ও নজিরবিহীন।

টেস্ট খেলিয়ে বেশ কটি দেশেই তিন সদস্যের নির্বাচক কমিটির সঙ্গে প্রধান কোচের মিলে দল গড়ার নজির আছে। অস্ট্রেলিয়ান বর্তমান কোচ লেম্যান ও কিউই কোচ এখনো নির্বাচক কমিটির সক্রিয় সদস্য হিসেবে কাজ করেন। শুধু ওই দুই দেশে নয়। ইংল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকায়ও আগে কয়েকবার কোচ নির্বাচক কমিটির সদস্য ছিলেন।

বাংলাদেশেও কোচ নির্বাচক কমিটির অন্যতম সদস্য হিসেবে কাজ করার রেকর্ড আছে। ডেভ হোয়াটমোরকে দেয়া হয়েছিল ওই ক্ষমতা। তিনিও তিন সদস্যের নির্বাচকদের সঙ্গে বসে দল চূড়ান্ত করতেন। ভাবা হচ্ছিল এবারো সেই পথেই হাঁটবে বিসিবি। কিন্তু তা না করে বোর্ড আরও দুজন সদস্যকে বাড়িয়ে নিল। বিপত্তি, সমালোচনা ও তীর্যক কথাবার্তা সেখানেই।

সবার একটাই কথা, ‘দল সাজানো নিয়ে যখন কোচ ও নির্বাচকরা বারবার বিপরীতমুখী অবস্থানে- তাহলে দুই পক্ষকে এক করে দিলেই হয়ে যেত! মাধখানে আবার ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটি চেয়ারম্যান আকরাম খান এবং ম্যানেজার খালেদ মাহমুদ সুজনকে জড়ানো কেন?’

বলার অপেক্ষা রাখে না, তিন নির্বাচকের সঙ্গে কখনো অধিনায়ক আবার কোন সময় কোচের নির্বাচক হিসেবে কাজ করার দৃষ্টান্ত থাকলেও শুধু জাতীয় দল গড়তে এমন দুই স্তরের নির্বাচক প্যানেল ও নির্বাচক কমিটি বিশ্বের কোথাও নেই। বিসিবি সে বিরল ঘটনার জন্ম দেয়ায় তাই চারিদিকে সমালোচনার ঝড়।

সঙ্গে কিছু প্রাসঙ্গিক প্রশ্নও উুঁকি-ঝুঁকি দিচ্ছে- দল নিয়ে কোচ ও নির্বাচকদের মত পার্থক্য নতুন ঘটনা নয়। এমন নজির আছে অনেক। তাদের দু’পক্ষের দূরত্ব ও মতপার্থক্য তো বোর্ড শীর্ষ কর্তারা বসে কথা বলেই ঠিক করে ফেলতে পারতেন। এত ঘটা করে দু’স্তরে নির্বাচক কমিটি করার কী দরকার ছিল?

প্রশ্ন উঠেছে কার পরামর্শে এমন বিদঘুটে সিদ্ধান্ত? নির্বাচকদের বিপক্ষে থাকা কোচ চন্ডিকা হাতুরুসিংহকে সন্তুষ্ট করতেই কি নির্বাচকদের ক্ষমতা কমিয়ে মাথার ওপরে আরও তিন সদস্যের নির্বাচক কমিটি করা? তাই যদি হবে, তাহলে আবার ক্রিকেট অপারেশন্স কমিটির চেয়ারম্যান ও জাতীয় দলের ম্যানেজারকে যুক্ত করা কেন? এতে কি দল গড়া নিয়ে মতপার্থক্য-দ্বন্দ্বের অবসান হবে? না পুরো প্রক্রিয়াটি আরও জটিলতর হয়ে পড়বে? দুই স্তরের ছয় জনের নির্বাচক কমিটি দেখে কারো কারো সংশয়-শঙ্কা, ‘এতে না আবার অধিক সন্ন্যাসীতে গাজন নষ্ট হয়!’ তাহলে কিন্তু আম-ছালা দুই’ই যাবে।

বছর দেড়েক ধরে দল ভালো খেলছে। টেস্টে আহামরি পারফরমেন্সের দেখা না মিললেও সীমিত ওভারের ফরম্যাটে উন্নতি সুষ্পষ্ট। দল নির্বাচন নিয়ে তুগলকি কাণ্ড ঘটিয়ে শেষে না আবার টিম পারফরমেন্স ক্ষতিগ্রস্ত হয়?

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর