,



রাজদূর্নীতির বাণিজ্যে নৌকা বিক্রি চড়া দামে

আওয়ামী লীগের একাংশ ডুবেছে ইতিহাসের নির্লজ্জ মনোনয়ন বাণিজ্যে। তৃণমূল নেতৃত্বের কারণে নৌকা এবার বিক্রি হচ্ছে চড়া দামে। এমন মনোনয়ন বাণিজ্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের কোন নির্বাচনে ঘটেনি। মনোনয়ন বাণিজ্যের হাজারো অভিযোগের প্রেক্ষিতে কেন্দ্র মৌখিকভাবে দলের স্বাস্থ্য সম্পাদক ডা. বদিউজ জামান ভূঁইয়া ডাবলু, সাংগঠিসক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ও ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য সুজিত রায় নন্দির সমন্বয়ে একটি মৌখিক তদন্ত টিম করলেও কার্যত সেটি আই ওয়াসে পরিণত হয়েছে। অসহায়ের মত দেখা ছাড়া তাদের কিছুই করার নেই।

15.-peerএকসময় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি’র কপালে সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকার মনোনয়ন বাণিজ্যের যে কালো দাগ পড়েছিল, সেই কলঙ্ক মুছে দিয়ে আওয়ামলীগ এবারের ইউপি নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্যেকে তৃণমূল বিস্তৃতই করেনি, সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়েছে। এই নির্বাচনের মনোনয়ন বাণিজ্যই ঘিরেই নয়, উপমহাদেশের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী গণতান্ত্রিক ও গণমুখী আওয়ামী লীগ নামের কর্মী বান্ধব রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের আদর্শিক চেহারাই পাল্টে দিচ্ছে। আাওয়ামীলীগ নামের দলটিকে গণমুখী রাজনৈতিক সংগঠন থেকে ক্ষমতা নির্ভর এক ভোগ-বিলাস, বিত্ত-বৈভব ও আখের গোছানোর বাণিজ্যিক ইন্ডষ্ট্রিতে পরিণত করছেন কেন্দ্র থেকে তুণমূলের একটি দলীয় সিন্ডিকেট।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নানামুখী চাপ, বৈরী স্রোত এবং একের পর এক হত্যাকাণ্ড অস্থির সময়ের ভেতর অ্যারাবিয়ান ব্ল্যাক হর্সের মত উন্নয়নের গতিপথে জাতীয় প্রবৃদ্ধি ৭-এর উপর নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন তখন আওয়ামী লীগের এই চক্রটি লোভ লালনসার পথে মানব সেবার পথ থেকে সরে রাজনীতিকে “রাজবাণিজ্যের” পথে টানছেন।

আওয়ামী লীগের লাখো লাখো নেতাকর্মীর হৃদয়ে রক্তক্ষরণই ঘটছে না, মনোনয়ন বাণিজ্যের বিরুদ্ধে সংঘাত, ক্ষোভ-বিক্ষোভ, সংবাদ সম্মেলন ও প্রতিবাদের আগুন জ্বলছে। মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী, টাঈাইলের শামছুল হককে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করে যে আওয়ামী লীগ গঠিত হয়েছিল মুসলীমলীগের ব্যর্থতার অনিবার্য পরিণতিতে, গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুই নয়, শুরু থেকে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত আদর্শিক গণমুখী রাজনৈতিক সংগঠন হিসাবে এই দলকে সাংগঠিনক দক্ষতা ও দীর্ঘ লড়াই সংগ্রামের মধ্য দিয়ে নিজের ইমেজের উপর ভর করে যিনি তৃণমূল বিস্তৃত রাজনৈতিক দলে পরণত করেছিলেন, তিনি আমাদের মহান নেতা জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার অমিত সাহসী নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে গৌরবের মুকুটই পরেনি, গণতন্ত্র স্বাধীকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ব্যালট বিপ্লবে জাতীকে এক কাতারে এনে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্দিয়েছিল। ৭৫-এর ১৫ই আগষ্ট পরিবার পরিজনসহ জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইতিহাসের বর্বরোচিত হত্যাক্ররষ শিকার হলে এই দলটি প্রতিরোধের ডাক দিতে যেমন ব্যর্থ হয়েছে, তেমনি প্রথম সারির নেতারা শহীদ হয়েছেন। হাজার হাজার নেতাকর্মী জেল, মামলা, হুলিয়া, নির্যাতন ভোগ করেছেন। অনেকে গেছেন প্রতিরোধ যুুদ্ধের পথে নির্বাসনে।

ভাঙ্গা গড়ার ভেতর আদর্শিক চেতনায় সুসংগঠিত আওয়ামীলীগের সেই অন্ধকার সময়ে কুপির বাতির মত আশার আলো জ্বালিয়ে সংগ্রামের পথে এই আওয়ামী লীগকে বঙ্গবন্ধুর পর আরেক দফা তৃণমূল বিস্তৃত জনপ্রিয় রাজনৈতিক দলে পরিণত করে ব্যালট বিপ্লবে ক্ষমতায় এনেছিলেন তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা।

২০০১ সালের নির্বাচনে ক্ষমতায় আসা বিএনপি-যামায়াত জামানায় নির্যাতন ও প্রতিহিংসায় পতিত আওয়ামীলীগ কর্মীদের লাশের কপিন শেখ হাসিনা একাই টেনেছিলেন। আদর্শিক নেতা কর্মীরা প্রতিরোধ সংগ্রামে লড়েছেন। সেই জামানা থেকে অনেকে যেমন শিক্ষা নেননি, তেমনি নেননি ওয়ান ইলেভেনের অপমান নির্যতনের মুখে পতিত হয়েও। ওয়ান ইলেভেনের জটিল পরিস্থিতি থেকে নাবিকহীন আওয়ামী লীগকে শেখ হাসিনাই তাঁর অগণিত কর্মীদের শক্তিতে ঘুরেই দাঁড়াননি নিজের ক্যারিশমায় গণরায় নিয়ে ক্ষমতায়ও এনেছিলেন।

শেখ হাসিনা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, বিরোধী দলের আন্দোলন সংগ্রাম মোকাবেলা করে প্রজ্ঞা ও দক্ষতা নিয়ে দৃঢ়তার সঙ্গে চালিয়েছেন দেশ। আর মন্ত্রী-নেতারা করেছেন অতিকথন। কেউ লুটেছেন শেয়ারবাজার। কেউ লুটেছেন ব্যাংক। শেখ হাসিনার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কেউ কেউ জড়িয়েছেন দূর্নীতিতে। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি প্রশ্নবিদ্ধ বিতর্কিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতায় ফেরার চ্যালেঞ্জটিও শেখ হাসিনা একাই সংবিধানের দোহাই দিয়ে অতিক্রম করেছেন। রুখেছেন হেফাজতের প্রলয়, খুলেছেন পদ্মাসেতুর দুয়ার, দিয়েছন স্থল সীমান্ত চুক্তি ও সমুদ্র বিজয়ের আনন্দ। কিন্ত সারা দেশের নেতাকর্মীর একাংশ প্রশাসনের একটি পক্ষকে যুক্ত করে ক্ষমতার দম্ভে দিনে দিনে এতোটাই উন্মত্ত হয়ে উঠেছেন। এখন কার্যত তারা আওয়ামীলীগের মুখোমুখী দাঁড়িয়েছেন। কমিটি বাণিজ্যের পর নির্লজ্জভাবে দেশবাসীর সামনে উন্মুক্ত করেছেন মনোনয়ন বাণিজ্যের করুণ চিত্র। দলের অভ্যন্তরে তৃণমূল পর্যন্ত কর্মীদের মুখোমুখী কর্মীরা।

মনোনয়ন বাণিজ্যেকে ঘিরে ভিন্ন রাজনৈতিক মতাবলম্বী, হাইব্রিড, সুবিধাবাদী, প্রবাসী, দলীয় রাজনীতি থেকে নিষ্কৃয় লোকজন লেনদেনের মাধ্যমে অসংখ্য জায়গায় দলীয় প্রতীক নৌকা ভাগিয়ে নিয়েছেন। অনেকে নিচ্ছেন। অসংখ্য জায়গায় নির্বাচিত চেয়ারম্যানদের বাদ দিয়ে দল বিচ্ছিন্নদের মনোনয়ন দেয়া হচ্ছে। এই মনোনয়ন বাণিজ্যে মূল ভূমিকা পালন করছেন মাঠ পর্যায়ের দায়িত্বশীল নেতারা। কার্যত একমুখী নির্বাচনের মধ্যে দিয়েও বিদ্রোহীদের কাছে অনেকে পরাজিত হচ্ছেন।

টাঈাইলে একজন চেয়ারম্যান দলীয় রাজনীতিতেই ভূমিকা রাখেননি জনপ্রিয়তায়ও এগিয়ে ছিলেন। নৌকা না পেয়ে হাতে গোনা কয়েকটি ভোটে বিদ্রোহী হিসেবে হেরে যান। দুঃখ, অভিমান ও ক্ষোভে দুধস্নান করে রাজনীতি ও ভোট থেকে বিদায় নেন। মনোনয়ন বঞ্চিত অনেকে ঢাকায় এসে নেতাদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন। কেউ কেউ গণভবনে তাঁদের নেত্রী শেখ হাসিনার কাছে গিয়ে এর সুবিধাও পাচ্ছেন। যারা পৌঁছতে পারছেন না তাঁরা ফিরে গিয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হচ্ছেন অথবা দল থেকে নিষ্কিৃয় হচ্ছেন। সুনামগঞ্জ সদর উপজেলায় আজীবন আওয়ামী লীগ করে মনোনয়ন বঞ্চিত হয়েছেন আমির হোসেন রেজা। বার বার নির্র্বাচিত ওয়াহিদুর রহমান সুফিয়ানকে আরেক ইউনিয়নে দেওয়া হয়নি মনোনয়ন। সুনামগঞ্জ সদরে মনোনয়ন বাণিজ্যে নৌকার ভরাডুবি ঘটেছে। লন্ডনী অধ্যুসিত জগন্নাথপুরে রাতের বাণিজ্য চড়া দামে হয়েছে। একটি উপজেলায় নির্বাচিত চেয়ারম্যানদের বাদ দিয়ে যাদের মনোনয়ন দেয়া হয়েছিল তাদের পরাজয় ঘটেছে। অবাক নেতাকর্মীরা বলছেন বিদ্যুৎ গতিতে এমন নান্দনিক বাণিজ্য অতিতে দেখেনি দল। কুমিল্লায় তৃণমূূল থেকে নাম না আসা একজনকে ৪০ লাখ টাকায় মনোনয়ন দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। ঢাকার পাশেই একটি ইউনিয়নে নৌকার মূল্য উঠেছে তিন কোটি টাকা। সিলেটে দালাল আইনে অভিযুক্ত মামলার আসামীকে দেওয়া হয়েছে মনোনয়ন। চারদিকে শুধু দলের রাজনীতি থেকে রাজনীতি নির্বাসিত হয়ে রাজদূর্নীতির খবরই আসছে।

এ মনোনয়ন বাণিজ্য ঘিরে দফায় দফায় মারা মারি হয়েছে। চট্টগ্রামে হয়েছে দলীয় কার্যালয় ভাংচুর। মঙ্গলবার ময়মনসিংহের ধুবাউডায় ও হালূয়াঘাট উপজেলার নয়টি ইউনিয়নে বাণিজ্যের অভিযোগ এনে ঢাকার রিপোর্টাস ইউনিটিতে সংবাদ সম্মেলন হয়েছে। পৌরসভা নির্বাচনেও মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগের আঙুল উঠেছিল হালকা করে কেন্দ্রের দিকে। এবার অধিকাংশ জেলা ও উপজেলার নেতৃত্ব এবং কোথাও কোথাও এমপিরা এই মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগে অভিযুক্ত হচ্ছেন।

শরীয়তপুুরের একটি ইউনিয়নে উপজেলা ও ইউনিয়ন নেতারা একক প্রার্থী চূড়ান্ত করলেও এমপি সেখানে তাঁর পছন্দের প্রার্থী নিয়েই তদবির করেন। বরগুনার এক উপজেলার চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন ইউনিয়ন নেতাদের কাছ থেকে জোর করে স্বাক্ষর নিয়ে মনোনয়ন বাণিজ্য করেছেনে। এই জেলায় তিন রাজাকার পুত্র নৌকা প্রতীক পাওয়ায় দলের ত্যাগীরা বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন। বিক্ষুব্দ স্থানীয় কর্মীরা ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এ নিয়ে প্রতিবাদ করেছেন। ঢাকার পাশেই আরেক ইউনিয়নে ২৫ লাখ টাকায় নৌকা বিক্রি হয়েছে। ঢাকার সাভারে একটি ইউনিয়নে অসহায় চেয়ারম্যান ধরেই নিয়েছেন তিনি টাকাওয়ালা প্রার্থীর বিরুদ্ধে মনোনয়ন পাচ্ছেন না। রংপুর ও রাজশাহী বিভাগে মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ তুলনামূলক কম হলেও পঞ্চগড়ে মনোনয়ন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে। চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলায় উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক যে ইউনিয়ন প্রার্থীর তালিকা তৈরী করেছিলেন, সেটি কেন্দ্রে জমা দেয়ার দায়িত্ব ছিল জেলা আওয়ামীলীগ নেতাদের। তারা কেন্দ্র্রে জমা দেয়ার সময় তিন জনকে পরবির্তন করে তিন সন্ত্রাসীকে মনোনয়ন দেন বাণিজ্যের পথে। উপজেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পদক কেন্দ্রে এসে পরিবর্তনের চেষ্ট করলেও পারেননি। উল্টো ঐ সন্ত্রাসী প্রার্থীরা উপজেলা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের বাড়ির সামনে বসিয়েছেন সশস্ত্র মহড়া।

আওয়ামীলীগের মনোনয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, তৃণমূল একক প্রার্থী পাঠালে দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া তারাই দলের মনোনয় পান। তৃণমূল একক প্রার্থী ঠিক করতে না পারলে সেখানে যদি একাধিক প্রার্থী থাকে, তখন প্রধানমন্ত্রীর কাছে থাকা চারটি বেসরকারি সংস্থার জরিপের ফলাফলে থাকা প্রার্থীদের চূড়ান্ত করা হয়। একাধিক প্রার্থীর ক্ষেত্রে স্থানীয় এমপি ও জেলা নেতাদের মতামত নেন সাংগঠিনক সম্পদকেরা। এই সুযোগে তৃণমূল নেতৃত্ব ত্যাগী নিবেদিত প্রাণ কর্মীদের বাদ দিয়ে বিত্তশালীদেরই টানেন মনোনয়ন বাণিজ্যের পথে নৌকা প্রতীক দিতে। অনেক জেলায় হুমকি দমকি ও প্রভাব খাটিয়ে মনোনয়ন চাওয়া থেকে ত্যাগী নেতাকর্মীদের সরিয়ে রাখার অভিযোগও উঠেছে। দলের অনেকেই বলছেন, প্রতিদিন যেভাবে কেন্দ্রে অভিযোগ আসছে তাতে বিদ্রোহী প্রার্থী যেমন ঠেকানো যাচ্ছে না, তেমনি রোখা যাচ্ছে না গ্রাম পর্যায়ে দলীয় বিভক্তি। অনেকের আশঙ্কা ইউপি নির্বাচনের মনোনয়ন বাণিজ্যে না দলের জন্য ভয়ংকর অন্ধকার নামিয়ে আনে।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর