,



ঝুঁকিপূর্ণ ক্লোজারে মাটি ভরাটের কাজ এখনও শেষ হয়নি

পাউবোর নীতিমালা অনুযায়ী হাওরের বোরো ফসলরক্ষা বাঁধ নির্মাণের সময়কাল ২৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। আর মাত্র ১১ দিন বাকি থাকলেও অধিকাংশ ঝুঁকিপূর্ণ প্রকল্পের ক্লোজারের মাটি ভরাটের কাজ এখনও শেষ হয়নি। ক্লোজারগুলোর কাজ সময়মত শেষ না হওয়ার আশংকা করছেন কৃষকেরা। অন্যদিকে শনিবার সকাল থেকে বৈরি আবহাওয়া দেখা দিয়েছে। বৃষ্টিপাত শুরু হলে ক্লোজারগুলোর কাজ শেষ করা সম্ভব হবে না বলে জানিয়েছেন হাওরপাড়ের লোকজন। একইসাথে নির্মাণাধীন বাঁধের মাটি কমপেকশন (দুরমুজ) না দেয়ায় বাঁধগুলো ধসে যেতে পারে বলে জানিয়েছেন তারা।

তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের স্থানীয়ভাবে তদারকির দায়িত্বে থাকা শাখা কর্মকর্তা (উপ সহকারি প্রকৌশলীগণ) দাবি করেছেন, বাঁধ নির্মাণ কাজ দ্রুত গতিতে চলছে। সময়মত কাজ শেষ করা সম্ভব হবে, ইতোমধ্যে অধিকাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এখন শুধু বাঁশ-বস্তা দেয়া হবে। হাওর বাঁচাও সুনামগঞ্জ বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি অ্যাড. বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু বলেন,‘ আমরা কৃষকদের পক্ষে শুরু থেকে জোর তাগিদ দিয়ে আসছিলাম দ্রুত বাঁধের কাজ শেষ করতে। কিন্তু বাঁধের কাজ আশানুরূপ হয়নি। মাটি ফেলার কাজ চলমান থাকলেও কোথাও মাটি কমপেকশন করা হয়নি। বাঁধ মজবুত করতে সঠিকভাবে স্লোপ দেয়া হয়নি, উল্টো বিভিন্ন বাঁধের গোড়া থেকেই মাটি তোলা হয়েছে। গতকাল শনিবার থেকে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভবনা দেখা দিয়েছে। যদি বৃষ্টিপাত শুরু হয় তাহলে দুর্বল বাঁধের মাটি ধসে পড়বে ও ক্লোজারগুলোতে আর মাটি ফেলা সম্ভব হবে না। আমরা দাবি জানাই যতদ্রুত সম্ভব বাঁধের কাজ শেষ করা হোক।’

সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের পওর শাখা -১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী ও বাঁধ নির্মাণ বাস্তবায়ন ও মনিটরিং জেলা কমিটির সদস্যসচিব আবু বকর সিদ্দিক ভূঁইয়া জানিয়েছেন, শনিবার পর্যন্ত জেলার সার্বিকভাবে ৫৯ ভাগ কাজ হয়েছে। বাঁধ ও ক্লোজারের কাজ চলমান রয়েছে। সকল পিআইসিদের দ্রুত কাজ শেষ করার জন্য তাগিদ দেয়া হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পাশাপাশি জেলা-উপজেলা প্রশাসন সর্বক্ষণিক বাঁধের কাজ মনিটরিং করছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের শাখা কর্মকর্তাগণ বাঁধ এলাকায় থেকে নিয়মিত কাজ করছেন।

জানা যায়, জেলার ৩৭ হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধের মধ্যে প্রায় ১২০ টি গভীর ক্লোজার রয়েছে। এসব ক্লোজার দিয়ে হাওরের পানি নিস্কাশিত হয়। আবার নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে এসব ক্লোজার ভেঙেই হাওরে পানি ঢুকে বোরো ধান অকালে তলিয়ে যায়। পিআইসিকে ক্লোজারগুলোর কাজ আগে শেষ করার তাগিদও দেন উপজেলা কমিটি। চলতি বোরো মওসুমে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও নানা কারণে সময়মত হাওরের বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি। এতে করে সময়মত অধিকাংশ ক্লোজারসহ ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের কাজ শেষ না হওয়ায়র আশংকা রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দেখার হাওরের দক্ষিণ সুনামগঞ্জের জয়কলস ইউনিয়নের উতারিয়া-পাথারিয়া বাঁধের মাটির কাজ শেষ হয়েছে। বাঁশ পোতা শুরু হয়েছে, তবে বস্তা দেয়ার কাজ শুরু হয়নি। সদরপুরের ক্লোজারের মাটি দেয়ার পর বাঁশ-বস্তা দেওয়ার কাজ শেষ হয়েছে। দরগাপাশা ইউনিয়নের জামখলা ক্লোজারের (পাইকাপন গ্রামের কাছের বাঁধ) কাজ এখনও শেষ হয়নি। এই ক্লোজারে মাটি ফেলার কাজ অর্ধেক হয়েছে। গত বছর এই ক্লোজারের বাঁধ বার বার ধসে দিয়েছিল।

দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার পাউবোর শাখা কর্মকর্তা উপ সহকারি প্রকৌশলী ফারুক আল ইমরান বলেন,‘ উতারিয়া-পাথারিয়া বাঁধের মাটির কাজ শেষ, বাঁশ পোতার কাজ শুরু হয়েছে। জামখলা বাঁধের মাটি ফেলার কাজ অর্ধেকের চেয়েও বেশি হয়েছে। আমরা আশা করছি সময়মত সব কাজ শেষ করতে পারব। জগন্নাথপুরের বৃহৎ হাওর নলুয়ার হাওরের দাস নোয়াগাঁও গ্রামের কাছের ক্লোজারের মাটি ভরাট এখনও শেষ হয়নি। তবে মাটির কাজ পুরোদমে চলছে বলে জানা গেছে। মাটির কাজ শেষ করার পর এখানে বাঁশ ও বস্তা দেয়া হবে। জগন্নাথপুর উপজেলার পাউবোর শাখা কর্মকর্তা উপ সহকারি প্রকৌশলী হাসান গাজী বলেন,‘ নলুয়ার হাওরের ক্লোজার এলাকাসহ চার পিআইসির সভাপতিকে উপজেলা সদরে ডাকা হয়েছিল। আগামী ২২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে তারা কাজ শেষ করবেন বলে মুচলেকা দিয়েছেন। এর পরপরই বাঁশ-বস্তা দেয়া হবে। আমাদের আশা ২৮ তারিখের মধ্যেই সব কাজ শেষ করতে পারব।’

দিরাই উপজেলার রবাম হাওরের তুফানখালী ক্লোজার, মাছুয়ার খাড়ার ক্লোজার, চাপতির হাওরের বৈশাখীর ক্লোজারের মাটির কাজ শেষ হয়নি। উদগল বিল হাওরের জয়পুর বাঁধের স্লোপ কম, মাটি কমপেকশন করা হয়নি। বাঁধের কিছু অংশে গোড়া থেকে মাটি তোলা হয়েছে। দিরাই উপজেলার পাউবোর শাখা কর্মকর্তা উপ সহকারি প্রকৌশলী রিপন আলী বলেন,‘ বৈশাখী, তুফান খালী ও মাছুয়ার খাড়ার মাটির কাজ চলমান রয়েছে। এই তিনটি ক্লোজারে অর্ধেকের চেয়ে বেশী মাটি ভরাট হয়েছে। তুফান খালী ও বৈশাখীর ক্লোজারে একপাশে বাঁশ-বস্তা দেয়া হয়েছে। মাছুয়ার খাড়ার ক্লোজারে জিও টেক্সটাইল ও বস্তা দেয়া হবে। তিনটি ক্লোজারেই মাটি ফেলার কাজ দ্রুত গতিতে চলছে। ’

শাল্লা উপজেলার উদগল বিল হাওরের জয়পুর বাঁধের ৪০ ও ৪৫ নং প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে, এই দুইটি প্রকল্পের ক্লোজারে স্তুপ স্তুপ করে মাটি ফেলা হয়েছে। ভান্ডা বিল হাওরের নোয়া জাঙ্গালের ক্লোজার, হরিনগরের ক্লোজার, ছায়ার হাওরের ভেড়ামোহনার ক্লোজার, মুক্তারপুরের ক্লোজার, কালীকুটা হাওরের হাওয়ার বাঁধ ও হিংরার খাল ক্লোজারের কাজ এখনও শেষ হয়নি।

শাল্লা উপজেলার বাহারা ইউনিয়নের তাজপুর গ্রামের কৃষক ফজল মিয়া বললেন,‘ আমাদের গ্রামের পাশে ভেরামোহনা হাওরের ৩৭ নং প্রকল্পের কাজ হচ্ছে। ইচ্ছাখুশি কাজ করছে পিআইসি। ভাল করে বাঁধ তৈরি করতে বার বার অনুরোধ করলেও কেউ কোন কথা শুনছেন না। স্তুপ করে মাটি ফেলে সব উপরে মেশিন দিয়ে সমান করা হচ্ছে। পাউবোর এসওকে বললেও কাজ হয়নি। শনিবার এডিসি স্যারকে গ্রামের লোকজন জানিয়েছে। তিনি বলছেন বিষয়টির খোঁজ নিয়ে দেখবেন।’

শাল্লা উপজেলার পাউবোর শাখা কর্মকর্তা উপ সহকারি প্রকৌশলী সমশের আলী বলেন,‘ সব ক্লোজার ও বাঁধের মাটি ভরাটের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। আগামী ২০ ফেব্রুয়ারির মধ্যে মাটির কাজ শেষ হয়ে যাবে। এরপর শুধু বাকী থাকবে বস্তার কাজ। বস্তা কয়েকদিন পর দেয়ার চেষ্টা করব, কারণ রোদে শুকিয়ে বস্তা নষ্ট হয়ে যেতে পারে।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর