,



নিজের শেষ বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন যারা

বাঙালী কণ্ঠ নিউজঃ দিন কয়েক বাদেই ইংল্যান্ডে পর্দা উঠবে ক্রিকেট বিশ্বকাপের। ক্রিকেটের এই মহাযজ্ঞে লড়বে বিশ্বের দশটি ক্রিকেট খেলুড়ে দেশ। বিশ্বসেরা মঞ্চে কেউ যাচ্ছেন একদম নতুন হয়ে আবার কেউ যাচ্ছেন নিজের শেষ বিশ্বকাপ খেলতে।

নাগরিক বার্তার- বিশ্বকাপ ধারাবাহিকে এবার থাকছে সেই ক্রিকেটারদের নিয়ে যাদের জন্য ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ হতে যাচ্ছে ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ।

মাশরফি বিন মতুর্জা (বাংলাদেশ)- বাংলাদেশের সবচেয়ে সফলতম অধিনায়ক হলেন মাশরাফি। প্রথম বাংলাদেশি অধিনায়ক হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপে দলকে নেতৃত্ব দেবেন তিনি।

তার অধীনেই ২০১৫ বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল বাংলাদেশ। তার আগে ইংল্যান্ড, আফগানিস্তান ও স্কটল্যান্ডকে নিয়ে গড়া গ্রুপ ‘এ’ থেকে সেরা হয় টাইগাররা। সেবারই প্রথম বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে যায় বাংলাদেশ। যদিও কোয়ার্টারে ভারতের কাছে হেরে যায়। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপে দলের সবচেয়ে উত্তেজক ১৫ রানের জয়টাও স্মরণীয়।

২০০১ সালের ৮ নভেম্বর বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট ক্রিকেট দিয়ে অভিষেক হয় মাশরাফি বিন মর্তুজার। সেই ম্যাচটি বৃষ্টি বাগড়ায় অমীমাংসিত হলেও বল হাতে ঠিকই আলো ছড়িয়েছেন নড়াইল এক্সপ্রেস। অভিষেকেই ১০৬ রানের বিনিময়ে নেন ৪টি উইকেট। সেই বছর ২৩শে নভেম্বর ওয়ানডে ক্রিকেটে অভিষেক হয়।

২০০৬ সালে ক্রিকেট পঞ্জিকাবর্ষে মাশরাফি ছিলেন একদিনের আন্তর্জাতিক খেলায় বিশ্বের সর্বাধিক উইকেট শিকারী। তিনি এসময় ৪৯টি উইকেট নিয়েছেন। এই ছন্দময় ক্যারিয়ারে মাঝে হানা দেয় ইনজুরি নামক অসুখের। বারবার ইনজুরি সমস্যা তাঁর জীবন থেকে নানা সোনালী সময় কেড়ে নেয়। ১৮ বছরের ক্যারিয়ারে প্রায় ১১ বার চোটের কারণে মাঠের বাইরে থাকতে হয়েছে মাশরাফিকে। চোটের কারণেই দেশের মাটিতে ২০১১ সালের স্বপ্নের বিশ্বকাপে খেলতে পারেননি মাশরাফি।

২০০৯ সালে টেস্ট ছাড়ার পর ২০১৭ সালে ৬ই এপ্রিল বাংলাদেশ বনাম শ্রীলংকা সিরিজের শেষ টি২০ দিয়ে উনি আন্তর্জাতিক টি২০ খেলা থেকে অবসর নেন ম্যাশ। তবে এখনো ওয়ানডে ক্রিকেটে দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন মাশরাফি বিন মর্তুজা।

ক্যারিয়ারে ৩৬টি টেস্ট ম্যাচ খেলে ব্যাট হাতে ৭৯৭ রান নিয়েছেন মাশরাফি। বল হাতে সাদা-পোশাকে তাঁর উইকেট সংখ্যা ৭৮টি। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে তিনি ৫৪টি ম্যাচ খেলে ৩৭৭ রান করেছেন ও বল হাতে ৪২টি উইকেট নিয়েছেন।

আর ওয়ানডেতে এখন পর্যন্ত ১৯৬ টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলে মাশরাফি বিন মর্তুজা ব্যাট হাতে করেছেন ১ হাজার ৭২০ রান। আর বল হাতে নিয়েছেন ২৫১টি উইকেট।

ওয়ানডে ক্রিকেটে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ দলকে ৬৪টি ম্যাচে নেতৃত্ব দিয়েছেন অধিনায়ক মাশরাফি। এর মধ্যে ৩৫টি ম্যাচে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। হেরেছেন ২৭টি ম্যাচ। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে মাশরাফি বিন মর্তুজার নেতৃত্বে ২৮টি ম্যাচ খেলে ১০টিতে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। টেস্ট ক্রিকেটে তিনি একটি ম্যাচে বাংলাদেশকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। সেই ম্যাচটিতে বাংলাদেশ জয় পেয়েছিল।

দেশের হয়ে মোট তিনটি বিশ্বকাপ খেলেছেন তিনি। তিন বিশ্বকাপে ১৬ ম্যাচে নিয়েছেন ১৮ উইকেট। সেরা বোলিং ফিগার ৪/৩৮ (ভারতের বিপক্ষে ২০০৭ সালে)।তাছাড়া অধিনায়ক হিসেবে তাঁর অধীনে সাত ম্যাচে তিনটিতে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ। বাকি চারটির মধ্যে একটি পরিত্যক্ত হয়।

নিজের শেষ বিশ্বকাপ খেলতে দেশ ছাড়ার আগে মাশরাফি জানিয়েছিলেন,’ সম্ভবত নয়, নিশ্চিত এটা আমার শেষ বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপ ঘিরে আলাদা করে তৈরি করার আসলে কিছু নেই। আলাদা করতে গেলে চাপ থাকবে। আলাদা কিছু করেও মনে হয় না কিছু করতে পারব ইংল্যান্ডে। একজন খেলোয়াড় হিসেবে আগে পারফর্ম করার চেষ্টা করতে হবে। নিঃসন্দেহে অধিনায়কত্ব খুব গুরুত্বপূর্ণ হবে। আমার যে দায়িত্ব আছে, চেষ্টা করবো সেটা পুরোপুরি ঠিক করে রাখার।’

ক্রিস গেইল (ওয়েস্ট ইন্ডিজ)- সাত মাস বিরতি দিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ওয়ানডে দলে ফেরেন ক্রিস গেইল। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে দুর্দান্ত খেলা ওই সিরিজের সময় এ বিগহিটার জানান, বিশ্বকাপই হতে পারে তার শেষ ওয়ানডে টুর্নামেন্ট।

ইংল্যান্ড সিরিজে ফিরেই ক্রিকেটপ্রেমীদের গেইল জানান দেন, কেনো তিনি সামনে চলতে চান। আইসিসি র‌্যাঙ্কিংয়ের একনম্বর দল ইংল্যান্ডের বিপক্ষে চার ইনিংসে দুই সেঞ্চুরি ও দুই হাফসেঞ্চুরিসহ করেন ৪২৪ রান। ১৯৭৯ সালের পর আবার বিশ্বকাপ ট্রফি উচিয়ে ধরতে এবং তার বিদায় বেলায় ইংল্যান্ডের মাটিতে গেইলের এই রূপটা দেখতে চাইছে ক্যারিবীয়রা।

জেপি ডুমিনি (সাউথ আফ্রিকা)- দক্ষিণ আফ্রিকার এ অলরাউন্ডার আন্তর্জাতিক টি-২০ চালিয়ে যাবেন। তবে বিশ্বকাপের পর তাকে আর এক দিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচে দেখা যাবেনা। ইনজুরির কারণে বেশ কয়েক মাস মাঠের বাইরে থাকার পর গত মার্চে ডুমিনি ৫০ ওভার ফর্মেট থেকে অবসরের ঘোষণা দেন। নিজ শহর কেপ টাউনে দেশের হয়ে শেষ ওয়ানডে খেলার পর দিনই খবরটি কাশিত হয়- বিশ্বকাপের পর আর এক দিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলবেন না তিনি।

কলম্বোতে শ্রীলংকার বিপক্ষে ম্যাচে ডুমিনির ওয়ানডে অভিষেক ঘটে। পুরো ক্যারিয়ারেই বার বার ইনজুরিতে পড়েছেন তিনি। তা সত্ত্বেও ৫০৪৭ রান নিয়ে ওয়ানডে ক্রিকেটে দেশের শীর্ষ দশ স্কোরারের মধ্যে একজন ডুমিনি। দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে দুইশ’ ওয়ানডে খেলা তালিকায় অষ্টম স্থানে আছেন তিনি।

ইমরান তাহির (সাউথ আফ্রিকা)- দীর্ঘদিনের দুর্দান্ত ফর্মে ভক্তদের মনে আলাদা জায়গা করে নিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার তারকা বোলার ইমরান তাহির। কিন্তু এবার ক্রিকেটকে বিদায় জানানোর পালা।

ইংল্যান্ডের মাটিতে দেশের হয়ে শেষবারের জন্য বিশ্বকাপ মঞ্চে নিজের সেরাটা দিয়ে ওয়ানডে ক্রিকেট থেকে বিদায় নিতে চান ইমরান। বিশ্বকাপ খেলেই ওয়ানডে ক্রিকেট থেকে অবসরের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে এ যুগের অন্যতম সেরা লেগস্পিনার। বিশ্বকাপ পরবর্তী সময়ে দেশের হয়ে শুধু মাত্র টি-টুয়েন্টি ক্রিকেটে খেলবেন তিনি।

চলতি মাসেই ৪০ বছরে পা দিচ্ছেন প্রোটিয়া এ লেগস্পিনার। সাউথ আফ্রিকার হয়ে ২০ টেস্টের পাশাপাশি ৯৫টি ওয়ানডে ম্যাচ খেলেছেন তাহির। ৯৫ ওয়ানডেতে উইকেটের সংখ্যা ১৫৬টি। ৩৭টি টি-টুয়েন্টি ম্যাচে পেয়েছেন ৬২ উইকেট।

শোয়েব মালিক (পাকিস্তান)- নিজের বিদায়ক্ষণ আগেই জানিয়ে রেখেছেন পাকিস্তান তারকা অলরাউন্ডার শোয়েব মালিক। ২০২০ টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের পরই ক্রিকেটকে বিদায় বলবেন তিনি। পাঁচ বছরের দীর্ঘ বিরতি দিয়ে টেস্ট ক্রিকেটে ফিরেছিলেন। পরে মাত্র তিনটি টেস্ট খেলেই ২০১৫তে সাদা পোশাক থেকে অবসর নেন পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক। তবে লংগার ভার্সন থেকে ছুটি নিলেও ওয়ানডে ও টি-টুয়েন্টি খেলে যাচ্ছেন।

টি-টুয়েন্টি থেকে ২০২০-এ অবসর নিলে ওয়ানডেতে ২০১৯ বিশ্বকাপই হতে যাচ্ছে তার শেষ বিশ্বকাপ। তিনি বলেছেন, ২০১৯ ওয়ানডে বিশ্বকাপই হবে তার শেষ বিশ্বকাপ। সময়টা ঠিক করলেও মালিক জানিয়েছেন সবকিছু নির্ভর করছে পারফরম্যান্সের ধারাবাহিকতার উপর, ‘দুটি বিশ্বকাপই আমার বড় টার্গেট, যেদিকে তাকিয়ে আছি। দেখা যাক কী ঘটে। যদি ফর্মের ধারাবাহিকতা থাকে, তাহলে দুটি বিশ্বকাপই খেলব।’

পাকিস্তানের জার্সিতে ২৮২টি ওয়ানডে খেলেছেন মালিক। একদিনের ম্যাচে এখন পর্যন্ত ৭৪৮১ রান করেছেন, যা পাকিস্তানের পঞ্চম সর্বোচ্চ। ১৫৬টি উইকেটের সঙ্গে ৯৬টি ক্যাচ নিয়েছে ওয়ানডে ম্যাচে। ১৯৯৯তে অভিষেকের দুই দশক পর এবার শেষ করতে চাইছেন মালিক।

ডেল স্টেইন (সাউথ আফ্রিকা)- এক সময় আইসিসি বোলিং র‌্যাংকিংয়ের শীর্ষে থাকা এ বোলারের ইনজুরি যেন নিত্যসঙ্গী। তবে গত এক বা দুই বছর যাবত কাঁধের সমস্যাটা যেন তার পিছু ছাড়ছেনা। সমস্যাটা না থাকলে নিঃসন্দেহে তিনি থাকতেন বিশ্বের সবচেয়ে গতি সম্পন্ন ও ভীতিকর বোলারদের একজন।

আসন্ন বিশ্বকাপের আগে এখনো পুরোপুরি ফিট নন স্টেইন। তথাপি এ মেগা ইভেন্টে দক্ষিণ আফ্রিকার আশা ভরসার প্রতীকদের একজন হবেন তিনি। যদিও এখন পর্যন্ত নিশ্চিত নয়, তথাপি গত বছর জুলাই মাসেই ওয়ানডে ক্রিকেট থেকে অবসরে নিজের ইচ্ছার কথা জানান স্টেইন। সেমিফাইনালে নিউজিল্যান্ডের কাছে হেরে ২০১৫ বিশ্বকাপ থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার বেদনার বিদায়ের পর এবারের আসরে দলকে শেষ পর্যন্ত নিয়ে সঠিক সময়ে বিদায় জানাতে মুখিয়ে থাকবেন তিনি।

উপরের কয়েকজন তো বিশ্বকাপে যাওয়ার আগেই নিজেদের বিদায় নিয়ে মোটামুটি ইঙ্গিত দিয়ে গেলেন। তবে এর বাইরেও অনেকে আছেন, যারা ঘোষণা দেননি।  কিন্তু বয়স আর পারিপার্শিক কারণে বিশ্বকাপের পর একদিনের ক্রিকেট থেকে আরও অনেকেই বিদায় নিতে পারেন। এই তালিকায় আলোচিতদের মধ্যে আছেন ভারতের সাবেক অধিনায়ক মহেন্দ্র সিং ধোনি, সাউথ আফ্রিকা ওপেনার হাশিম আমলা, পাকিস্তানি অলরাউন্ডার মোহাম্মদ হাফিজ এবং শ্রীলঙ্কান পেসার লাসিথ মালিঙ্গাসগ আরও অনেকে।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর