,



পিতা-মাতা হত্যার দায় কী হাসিবের একার

খুজিস্তা নূর ই নাহারীন মুন্নী:

বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত গোলাম রাব্বি (৫৯) ও তার স্ত্রী শামিমা রাব্বির (৫৭) মৃতদেহ ২৪ এপ্রিল স্যানহোসে শহরে তাদের নিজ বাড়ি থেকে উদ্ধার করেন স্বজনরা। যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি দম্পতিকে হত্যার ঘটনায় তাদের দুই ছেলে হাসিব ( ২২) আর ওমরের ( ১৭) বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে স্যানহোসে শহরের পুলিশ।

সন্তানের হাতে ধর্মপ্রাণ মা-বাবার এমন করুণ মৃত্যুতে প্রবাসীরাই নয়, এদেশের মানুষ স্তম্ভিত। হতবাক। তাদের জানাজায় আসা মানুষজন ছিলেন ক্ষুব্ধ। কিন্তু কেন তারা নিজের বাবা-মাকে এভাবে গুলি করে হত্যা করলো, তার কারণ এখনো অস্পষ্ট। পিতৃহত্যা মাতৃহত্যার অভিযোগে হাসিব আর ওমরের দিকে সবার ঘৃণা ও নিন্দা মিশ্রিত চোখ। সবাই ওদের দোষ দিচ্ছে।

আমি ভাবছি, যে বাবা-মা সন্তানদের সুখের জন্য, তাদের উন্নত ভবিষ্যতের আশায় নিজেদের সুখ-শান্তিকে নির্বাসন দিয়ে বিদেশের কষ্টকর কঠিন জীবন বেছে নিয়েছে , কি এমন ঘটেছিলো যে জন্মদাতা পিতাকেই নয়, দশ মাস দশ দিন গর্ভে লালন করে জন্ম দিয়ে বুকের দুধ পান করানো থেকে সকল মায়া-মমতা ঢেলে লালন-পালন করে যিনি বড়  করেছিল সেই স্নেহময়ী মাকেও কেন হত্যা করল?

আমার আদরের ছেলে ধ্রুব কানাডায় পড়াশোনা করছে। সেও হাসিবেরই বয়সী কিন্তু কত কোমল, শান্ত ভদ্র। হাসিবের তো অমনই হওয়ার কথা ছিল। ওদের পিতা-মাতা আরও অনেক বেশি ধার্মিক মনে হয়েছে তাদের ছবি দেখে। তারপরও আমেরিকার মত উন্নত, সভ্য,  গণতান্ত্রিক ও মানবিক রাষ্ট্র যেখানে সংবিধান ও আইনের উর্দ্ধে কেউ নন।

এমন একটি মুক্ত মানবাধিকারের চেতনায় বিকশিত সামাজিক পরিবেশের দেশে জন্মগ্রহণ, বেড়ে উঠার পরেও সম্ভাবনাময় দুই তরুণ নিজেদের ভবিষ্যত অন্ধকার করে কিভাবে নিজের বাবা-মাকে হত্যা করতে পারলো!  যে বাবা-মা জীবনের প্রতিটি নিশ্বাস রক্ত, ঘাম শ্রম দিয়ে গভীর ভালবাসা স্নেহের বাধনে জড়িয়ে সন্তান মানুষ করছে। আজ কি এমন ঘটল যে সেই সন্তানই বাবা-মার খুনী?

একটি জায়গায় এসে আমার খটকা লাগছে, তা হচ্ছে বড় ছেলেটিকে যদি নষ্ট, পথভ্রষ্ট বলি তবে ছোট ভাইটি কেন বাবা-মার বিপরীতে বড়ভাইকে হত্যাকাণ্ডে সমর্থন করলো ? তবে কি বাবা-মার বাংলাদেশের সামাজিক মূল্যবোধ ধর্মীয় অতিরিক্ত গোঁড়ামিতে অনড় ছিলেন সেটি ওদের গলায় ফাঁস হয়ে দেখা দিয়েছিলো?  বড় ছেলেটি স্বীকার করেছে সে নিজে পিতা-মাতাকে হত্যা করেছে, কিন্তু হাসিব এটি বলতে ভুল করেনি তার ভাই ওমর নির্দোষ। ভাইটিকে বাঁচাতে চেয়েছে।

আমরা বিদেশে বেড়াতে গেলে আত্মীয়-পরিজন, বন্ধু- বান্ধবদের এককথায় প্রবাসী স্বজনদের নিবিড় নৈকট্য লাভ করি। তাদের আন্তরিক মায়া-মমতায়, আতিথেয়তায় মুগ্ধ হই। আমাদের চোখের সামনে যে সত্যটি প্রকটভাবে ধরা পড়ে সেটি হচ্ছে এখানকার সামাজিক ও ধর্মীয় মূলবোধে বড়  বড় হওয়া মানুষেরা যখন বিদেশের জীবন বেছে নেন তখন তাদের অনেকেই সেখানকার সাংস্কৃতিক, সামাজিক পরিবেশে কঠিন সংগ্রামের ভেতর দিয়ে নিজেদের নতুন করে প্রতিষ্ঠিতি করেন।ব্যবস্যা-বাণিজ্য,  চাকরি-বাকরি করে সন্তান জন্মদান লালন-পালনের মধ্যদিয়ে তাদের সুখস্বচ্ছল ও নিরাপদ সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেন। অনেকেই মাল্টি-কালচার সোসাইটিতে ভারসাম্য রক্ষা করে সুন্দর সুখী শান্তির জীবন-যাপন করেন। আবার অনেক যারা ভুলে যান তারা মনে-প্রাণে বাংলাদেশী হলেও সন্তানের জন্মগতভাবে এবং পরিবেশগতভাবে আমেরিকান।

একটি মাল্টি-কালচার তারা মুক্তমন নিয়ে সে দেশের শিল্প, সাহিত্যে-সংস্কৃতি, আচার-ব্যবহারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে অভিভাবকরা মানতে পারেন না। তারা স্বপ্ন দেখেন সন্তান বিলগেটসের মত বড় হোক। হাভার্ডে  পড়াশোনা করুক। নাসায় চাকরি পাক। জ্ঞানে-বিজ্ঞানে বড় হোক। বিদেশেীদের সাথে ভাষায় আধুনিকতায় ফ্যাশনে তাল মিলিয়ে চলুক। কিন্তু মানসিকভাবে ওদের মত না হোক। মনের দিক থেকে তাদের মত বাংলাদেশেী সামাজিক ও ধর্মীয় অনুশাসনে বাঁধা থাকুক।

এতে ঐদেশে জন্ম নিয়ে বেড়ে ওঠা সন্তানেরা পদে পদে বাবা-মার সঙ্গে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব ধরনের সংকট বা ক্রাইসিসে পড়ে। কখনো-সখনো বিষন্নতায় ভুগে। বাবা-মাও অস্থির অশান্ত হোন। সন্তানেরাও মানসিক দূরত্বে চলে যায়। তাদের দমবন্ধ লাগে। ওরা বাংলাদেশের আচার-ব্যবহার, কৃস্টি-সংস্কৃতি যেমন বোঝে না তেমনি বাবা-মা চাপিয়ে দিতে গেলে নিতে পারেনা, এতে করে পিতা-মাতার প্রতি একসময় অশ্রদ্ধা তৈরি হয়। তাদের জন্য বাবা-মার ত্যাগের মূল্য বা তাদের চাওয়া-পাওয়া বুঝতে পারেনা। কারণ কেবল ঘরটি ছাড়া বাইরে বেরুলে পুরোদেশ ও জগত সংসারের শিক্ষা-সংস্কৃতি ও মূল্যবোধ আলাদাভাবে দেখে। জন্ম ও বেড়ে ওঠার কারণে ওদের সুখ-দুঃখ,মূ্ল্যবোধ ও সংস্কৃতি আলাদা হলে ও সেটিই তাকে টানে। ৩০-৪০বছর আমেরিকায় থাকার পরও বাবা-মার দেশ বলতে বুঝেন বাংলাদেশ। সেখানে সন্তানের বয়সী যাই হোক তারা আমেরিকান। বাবা-মা নিজেদের বিশ্বাস থেকে নড়তে পারেন না বলেই জেনারেশন গ্যাপ হয়, তেমনি সন্তানেরাও তাদের আবেগ অনুভূতিও আত্মস্থ করা সামাজিক সাংস্কৃতিক পরিবেশ থেকে ফিরে আসতে পারে না বলে দুইপক্ষের গভীর স্নেহ-মায়া ও ভালবাসার মাঝখানে জন্ম নেয় মতবিরোধ সংঘাত। শুরু হয় অশান্তি ঝগড়া মনমালিন্য, পরিবারে বিভক্তির অসুখ অসহনীয় করে তোলে দুপক্ষকে।

বিপত্তি আরও বেশি করে ঘটে যখন পিতা-মাতা সন্তানদের ধর্মীয় অনুভূতিকে উপজীব্য করে তাঁদের সঠিক পথপ্রদর্শনের চেষ্টা করে। মাল্টিকালচার সমাজে বাস করলেও পিতা-মাতা সন্তানকে খাঁটি বাংলাদেশি মানসিকতাই নয়, ধর্মীয় মূল্যবোধ নিয়ে চলাফেরায় দেখতে চায়। অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সন্তানদের চেয়ে অনেক বেশি ধর্মীয় মূল্যবোধ তৈরির চেষ্টা করেন। এতে শুরু হয় টানপোড়েন। ভিন্নদেশ, ভিন্নধর্ম, ভিন্নজাতিসত্ত্বা, ভিন্ন সংস্কৃতিতে সন্তান সম্পূর্ণ দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে ভেঙ্গে পড়ে।

হাসিব আর ওমরের ক্ষেত্রে এমন কিছু হয়নি তো ? ওরা যদি সত্যি সত্যি নিজ পিতা- মাতাকে হত্যা করে থাকে তবে সম্পূর্ণ দোষ কি ওদের একার ? যেকোন হত্যাকাণ্ডই নিন্দনীয় ঘৃনিত অপরাধ। নিজের পিতা- মাতাকে হত্যা করার মত অপরাধ পৃথিবীতে আর বড় হতে পারে না। কিন্তু সন্তানের হাতে পিতা-মাতার খুন হওয়ার মত পরিবেশ পরিস্থিতি তৈরি হবার আগে তাদের কি আরো সাবধান অথবা সহানুভূতিশীল হওয়ার প্রয়োজন ছিল না? হাসিব কেন ছোট ভাই ওমরের সমর্থনে বাবা-মা কে হত্যা করল? পিতা-মাতা হত্যার দায় কি হাসিবের একার?

লেখক, সাবেক পরিচালক, ঢাকা স্টকচেঞ্জ

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর