,



ফ্রিডম পার্টির ক্যাডারদের আওয়ামী লীগে আনলো কারা

আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ বা ক্ষমতাসীন দলের কোনো নেতাকর্মী কোনো অপকর্ম করলেই তার অতীত নিয়ে টানাটানি শুরু হয়। পুলিশ অবশ্য তদন্তের স্বার্থেই অভিযুক্তের অতীত পর্যালোচনা করে। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা অতীত নিয়ে টানাটানি করে রাজনীতি করে। খুঁজে পেতে অতীতের কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা পেলেই তারা হাফ ছেড়ে বাঁচেন যেন। যাক আওয়ামী লীগ তো করেনি, করেছে অনুপ্রবেশকারী বা হাইব্রিড আওয়ামী লীগার। ব্যস, তাতেই যেন আওয়ামী লীগের দায়মুক্তি ঘটে।

আওয়ামী লীগের প্রয়াত সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম অনেক আগেই বলেছিলেন ছাত্রলীগে শিবির ঢুকেছে। আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরও অনেকদিন ধরেই আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে বিপ্লবী বক্তব্য দিয়ে আসছেন। ওবায়দুল কাদের কখনো তাদের ‘হাইব্রিড’, কখনো ‘কাউয়া’ বলেন। এমনকি আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাও বিভিন্ন সময়ে আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীদের ব্যাপারে কথা বলেছেন। সবাই অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে, কিন্তু তারপরও অনুপ্রবেশ থেমে নেই।

 শুনছি, চলমান শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে দলের অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। শেখ হাসিনার টেবিলে নাকি ১৫০০ জন অনুপ্রবেশকারীর তালিকাও আছে। আমি জানি সংখ্যাটা আরো অনেক বেশি। তবে এই ১৫০০ জনবকে বহিষ্কার করার চেয়েও আমার কাছে গুরুত্বপূণ প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগের কারা জামায়াত-শিবির, বিএনপি এবং ফ্রিডম পার্টির লোকদের আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ার এবং পদ পাওয়ার সুযোগ করে দিল? শেখ হাসিনার নিরাপত্তার স্বার্থেই এই প্রশ্নটির জবাব দরকার 

সুবিধা পেতে দলবদল আমাদের রাজনীতির অনেক পুরোনো সংস্কৃতি। বিশেষ করে সামরিক শাসকরা রাজনীতির মাঠে নিজেদের অবস্থান সংহত করতে রাজনীতিবিদদেরই দ্বারস্থ হন। এই সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদরা এসে সামরিক স্বৈরশাসককে বৈধতা দেন। ‘আমি তো দল বদলাই না। আমি সরকারি দল করি। সরকার বদলালে আমি কী করবো?’ মিরপুরের খালেকের এই উক্তি তো রাজনীতিতে অমর হয়ে আছে। এখন বাংলাদেশে খালেকদের কোনো অভাব নেই দলে দলে সবাই আওয়ামী লীগে যোগ দিচ্ছেন।

আওয়ামী লীগ যেন খাজা বাবার দরবার। সবার জন্য দুয়ার খোলা। কেউ ফেরে না খালি হাতে। কিন্তু আওয়ামী লীগ কেন সবার জন্য তার দুয়ার খুলে দিল? এই প্রশ্নের কোনো জবাব আমি জানি না। আওয়ামী লীগের সারাদেশে তৃণমূল পর্যায়েও সংগঠন আছে। এই শক্তিশালী তৃণমূলে ভর করেই আওয়ামী লীগ ৭৫এর পর টিকে থাকতে পেরেছিল। অনুপ্রবেশকারীরা বরং শক্ত তৃণমূলকে দুর্বল করে দেয়। এত শক্তিশালী তৃণমূল থাকতে অনুপ্রবেশকারীদের স্থান দিয়ে দলকে দুর্বল কেন করতে হবে, এটা কিছুতেই আমার মাথায় ঢোকে না। এটা এক ধরনের আত্মহনন প্রবণতা।

বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষকেই কি আওয়ামী লীগ বানিয়ে ফেলতে হবে। আওয়ামী লীগের সর্বশেষ কাউন্সিলে বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ শুধু যে কোন একটি দল নয়, আওয়ামী লীগ কোন সনাতনী দলও নয়, আওয়ামী লীগ একটি ত্যাগের নাম, আওয়ামী লীগ একটি অনুভূতির নাম; যে অনুভূতি ত্যাগের এবং আত্মত্যাগের।’সৈয়দ আশরাফের এই অনুভূতি সবাই ধারণ করতে পারে না। আসলে আওয়ামী লীগ হওয়া যায় না। কিন্তু টানা তিনবার ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগে এখন সেই ত্যাগী নেতাকর্মীরাই কোনঠাসা। অনুপ্রবেশকারী হাইব্রিডদেরই পোয়াবারো। স্মার্ট অনুপ্রবেশকারীদের ধাক্কায় আনস্মার্ট অনুভূতিপ্রবণ আওয়ামী লীগাররা পেছনের সারিতে।

লোকজন কেন দলে দলে আওয়ামী লীগে যোগ দিতে চায়? এই প্রশ্নের জবাব সবাই জানেন। সরকারি দলে থাকলে তদ্বিরবাজি, দখলবাজি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি সব করা যায়। আখের গোছানো যায় সহজেই। অনেকে আবার নানা রকমের মামলা থেকে রেহাই পেতে সরকারি দলে যোগ দেয় অনেকে। এমনকি সরকার বিরোধী আগুন সন্ত্রাস মামলার আসামীরাও আওয়ামী লীগে এসে বাঁচার রাস্তা খুঁজে পেয়েছে। অপরাধীরা তো সরকারি দলে যোগ দিয়ে বাঁচতে চাইবেই। কিন্তু সরকারি দল তাদেরকে বছরের পর বছর সে সুযোগ দিয়েছে কেন?

দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের প্রথম শিকার ঢাকা দক্ষিণ মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া। পরে জানা গেল খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া একসময় ফ্রিডম পার্টি করতো। তারপর যুবদল হয়ে যুবলীগে ঠাঁই নিয়েছে। পরে জানা গেল খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া শুধু ফ্রিডম পার্টি নয়, শেখ হাসিনার ওপর হামলা মামলার আসামী ছিল। টেন্ডার সম্রাট জি কে শামীম একসময় মির্জা আব্বাসের ডান হাত ছিলেন, করতেন যুবদল। সরকার বদলের সাথে সাথে দল বদলে যুবলীগ হয়ে গেছেন। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় শ্রীমঙ্গল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে হয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩২ নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজানকে। তার ঢাকার বাসায় অভিযান চালিয়ে এক কোটি টাকার ফিক্সড ডিপোজিটের কাগজ, ৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকার চেক এবং আগের দিন ৬২ লাখ টাকা তোলার কাগজ পাওয়া গেছে। পাগলা মিজানও নাকি একসময় ফ্রিডম পার্টি করতো এবং শেখ হাসিনার ওপর হামলা মামলার আসামী ছিল। বুয়েটে আবরার ফাহাদকে হত্যার ঘটনায় ছাত্রলীগের ১৯ জনকে আসামী করা হয়েছে। ছাত্রলীগের নেতারাই আবিষ্কার করেছেন, এই ১৯ জনের মধ্যে অন্তত ৩ জনের পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড জামায়াত বা বিএনপির।

জামায়াত হোক, শিবির হোক, বিএনপি হোক, ফ্রিডম পার্টি হোক; তারা দেশের প্রচলিত আইনে নিজ নিজ অপরাধে সাজা পাবে। কিন্তু তাদের আওয়ামী লীগে যোগ দেয়াতে আমি দোষের কিছু দেখি না। তারা তো নিজেদের অতীত ঢাকতে, সুবিধা পেতে আওয়ামী লীগের আড়াল চাইবেই। আমার প্রশ্ন হলো, কারা তাদের আওয়ামী লীগ যোগ দেয়ার, বড় পদ বাগিয়ে নেয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে। শুনছি, চলমান শুদ্ধি অভিযানের অংশ হিসেবে দলের অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে। শেখ হাসিনার টেবিলে নাকি ১৫০০ জন অনুপ্রবেশকারীর তালিকাও আছে। আমি জানি সংখ্যাটা আরো অনেক বেশি। তবে এই ১৫০০ জনবকে বহিষ্কার করার চেয়েও আমার কাছে গুরুত্বপূণ প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগের কারা জামায়াত-শিবির, বিএনপি এবং ফ্রিডম পার্টির লোকদের আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ার এবং পদ পাওয়ার সুযোগ করে দিল? শেখ হাসিনার নিরাপত্তার স্বার্থেই এই প্রশ্নটির জবাব দরকার।

অনুপ্রবেশকারীদের চেয়েও যারা তাদের আনলো, তারা বেশি বিপদজনক। দলের অভ্যন্তরীণ তদন্ত করে হলেও এদের খুঁজে বের করতে হবে এবং অনুপ্রবেশকারীদের আগে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। জামায়াত-শিবির, বিএনপি যাই হোক; ফ্রিডম পার্টির যে কোনো পর্যায়ের কোনো নেতা বা কর্মী কীভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ার সুযোগ পায়? অবিশ্বাস্য হলেও এটাই সত্যি এবং ভয়ঙ্কর। শেখ হাসিনার ওপর হামলা চালিয়ে যারা তাঁকে হত্যা করতে চায়, তেমন দুইজন ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছিলেন। খালেদ মাহমুদ ভুঁইয়া ঢাকা দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আর পাগলা মিজান শেখ হাসিনা যেখানে থাকেন; সেই গণভবন এলাকার ওয়ার্ড কাউন্সিলর; ভাবতেই ভয়ে আমি শিউড়ে উঠি। না জানি, এমন আরো কত ফ্রিডম পার্টি খোলস বদলে আওয়ামী লীগে ঘাপটি মেরে আছে?

লেখক : হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর