,



দুর্নীতি ও ক্যাসিনোবিরোধী শুদ্ধি অভিযানের একমাস

দুর্নীতি ও ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে দলমত নির্বিশেষে চলা শুদ্ধি অভিযানের একমাস পূর্ণ হলো আজ। এই বিশেষ অভিযানে সরাসরি দায়িত্ব পালন করছে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব)।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীতে অবৈধ ক্যাসিনোর বিরুদ্ধে চালানো অভিযানের মাধ্যমে শুরু হওয়া এই অভিযান শুরু থেকেই পেয়েছে ব্যাপক জনসমর্থন, আর জনমনে সৃষ্টি করেছে আস্থা। র‌্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন: বর্তমান সরকারের আমলে কেউ অন্যায় করার দুঃসাহস দেখালে তাকে ফল ভোগ করতে হবে।

এক মাস ধরে চলমান এ অভিযানে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি (বহিষ্কৃত) ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাটসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৮ জনকে। নগদ সাড়ে আট কোটি টাকাসহ জব্দ করা হয়েছে প্রায় ১৬৬ কোটি টাকার এফডিআর, বিভিন্ন ব্যাংকের ১৩২টি চেক বই ও ৬ কোটি ৭৭ লাখ টাকার চেক।

এছাড়াও ৭ দশমিক ২০ ভরি অলংকার (৮ কেজি) জব্দ করা হয়েছে, যার আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় চার কোটি টাকা। পাশাপাশি উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও বিদেশি মদ।

র‌্যাব সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত ১১টি ক্যাসিনো/ক্লাবে অভিযান পরিচালনা করেছে র‌্যাব, যার মধ্যে রাজধানীতে আটটি ও চট্টগ্রামে রয়েছে তিনটি। এসব ক্লাব থেকে উদ্ধার করা ক্যাসিনো সামগ্রীর দাম কয়েক কোটি টাকা। সব মিলিয়ে গত এক মাসে ক্লাব, বাসাবাড়ি ও অফিসসহ মোট ১৯টি স্থানে অভিযান চালানো হয়েছে।

অভিযানে এক মাসে সুপরিচিত আটজনসহ গ্রেপ্তার করা হয়েছে ১৮ জনকে। এছাড়া বিভিন্ন ক্যাসিনোতে র‌্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ২০১ জনকে আর্থিক জরিমানাসহ বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

অভিযান শুরুর দিন ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে ফকিরাপুলের ইয়ংমেনস ক্লাবের ক্যাসিনোতে অভিযান চালায় র‌্যাব। ওইদিন রাতেই একে একে ওয়ান্ডারার্স ক্লাব, মুক্তিযোদ্ধা চিত্তবিনোদন ক্লাব, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র, গোল্ডেন ঢাকা বাংলাদেশ ক্লাবে অভিযান চালিয়ে অবৈধ ক্যাসিনোর সন্ধান পায় তারা। ওই রাতেই ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক (পরে বহিষ্কৃত) খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়াকে গুলশানের বাসা থেকে অস্ত্র ও মাদকসহ আটক করেন র‌্যাব সদস্যরা।

২০ সেপ্টেম্বর আরেক যুবলীগ নেতা ‘টেন্ডারবাজ’ খ্যাত জি কে শামীমকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। এসময় তার অফিস থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা ও ১৬৫ কোটি টাকার এফডিআর উদ্ধার করা হয়। ওই রাতে রাজধানীর কলাবাগান ক্রীড়াচক্র ও ধানমন্ডি ক্লাবে অভিযান চালানো হয়, কলাবাগান ক্লাবের সভাপতি ও কৃষকলীগ নেতা শফিকুল আলম ফিরোজকে গ্রেপ্তার করা হয়।

২৬ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর মনিপুরী পাড়ার বাসায় অভিযান চালিয়ে মাদকসহ আটক করা হয় বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) পরিচালক ও মোহামেডান ক্লাবের ডিরেক্টর ইনচার্জ লোকমান হোসেন ভূঁইয়াকে। ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুরে বিদেশে পালানোর সময় থাইল্যান্ডগামী একটি প্লেন থেকে ‘অনলাইন ক্যাসিনোর হোতা’ সেলিম প্রধানকে আটক করা হয়।

অভিযানের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটে ৬ অক্টোবর। এদিন ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবলীগের সভাপতি (পরে বহিষ্কৃত) ইসমাইল হোসেন চৌধুরী সম্রাট ও তার সহযোগী এনামুল হক আরমানকে কুমিল্লা থেকে আটক করে র‌্যাব। পরে সম্রাটকে সঙ্গে নিয়ে রাজধানীতে তার অফিস ও কয়েকটি বাসায় অভিযান চালানো হয়।

সর্বশেষ ১১ অক্টোবর ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাবিবুর রহমান মিজান ওরফে পাগলা মিজানকে শ্রীমঙ্গল থেকে আটক করা হয়।

অভিযানে খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়া ও ইসমাইল হোসেন সম্রাটের অফিসে টর্চার সেলের সন্ধান পাওয়া যায়। যেখান থেকে নির্যাতনের কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন আকারের লাঠি ও ইলেকট্রিক শক দেওয়ার মেশিন জব্দ করা হয়েছে।

র‌্যাবের এক মাসের অভিযানে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন থানায় মোট ২৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে, এর মধ্যে ১১টি মামলার তদন্ত করছে র‌্যাব। খালেদ মাহমুদ ভূঁইয়ার দু’টি, জি কে শামীমের দু’টি, শফিকুল আলম ফিরোজের দু’টি, ফুয়াং ক্লাবের দু’টি, সেলিম প্রধানের একটি ও সম্রাটের দু’টি মামলার তদন্তভার পেয়েছে র‌্যাব।

র‌্যাবের ক্যাসিনো বিরোধী সকল অভিযানেই ছিলেন সংস্থাটির নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. সারওয়ার আলম। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি চ্যানেল আই অনলাইনকে বলেন: আমাদের অভিযান কোনো ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়, আমাদের অভিযান অন্যায় অনিয়মের বিরুদ্ধে। ভবিষ্যতেও এ অভিযান চলমান থাকবে।

রাজধানীর উত্তরায় বৃহত্তর উত্তরাস্থ গোপালগঞ্জ অ্যাসোসিয়েশনের পরিচিতি ও আলোচনা সভায় সম্প্রতি র‌্যাবের মহাপরিচালক ড. বেনজীর আহমেদ বলেন: আমাদের দেশ যেন বিশ্বের মধ্যে অন্যতম সেরা দেশ হয়ে উঠতে পারে সেজন্য অন্যায়ের বিরুদ্ধে, জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে, মাদকের বিরুদ্ধেসহ চলমান শুদ্ধি অভিযানে সকলকে সমর্থন জানাতে হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনামলে যদি কেউ অন্যায় করার দুঃসাহস দেখান, তাহলে তিনি তার ফল পাবেন। সেটা একদিন হোক বা দুইদিন পর হলেও ফল পাবেন।

বেনজীর আহমেদ বলেন: আপনারা যদি খেয়াল করেন দেখবেন, এবার প্রধানমন্ত্রীর নির্বাচনী ইশতিহারে কিন্তু দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি ঘোষণা করার কথা বলেছেন। চলমান দুর্নীতি বিরোধী বা শুদ্ধি অভিযান অনেক বড় একটি বিষয়। এই অভিযানে আমরা সহযোগী প্রতিষ্ঠান, আমরা প্রধানমন্ত্রীর সরকারের নির্দেশে কাজ করছি।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর