,



কৃষ্ণা কাবেরী হত্যা মামলার ফাঁসির আসামি জহিরুল পলাশ জেএমবির মামুনুর রশিদ

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ   রাজধানীর মোহাম্মদপুরে কলেজ শিক্ষক কৃষ্ণা কাবেরী হত্যা মামলার ফাঁসির আসামি জহিরুল ইসলাম পলাশ এখন নব্য জেএমবির সদস্য; তার নতুন নাম মামুনুর রশিদ।

পলাতক এই আসামি জঙ্গি দলে নাম লিখিয়ে চলে গিয়েছিলেন ভারতে। চার মাস আগে শিয়ালদা স্টেশনে গ্রেফতার হওয়ার পর তিনি এখন ভারতের কারাগারে বন্দি বলে জানিয়েছে বাংলাদেশের কাউন্টার টেররিজম পুলিশ।

গত জানুয়ারিতে কৃষ্ণা কাবেরী হত্যা মামলার রায়ে সিকিউরিটিজ কোম্পানির কর্মকর্তা এম জহিরুল ইসলাম পলাশের ফাঁসির রায় আসে। হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে তার আগেই তিনি গা ঢাকা দিয়েছিলেন।

কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের উপকমিশনার সাইফুল ইসলাম জানান, বুধবার রাতে চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসা তিন জঙ্গি গাবতলী বাসস্ট্যান্ডে গ্রেফতার হওয়ার পর তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করে তারা জহিরুল ওরফে মামুনের বিষয়ে নতুন তথ্য পান।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এমবিএ ডিগ্রিধারী জহিরুলের গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর বোয়ালিয়া ঘোড়ামারার রামচন্দ্রপুরে। স্ত্রী আর দুই সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় তিনি থাকতেন পল্লবীর ১৪ নম্বর রোডের একটি বাসায়। গুলশানের হাজী আহমেদ ব্রাদার্স সিকিউরিটিজের একজন ব্যবস্থাপক ছিলেন জহিরুল।

ওই সিকিউরিটিজের মাধ্যমে বিও অ্যাকাউন্ট খুলেছিলেন বিআরটিএ-এর প্রকৌশল বিভাগের তখনকার উপপরিচালক (বর্তমানে পরিচালক, অপারেশন,) সীতাংশু শেখর বিশ্বাস। তার স্ত্রী কৃষ্ণা কাবেরী মণ্ডল ছিলেন মোহাম্মদপুরের মিশন ইন্টারন্যাশনাল কলেজের সমাজকল্যাণ বিভাগের প্রভাষক।

শেয়ার ব্যবসার সূত্র ধরে জহিরুলের সঙ্গে সখ্যতা হয় সীতাংশুর। ব্রাদার্স সিকিউরিটিজের মাধ্যমে আট লাখ টাকা শেয়ার বাজারে খাটিয়েছিলেন তিনি।

কৃষ্ণা কাবেরী হত্যা মামলার নথি থেকে জানা যায়, ২০১৫ সালের ৩০ মার্চ সন্ধ্যায় সীতাংশুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে কেক, মিষ্টি আর মোমবাতি নিয়ে তার ইকবাল রোডের বাসায় হাজির হন জহিরুল।

কেক কাটার পর কৌশলে তিনি সীতাংশুকে চেতনানাশক মেশানো ফলের জুস খাইয়ে অচেতন করে হাতুড়িপেটার চেষ্টা করেন। কৃষ্ণা বাধা দিতে গেলে স্বামী-স্ত্রী দুজনকেই তিনি এলোপাতাড়ি পেটান।

পরে মোমবাতি থেকে কৃষ্ণার শাড়ি ও ঘরে আগুন ছড়িয়ে যায়। দগ্ধ কৃষ্ণাকে রাতে হাসপাতালে ভর্তি করার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ওই ঘটনায় কৃষ্ণার দুই মেয়েও হাতুড়ির আঘাতে আহত হয়।

ওই ঘটনার পর জহিরুলকে একমাত্র আসামি করে মোহাম্মদপুর থানায় মামলা করেন সীতাংশুর বড় ভাই সুধাংশু শেখর বিশ্বাস। গ্রেফতার হওয়ার পর আসামি জহিরুল আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দেন। কিন্তু পরে হাইকোর্ট থেকে জামিন পেয়ে তিনি লাপাত্তা হন।

এক বছরের বেশি সময় তদন্ত চালিয়ে ২০১৬ সালের ৩০ মে জহিরুলের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় গোয়েন্দা পুলিশ। সেখানে বলা হয়, সীতাংশুর শেয়ারের টাকা আত্মসাৎ করার জন্য তাকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন জহিরুল। এ বছর জানুয়ারিতে আদালত পলাতক জরিুলের ফাঁসির রায় দেয়।

কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের উপ কমিশনার সাইফুল ইসলাম বলেন, গত ২৪ জুন মাসে নব্য জেএমবির চার জঙ্গি কলকাতা পুলিশের স্পেশাল টাস্কফোর্সের (এসটিএফ) হাতে ধরা পড়ে। তাদের মধ্যে রবিউল ইসলাম নামে একজন ছিলেন ভারতীয়। আর মোহাম্মদ জিয়াউর রহমান ওরফে মহসিন, মোহাম্মদ শাহীন আলম ওরফে আল আমিন এবং মামুনুর রশিদ বাংলাদেশি।

‘এই মামুনই ঢাকার কৃষ্ণা কাবেরী হত্যা মামলার আসামি জহিরুল। সে কলকাতায় গ্রেফতার হওয়ার আগেই নব্য জেএমবির সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যাচ্ছিল।’

জহিরুল ছিলেন গুলশানের হাজী আহমেদ ব্রাদার্স সিকিউরিটিজের একজন ব্যবস্থাপকজহিরুল ছিলেন গুলশানের হাজী আহমেদ ব্রাদার্স সিকিউরিটিজের একজন ব্যবস্থাপকপুলিশ কর্মকর্তা সাইফুল বলেন, আদালতে ফাঁসির রায় আসার পর নব্য জেএমবির সদস্য সফিকুল ইসলাম ওরফে মোল্লাজী ও মোস্তফা মহসীন অরিফের মাধ্যমে ওই জঙ্গি দলে যোগ দেন জহিরুল। তাদের মাধ্যমেই ভারতে পাড়ি জমান।

‘ভারতে নব্য জেএমবির সদস্যদের আশ্রয়ে থেকে জহিরুল জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন। তার নতুন নাম হয় মামুনুর রশিদ।’

সেই মোল্লাজী ও আরিফের সঙ্গে মো. আবদুল্লাহ নামে একজন বুধবার রাতে ঢাকার গাবতলীতে গ্রেফতার হন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তারা পুলিশকে বলেছেন, নব্য জেএমবির সদস্য শাহিন আলম ওরফে আলামিন, জিয়াউর রহমান ওরফে মহসিন, আরিফ, কবির, জহিরুল ওরফে মামুনুর রশিদ ও হারুনসহ কয়েকজনকে নিয়ে তারা এ বছরের প্রথম ভাগে ভারতে যান। সেখানে ঝাড়খণ্ড, কেরালাসহ বিভিন্ন রাজ্যে তাদের বোমা তৈরি ও অস্ত্র পরিচালনার প্রশিক্ষণ চলে।

জুন মাসে মহসিন, আলামিন ও জহিরুল ওরফে মামুন ভারতীয় পুলিশের হাতে ধরা পড়লে মোল্লাজী ও অরিফ বাংলাদেশে চলে আসেন। তারপর তারা আব্দুল্লাহকে সঙ্গে নিয়ে নতুন করে ‘সাংগঠনিক তৎপরতা’ শুরু করেন বলে জানান উপকমিশনার সাইফুল।

নব্য জেএমবির চার জঙ্গি গত জুনে গ্রেফতার হওয়ার পর ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে খবরে বলা হয়, ভারতে যাওয়ার পর বেশ কিছুদিন হাওড়া জেলার বাগনানে এক বাসায় ভাড়া ছিলেন মামুনুর রশিদ ও আল আমিন। সেখান থেকে তারা বাড়ি ভাড়া নেন উলুবেড়িয়ায়। পরে চলে যান রাজাপুর থানার লায়েকপাড়ার আরেকটি বাসায়।

ওই বাড়ির মালিক সে সময় দাবি করেন, ভারতীয় আধার কার্ড ও ভোটার কার্ড দেখিয়েই মাসে ২৪০০ টাকায় ঘর ভাড়া নিয়েছিল দুজন। পরে জানা যায়, সেসব কার্ড ছিল জাল।

ওই বাসায় থেকে পাড়ায় পাড়ায় বাচ্চাদের খেলনা ফেরি করে বেড়াতেন মামুন ও আল আমিন। তাদের দেখে তখন কারও সন্দেহও হয়নি। কিন্তু পরে গ্রেফতারের পর তাদের মোবাইল ফোনে জঙ্গি মতবাদের লেখা, ছবি ও ভিডিও কনটেন্ট পাওয়ার কথা জানায় কলকাতার পুলিশ।

জহিরুল ওরফে মামুনকে দেশের ফেরানোর কোনো উদ্যোগ নেয়া হবে কি না জানতে চাইলে কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘সেখানে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। সেটার নিস্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকতে হবে। তবে পুলিশ তার ব্যাপারে খোঁজ খবর রাখছে।’

মোল্লাজী ও আরিফকে গ্রেফতারের পর ৫ দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে জানিয়ে সাইফুল বলেন, ‘তাদের কাছ থেকে এ ব্যাপারে আরও তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।’

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর