,



তলিয়ে গেছে সিলেটসহ ছয় জেলার ২ লাখ হেক্টর বোরো

উজানের পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টিতে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় সিলেটসহ ৬ জেলার হাওর অঞ্চলের প্রায় ২ লাখ হেক্টর জমির বোরো ধানের ক্ষেত তলিয়ে গেছে। সিলেটের প্রধান নদী সুরমা ও কুশিয়ারায় পানি বিপদসীমার ওপরে থাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা করছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই)। ডিএই সরেজমিন বিভাগ জানিয়েছে, সিলেট, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওরের নিম্নাঞ্চলগুলোর বোরো ক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি বাড়ছে। কী পরিমাণে ক্ষয়ক্ষতি হবে তা এখনও ধারণা করা যাচ্ছে না। তবে এপ্রিলের প্রথম দিকে বন্যা কখনও হয় না। ধান পাকার সময় বন্যা হয়ে থাকে। কিন্তু এ বছর আগে বন্যা এসেছে। ফলে পানি স্থির থাকলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে। আগামী ৪-৫ দিনের আগে পুরো ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করা সম্ভব হবে না। পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্যতম প্রধান নদী সুরমার পানি হ্রাস পেয়েছে। অপরদিকে কুশিয়ারা নদীর পানি সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অন্য দুটি নদী-মনু ও খোয়াইয়ের পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে। বর্তমানে এ এলাকার সুরমা নদী শুধু কানাইঘাট পয়েন্টে এবং কুশিয়ারা নদী শেওলা ও অমলশিদে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় সুরমা নদীর পানি হ্রাস পেতে পারে। অপরদিকে কুশিয়ারা নদীর পানি স্থিতিশীল থাকতে পারে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) সরেজমিন উইংয়ের পরিচালক চৈতন্য কুমার দাস বলেন, হাওরে পানি বাড়ছে। নতুন নতুন এলাকার বোরো ধান পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে। এটা দেশের ক্ষতি। আমাদের কিছুই করার থাকছে না। হাওরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধের কাজ সঠিক সময়ে শেষ না করায় এ ক্ষতি হচ্ছে। তিনি বলেন, উজান থেকে কী পরিমাণ পানি আসবে সেটি আমরা জানি না। সিলেটের দিকে পানি এখনও বাড়ছে। তাই আর ৪ থেকে ৫ দিন পর আমরা বলতে পারব কী পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।  নদীগুলোতে পলি পড়েছে। ফলে পানি এলেও সেটি বহন করতে পারছে না। ফলে তা তলিয়ে যাচ্ছে। আমাদের সিলেট অফিস জানায়, গত কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট বিভাগে ৪ জেলায় ১ লাখ ৬২ হাজার হেক্টর বোরো ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকরাও হতাশ হয়ে পড়েছে। সিলেট বিভাগকে দুর্গত এলাকা ঘোষণাসহ ৭ দফা দাবিতে মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। সিলেট ডিএইএর অতিরিক্ত পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) ড. মামুনুর রশীদ বলেন, বুধবার পর্যন্ত অব্যাহত বৃষ্টিতে সিলেট বিভাগের চার জেলায় ১ লাখ ৬২ হাজার ৯৬২ হেক্টর বোরো ফসল পানির নিচে নিমজ্জিত হয়েছে। এ বছর সিলেট বিভাগের চার জেলায় ৪ লাখ ৭৬ হাজার ৮৩ হেক্টর জমিতে বোরো ফসল চাষ করা হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. মঞ্জুরুল হান্নান গতকাল সুনামগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন। অপরদিকে অতিবৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট জেলায় ৫৮ হাজার ৭১০ হেক্টর বোরো ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। সুনামগঞ্জে ৯১ হাজার ৬৯০ হেক্টর, মৌলভীবাজারে ১০ হাজার ৪২ হেক্টর এবং হবিগঞ্জে ২ হাজার ৫২০ হেক্টর বোরো ফসল পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এর মধ্যে অতিমাত্রার বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা অব্যাহত পাহাড়ি ঢলে অন্যান্য জেলার চেয়ে সুনামগঞ্জ জেলায় বোরো ফসল পানির নিচে বেশি নিমজ্জিত হয়েছে। সিলেট বিভাগকে দুর্গত এলাকা ঘোষণাসহ ৭ দফা দাবিতে মানববন্ধন : সিলেট বিভাগকে দুর্গত এলাকা ঘোষণা, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ক্ষতিপূরণ প্রদান ও পুনর্বাসন, ১০ টাকা কেজি দরে চাল প্রদান, বিনামূল্যে কৃষি উপকরণ প্রদান, পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত ব্যাংক ও এনজিও ঋণ মওকুফ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ প্রদান ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঠিকাদার ও পাউবোর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের ৭ দফা দাবিতে গতকাল মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। গতকাল বিকেল ৩টায় সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে হাওর রক্ষা আন্দোলন সিলেটের উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। মৌলভীবাজার প্রতিনিধি জানান, বৃহত্তম হাকালুকি হাওরের বোরো ধান টানা দু’দিনের বৃষ্টিতে এখন পানির নিচে। হাওরের সর্বত্র থইথই করছে পানি আর পানি। কৃষকদের অতিকষ্টে ফলানো ধানের ওপর দিয়ে চলছে নৌকা। জেলার সর্বত্র চলছে হাহাকার। কয়েক মাসের ঘাম ঝরা পরিশ্রমে ফলানো বোরো ধানের একমুটও ঘরে আনতে পারেনি এ জেলার কোনো কৃষক। বোরো চাষিদের স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে। অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে জেলার হাকালুকি হাওর, হাইল হাওর, সোনাদিঘি, কাওয়াদিঘির হাওর ও কইরকোনা বিলসহ বিভিন্ন এলাকায় বুধবার বিকেল ৪টা পর্যন্ত ১৪ হাজার ৮৬২ হেক্টর জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এ ছাড়া জেলার বড়লেখা, জুড়ী ও কুলাউড়া পৌর শহরেও জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে জেলার কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার কৃষকরা নতুন ধান  ঘরে তোলার আশা ছেড়ে দিয়েছে। ওইদিন উপজেলার ১৬ হাজার ৩৬০ হেক্টর জমির মধ্যে তলিয়ে গেছে ১২ হাজার ৫৬০ হেক্টর। ধান কাটার উপযোগী না হওয়ায় কেউই ঘরে নতুন ধান তুলতে পারেনি। মৌলভীবাজার ডিএই উপপরিচালক মো. শাহজাহান তথ্যটি নিশ্চিত করে বলেন, এভাবে পানি বাড়তে থাকালে এ জেলার আরও বোরো ধান তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জের সব ক’টি হাওরের ফসল ডুবে যাওয়ায় দুর্ভোগ-দুর্দশায় পড়েছে প্রায় ১০ লাখ কৃষক। চোখের সামনেই ফসল তলিয়ে গেলেও কিছুই করার থাকছে না অসহায় কৃষকদের। এমন অবস্থায় সুনামগঞ্জ জেলাকে দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবি জানিয়েছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ সর্বস্তরের মানুষ। চৈত্র মাসের মাঝামাঝি সময়ে এমন ভয়াবহ দুর্ভোগে হাওর পাড়ের গ্রামগুলোতে হাহাকার চলছে। একমাত্র বেঁচে থাকার অবলম্বন বোরো ফসল হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে তারা। অনেকেই গরু-বাছুর বিক্রি করে বেঁচে থাকার চেষ্টা করছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. জাহেদুল হক জানিয়েছেন, গতকাল দুপুর পর্যন্ত জেলায় বাঁধ ভেঙে ও জলাবদ্ধতায় প্রায় ১ লাখ হেক্টর বোরো জমি তলিয়ে গেছে। কিশোরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে কিশোরগঞ্জের বিভিন্ন হাওরে অন্তত ৩০ হাজার হেক্টর বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। বিশেষ করে জেলার তিনটি হাওর উপজেলা ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম এবং আংশিক হাওর নিকলী ও করিমগঞ্জ উপজেলার অন্তত তিন ভাগের এক ভাগ জমি এরই মধ্যে পানিতে ডুবে গেছে। সরকারি হিসাবেই গতকাল পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ১৯ হাজার ৭৩০ হেক্টর। ঝুঁকিতে রয়েছে আরও ৭০ হাজার হেক্টর জমি। গত প্রায় ১০ দিনের টানা বৃষ্টি, ঝড়ো হাওয়া ও পাহাড়ি ঢলে জেলার ইটনা উপজেলার বর্শিকুড়া গ্রামের মেন্দার বাঁধ ভেঙে বড়িবাড়ী ও বাদলা ইউনিয়ন, অষ্টগ্রামের আবদুল্লাপুর, আদমপুর, কলমা, পূর্ব অষ্টগ্রাম, অষ্টগ্রাম সদর, কাস্তল, দেওঘর, বাঙ্গালপাড়া ইউনিয়ন ও মিঠামইনের ঢাকী, বৈরাটি, কেওয়ারজোড়, কাটকাল ও ঘাগড়া ইউনিয়ন, বিজয়ের বাঁধ ভেঙে জয়সিদ্ধি ইউনিয়ন ও সিঙ্গার বাঁধ ভেঙে মৃগা ইউনিয়ন, নিকলীর সিংপুর ইউনিয়নের সরাইল বাঁধ ভেঙে সিংপুর ও করিমগঞ্জের সুতারপাড়া ইউনিয়নের প্রয়াগ বিলের বাঁধ ভেঙে বিস্তীর্ণ বোরো ধানের জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। কিশোরগঞ্জ জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক মো. শফিকুল ইসলাম জানান, ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, নিকলী, বাজিতপুর ও করিমগঞ্জে গতকাল পর্যন্ত ১৯ হাজার ৭৩০ হেক্টর বোরো জমি পানিতে তলিয়ে গেছে। নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, পাহাড়ি ঢলের তোড়ে নেত্রকোনায় বাঁধ ভেঙে খালিয়াজুরি উপজেলার কীর্তনখোলা, পাঙ্গাসিয়া ও রোয়াইল হাওর, মোহনগঞ্জের ডিঙ্গাপোতা হাওরসহ বারহাট্টা, কলমাকান্দা, পূর্বধলা, আটপাড়া ও মদন উপজেলার কয়েকটি হাওরের বোরো ফসলের একাংশ পানিতে তলিয়ে যায়। জেলার কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানিতে মোহনগঞ্জ, খালিয়াজুরি, দুর্গাপুর, কলমাকান্দা, আটপাড়া, মদন, বারহাট্টা ও পূর্বধলা উপজেলায় গতকাল পর্যন্ত ১৬ হাজার ৮৮০ হেক্টর বোরো জমির ধান পানির নিচে রয়েছে। এর মধ্যে মোহনগঞ্জ উপজেলায় ৬ হাজার হেক্টর, খালিয়াজুরিতে ৪ হাজার ২০০ হেক্টর, কলমাকান্দায় ১ হাজার ৯৩০ হেক্টর, দুর্গাপুরে ১ হাজার ২০০ হেক্টর, বারহাট্টায় ১ হাজার ২০০ হেক্টর, মদনে ৯০০ হেক্টর ও সদর উপজেলায় ১০০ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে রয়েছে।   নাসিরনগর সংবাদদাতা জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হাওরবেষ্টিত নাসিরনগরে ভারি বর্ষণ, উজান থেকে নেমে আসা পানি ও মেঘনার জোয়ারে কয়েকটি গ্রামের প্রায় দুই হাজার বিঘা জমির বোরো ফসল তলিয়ে গেছে।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর