,



কুড়িগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের ডকুমেন্টারি: মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণে ‘বীরগাঁথা’ জীবন্ত ইতিহাস

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণে কুড়িগ্রামের মুক্তিযুদ্ধের ডকুমেন্টারি ‘বীরগাঁথা’ এক অনন্য জীবন্ত ইতিহাস। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানীদের অবদান ও সম্মুখযুদ্ধের বীরত্ব তুলে ধরতে ‘বীরগাঁথা’র সৃষ্টি।

মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান চিরস্মরণীয় করে রাখতে এ মহতী উদ্যোগের সফল বাস্তবায়ন করেছেন কুড়িগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) সুলতানা পারভীন। মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ডিসি সুলতানার নেতৃত্বে বেশ কয়েকজন উৎসাহী ও নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তি অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বইটির বাস্তব রূপ দিয়েছেন।

বইটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে তুলে দিতে চান বীরকন্যা ডিসি সুলতানা পারভীন। এ বইয়ের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিয়ে অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার অভিযাত্রায় কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসন কার্যকর ভূমিকা রেখেছে। বিশালাকারের বই ‘বীরগাঁথা’র পৃষ্ঠা সংখ্যা প্রায় ১৮ হাজার। ছয়টি ভলিউমের ১৩২টি খণ্ডের বইটিতে জেলার ৯টি উপজেলার মুক্তিযুদ্ধের নানা ইতিহাস-ঐতিহ্য স্থান পেয়েছে। এতে প্রয়াত এক হাজার ৫৭১ জন মুক্তিযোদ্ধার তথ্যসহ ৪ হাজার ২৭৩ জন মুক্তিযোদ্ধার নানা তথ্য রয়েছে। পাশাপাশি ২ হাজার ৭৩০ জন জীবিত মুক্তিযোদ্ধার দুই হাতের ছাপ, স্বাক্ষর বা টিপসই, মুক্তিযুদ্ধের দুর্লভ কিছু ছবি, সম্মুখসমরের গল্প ডকুমেন্টারিতে স্থান পেয়েছে।

সীমান্তবর্তী জেলা কুড়িগ্রাম ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর হানাদার মুক্ত হয়। মুক্তিযোদ্ধারা অসীম বীরত্ব ও সাহসিকতায় সঙ্গে লড়াই করে কুড়িগ্রামকে হানাদার মুক্ত করেন। জীবনবাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখায় জেলার অনেক মুক্তিযোদ্ধা বীর-বিক্রম ও বীর-প্রতীক উপাধি পেয়েছেন। বিশেষ করে সদ্য প্রয়াত বীর-প্রতীক তারামন বিবি কুড়িগ্রাম জেলাকে মহিমান্বিত করেছেন। বর্তমান বয়সের ভারে প্রতিনিয়ত না ফেরার দেশে চলে যাচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধারা।

কুড়িগ্রামের ডিসি সুলতানা পারভীন যুগান্তরকে বলেন, ডকুমেন্টারির প্রতিটি খণ্ডের পাতায় পাতায় জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের স্পর্শ রয়েছে। বইটি থেকে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম খুব সহজে জেলার মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে পারবে। তাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা জাগ্রত করতেও বইটি সহায়তা করবে। কেন এ বীরগাঁথা- জানতে চাইলে সুলতানা পারভীন বলেন, ‘আমার বাবা একজন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। দিনাজপুরের বালুবাড়িতে মহারাজা স্কুলে মাইন বিস্ফোরণে তিনি (বাবা) আহত হন। খুব ছোটবেলায় বাবার কাছে মুক্তিযুদ্ধের কথা শুনতাম আর শিহরিত হতাম। ছোটবেলার সেই শিহরণ ও আবেগ আমাকে বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে।’

তিনি বলেন, ‘কুড়িগ্রাম আমার কর্মস্থল বলে নয়, এখানকার মানুষ সহজ-সরল, মাটির মানুষ। মহান মুক্তিযুদ্ধে এখানকার সেই মাটির মানুষ আর আমার বাবার মুখে শোনা যুদ্ধকথা’র বাস্তব রূপ ‘বীরগাঁথা’। বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের কাছে ‘বীরগাঁথা’ এক জীবন্ত স্পর্শ লাভ করবে।’ তিনি আরও বলেন, তার খুব ইচ্ছা প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি সাপেক্ষে তার হাতে ‘বীরগাঁথা’ ডকুমেন্টারিটি তিনি তুলে দিতে চান। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে তিনি চিঠিও দিয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মো. ছালাহ উদ্দীন চৌধুরী বৃহস্পতিবার যুগান্তরকে বলেন, ‘বইটি পেয়েছি। তবে এখনও পুরোপুরি দেখিনি। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীকে দেখানোর পর তিনি সম্মতি দিলে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে। সম্মতি পাওয়া গেলে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর হাতে বইটি তুলে দেয়ার ব্যবস্থা করা হবে। বিষয়টি সময়সাপেক্ষ। বিজয় দিবসের আগে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।’

বইটির প্রচ্ছদশিল্পী কুড়িগ্রামের সাবেক পুলিশ সুপার (এসপি) মেহেদুল করিম পিপিএম যুগান্তরকে বলেন, মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতে ডিসি সুলতানা পারভীনের উদ্যোগ সত্যই অনন্য। তার এ কাজের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে সুলতানার (আমার ব্যাচমেট) কাছ থেকে সম্মাননাপত্র ও কভারপেজ ডিজাইন করার কাজটি স্বেচ্ছায় নিয়েছি। যদিও আমি প্রফেশনাল কোনো আর্টিস্ট না। তবে ভালোবাসা, সম্মান ও শ্রদ্ধার সঙ্গে কাজটি করে সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছি। আমাদের স্বপ্ন দিয়ে মোড়ানো বীরগাঁথা প্রধানমন্ত্রীর হাতে পৌঁছবে- একথা মনে হতেই শিহরিত হচ্ছি।’ ‘বীরগাঁথা’র সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন আরেক মুক্তিযোদ্ধার সন্তান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জিলুফা সুলতানা।

তিনি বলেন, ‘বীরগাঁথা’য় একজন মুক্তিযোদ্ধার হাতের ছাপ ছয়বার নিয়ে অরিজিনাল ছয়টি কপি করা হয়েছে। এখানে কোনো ধরনের ফটোকপি ব্যবহার করা হয়নি।’ ‘বীরগাঁথা’ কুড়িগ্রাম জেলার কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছে। কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার হলোখানা ইউনিয়নের সারোডোব গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা মতিয়ার রহমান যুগান্তরকে বলেন, ‘মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ডিসি সুলতানা পারভীন জেলার মুক্তিযোদ্ধাদের যেভাবে সম্মানিত করেছেন, আমাদের বীরগাঁথায় আবদ্ধ করেছেন তাতে আমি অভিভূত।’ তিনি আরও বলেন, ‘একদিন যে হাত দুটো দিয়ে অস্ত্র ধরেছি, যুদ্ধ করেছি, সেই হাত দুটো তুলে আল্লাহর দরবারে তার জন্য দোয়া করছি।’

সাবেক জেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার সিরাজুল ইসলাম টুকু বলেন, ‘আমি অভিভূত। আমরা শেষ বয়সে এসে এত সম্মান পাব ভাবিনি। ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ‘বীরগাঁথা’র পাতায় পাতায় মুক্তিযোদ্ধাদের স্পর্শ খুঁজে পাবে। এটা ভাবতেই ভালো লাগছে।’ উত্তরবঙ্গ জাদুঘরের প্রতিষ্ঠাতা ও কুড়িগ্রামের পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট এসএম আব্রাহাম লিংকন বলেন, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এক জীবন্ত ইতিহাস। এটি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচরে আনা সম্ভব হলে গোটা বাংলাদেশে জীবিত সব মুক্তিযোদ্ধার হাতের ছাপ নিয়ে জীবন্ত ইতিহাস রচনা করা সম্ভব।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর