,



রীতিমতো উষ্ণ রক্ত বইত ডাইনোসরদের ছিল উষ্ণ

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ নখগুলো কাস্তের মতো বাঁকানো। বন্ধ দরজার ওপারে দাঁড়িয়ে সেই নখ মাটিতে ঠুকে চলেছে সে। শিকারের জন্য অপেক্ষা। ‘জুরাসিক পার্ক’ ছবির সেই দৃশ্য মনে আছে নিশ্চয়ই? ব্যস! বিশ্ববাসীর কল্পনায় ডাইনোসর হয়ে উঠল শীতল রক্তের, খসখসে চামড়ার ভয়ংকর সরীসৃপ। তবে সম্প্রতি ডাইনো-ডিমের জীবাশ্ম পরীক্ষা করে ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষকদল জানিয়েছে, বিলুপ্ত এই প্রাণী সম্পর্কে জনমানসে চলে আসা ধারণাগুলো অনেকাংশে ভুল। তাঁদের মতে, ঠাণ্ডা রক্ত নয়, রীতিমতো উষ্ণ রক্ত বইত ডাইনোসরদের শরীরে।

গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি ‘জার্নাল অব সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’-এ প্রকাশিত হয়েছে। প্রধান গবেষক রবিন ডসনের মতে, ‘আমরা জানতে পেরেছি যে মেটাবলিজমের মাধ্যমে পরিবেশের নিরিখে দেহের উষ্ণতা বাড়ানোর বৈশিষ্ট্যটি ডাইনোসরদের এগিয়ে রেখেছিল।’

ডাইনোসররা শীতল রক্তের না উষ্ণ রক্তের, তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক চলছে। ষাটের দশকে জীবাশ্মবিদরা প্রথম প্রশ্ন তোলেন, এদের অনেকেই তো দৈত্যাকৃতি হওয়া সত্ত্বেও বেশ তৎপর ছিল। কোনো ঠাণ্ডা রক্তের প্রাণীর পক্ষে এই সক্রিয়তা কি সম্ভব? এই বিতর্কে জল না পড়লেও, ২০১৪ সালের এক গবেষণায় দাবি ওঠে, এরা শীতল বা উষ্ণ রক্তের মাঝামাঝি গোত্রের প্রাণী ছিল। এবার ডসনদের গবেষণা ভবিষ্যতে সিলমোহর পেলে তা বড়সড় পরিবর্তন আনতে পারে বিজ্ঞানীদের ধারণায়।

এই গবেষণার জন্য তিন গোত্রের ডাইনোসরের ডিমের খোলসের জীবাশ্ম পরীক্ষা করেছেন ডসনরা; মাংসাশী ট্রুডন (টি-রেক্সের ছোট জ্ঞাতি ভাই) এবং দুই নিরামিষভোজী মাইয়াসরাস ও দৈত্যাকার মেগালুলিথাস। এদের ডিমের খোলসের জীবাশ্ম বিশ্লেষণ করে ওই গবেষকদল এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, ঠাণ্ডা রক্তের তত্ত্বকে দ্রুব সত্য ধরে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। ডসনের মতে, ‘বিবর্তনের দিক থেকে দেখলে উষ্ণ রক্তের পক্ষীকুল ও শীতল রক্তের সরীসৃপের মাঝামাঝি আছে ডাইনোসররা। আমাদের গবেষণা অনুযায়ী, তাদের প্রধান গোষ্ঠীগুলোর সবারই শরীরের তাপমাত্রা পারিপার্শ্বিকের তুলনায় উষ্ণতর ছিল।’

ওই খোলসের জীবাশ্মে অক্সিজেন ও কার্বন পরমাণু কিভাবে সাজানো রয়েছে, সেটা দেখার চেষ্টা করেছিলেন গবেষকরা। লক্ষ্য ছিল এর ভিত্তিতে জন্মদাত্রী ডাইনোসর মায়ের দেহের তাপমাত্রা হিসাব করা। বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় এর নাম ‘ক্লাম্পড আইসোটোপ প্যালিয়োথার্মোমেট্রি’। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও ভূপদার্থবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক পিনসেলি হালের কথায়, ‘যেহেতু ডিমগুলো দেহের ভেতর তৈরি হতো, তাই এগুলোকে থার্মোমিটারের আদিম সংস্করণ বলা চলে।’ কিন্তু শুধু ওই খোলসের জীবাশ্ম পরীক্ষা করে কোনো স্থির সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব নয়। তাই অন্যান্য শীতল রক্তের অমেরুদণ্ডী প্রাণীর ডিমের খোলসের জীবাশ্মের ওপরও এক পরীক্ষা করেন তাঁরা। তখনই দেখা যায়, ডাইনোসরদের দেহের তাপমাত্রা পারিপার্শ্বিকের তাপমাত্রার তুলনায় বেশি। সহজ করে বললে, অন্য সরীসৃপরা যেখানে উষ্ণতার জন্য পারিপার্শ্বিকের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে ডাইনোসররা নিজেরাই দেহের অন্দর থেকে তাপ উৎপাদন করতে সক্ষম ছিল। তবে বিভিন্ন প্রজাতির মধ্যে এই উষ্ণতার মাত্রায় তারতম্য ছিল। ওই গবেষকদলের হিসাব, ট্রুডনের নমুনা যেখানে এর আশপাশ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি উষ্ণ ছিল, সেখানে মাইয়াসরাস ও মেগালুলিথাসের ক্ষেত্রে ওই মাত্রা ছিল যথাক্রমে ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস ও ৩ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে।

জুরাসিক পার্ক ফ্র্যাঞ্চাইজির ছবিগুলোতে দর্শকরা এমন কিছু প্রজাতিকেও ‘দেখতে’ পেয়েছিলেন, যাদের দেহে পালক রয়েছে, যাদের শরীরজোড়া হরেক কিসিমের রং। ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই গবেষকদলের ধারণা, অনেক ডাইনোসর শুধু দেখতেই সুন্দর ছিল বা পাখির মতো উড়তে পারত এমন নয়। সম্ভবত ঘুঘুর মতো ডাকও ছিল তাদের। অর্থাৎ ডাইনোসর মানেই কান ফাটানো গর্জন—এ ধারণাও অনেকাংশে ‘হলিউডি মিথ’ বলে মনে করছেন তাঁরা।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর