,



বিস্তৃত হচ্ছে বন্যা ফসলের ব্যাপক ক্ষতি

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ বৃষ্টি আর ভারতের পানির ঢলে নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এতে দেশের অনেক নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে।  উত্তরাঞ্চলের পর এবার বন্যা ছড়িয়ে পড়ছে মধ্যাঞ্চলেও। পদ্মা ও যমুনা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে প্লাবিত হয়েছে মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও জামালপুরের বিভিন্ন এলাকা। বন্যা প‚র্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে আগামী দু’তিনদিনে এই দুই নদীর পানি আরো বাড়বে। গতকালও দেশের ১১টি নদীর পানি বিভিন্ন পয়েন্টে বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এ পর্যন্ত অন্তত দেশের ১৫টি জেলায় বন্যা বিস্তৃত হয়েছে। এতে লাখ লাখ মানুষ এখন পানিবন্দি। ঘরবাড়ি ছেড়ে অনেকে আশ্রয় নিয়েছেন বাঁধে বা উঁচু স্থানে। বন্যার পানিতে ডুবে গেছে ক্ষেতের ফসল। ভেসে গেছে খামার ও পুকুরের মাছ। প্লাবিত এলাকায় দেখা দিয়েছে খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সঙ্কট। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সঙ্কটে বন্যার্তরা কষ্টে দিন কাটাচ্ছে। এসব এলাকায় ডায়রিয়াসহ পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। সরকারি ত্রাণ যা দেওয়া হচ্ছে তা খুবই অপ্রতুল। অনেকে ত্রাণ পাচ্ছেন না। কুড়িগ্রামে বন্যায় এ পর্যন্ত ৪ শিশুসহ ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। গত ২৪ঘন্টায় জেলায় ২১জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে।

যমুনায় পানি বৃদ্ধিতে টাঙ্গাইলের কয়েক এলাকা প্লাবিত হয়েছে। জামালপুরের ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মাদারগঞ্জ ও সরিষাবাড়ীতে নতুন করে কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সিরাজগঞ্জ সদরে যমুনা নদীর পানির প্রবল স্রোতে একটি বাঁধের ৭০ মিটার নদীতে ধসে গেছে। বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে পানি ঢোকায় বাড়িঘর ছেড়ে অনেকে আশ্রয় নিয়েছে উঁচু স্থানসহ বিভিন্ন পাকা সড়কে। এ কারনে বাঁধের অভ্যন্তরের পাচঠাকুরী এলাকার প্রায় ৫০টি বসতবাড়ি নদীতে বিলীনের আশংকায় অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। গাইবান্ধায় ঘাঘট নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে জেলার ৭৮ কিলোরমিটার এলাকাজুড়ে থাকা বাঁধের বিভিন্ন পয়েন্ট। কয়েক দিনের বৃষ্টি ও উজানের ঢলে বগুড়ার সারিয়াকান্দি পয়েন্টে যমুনার পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে বইছে। পানি বাড়ছে নওগাঁর আত্রাই ও ছোট যমুনা নদীর।

এদিকে, উত্তরাঞ্চলে তিস্তার পানি কিছুটা কমলেও বিপদসীমার উপরে রয়েছে ঘাঘট, ব্রহ্মপুত্র যমুনা ও আত্রাই নদীর পানি। লালমনিরহাটে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হলেও চর এলাকায় তিস্তার পাড়ে ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। লালমনিরহাট ও গাইবান্ধার চরাঞ্চলের নিচু এলাকায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক লাখ মানুষ। বিভিন্ন এলাকায় দেখা দিয়েছে নদী ভাঙ্গন। কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরীতে বন্যার পানির তোড়ে ভেঙ্গে গেছে অন্তারপাড় নদীর ওপর নির্মিত পুরোনো সেতু। এতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে ১২ গ্রামের হাজারো মানুষ। সুরমা ও পুরাতন সুরমা নদীর পানি বাড়ায় সুনামগঞ্জের হাওর পাড়ের নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে বিপাকে পড়েছে হাওড়পাড়ের মানুষ। সিলেটের সুরমা ও কুশিয়ারার পানি বাড়ায় ডুবে গেছে জকিগঞ্জ, বিয়ানীবাজার, ফেঞ্চুগঞ্জ, বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগরের বিভিন্ন এলাকা। যমুনা নদীর পানি বেড়ে বন্যায় বগুড়ার সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার মানুষ গবাদিপশু নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন। প্রাণিখাদ্যের সংকটের কারণে একদিকে যেমন গরু-মহিষ ও ছাগলকে চাহিদা অনুযায়ী খাবার দেওয়া যাচ্ছে না, অপরদিকে শুকনো জায়গার অভাবে নিরাপদ স্থানে রাখার জায়গা হচ্ছে না।

বগুড়া থেকে মহসিন রাজু জানান, সারিয়াকান্দি পয়েন্টে ১২ ঘন্টায় যমুনায় পানি ২ সেন্টিমিটার কমে বৃস্পতিবার বিপদসীমার ৬৪ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার তিনটি উপজেলা সোনাতলা, সারিয়াকান্দি ও ধুনটের চরাঞ্চলের প্রায় এক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে বিপাকে পড়েছে। এদিকে যমুনার পানি ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রন বাঁধের কাছে এসে পড়েছে। বাঁধে বসবাসকারি লোকজনের পাশাপাশি বাঁধের পশ্চিমপাড়ের লোকজন আতঙ্কে আছে। বন্যা কবলিত ৩ উপজেলা সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনটের চরাঞ্চলের বাড়ি ঘর, ফসল এখন পানির নিচে।

জেলা ত্রান ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আজাহার আলী মন্ডল জানান, সারিয়াকান্দি, সোনাতলা ও ধুনট উপজেলার যমুনা তীরবর্তী চরাঞ্চলের প্রায় ১৫ হাজার মানুষ ক্ষতি গ্রস্থ হয়েছে। তিনটি উপজেলার ৮৮ টি গ্রাম এখনও পানির নিচে ডুবে আছে। যমুনা সংলগ্ন তিন উপজেলায় আউস ধান, পাট, আখসহ বিভিন্ন ফসলে ক্ষতি হয়েছে বলে জানান জেলা কৃষি সম্্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক আবুল কাসেম আজাদ। ধুনট উপজেলার ভান্ডারবাড়ি ইউনিয়নে ১২ টি গ্রামে যমুনার বন্যার পানিতে ডুবে গেছে।

সিরাজগঞ্জ থেকে সৈয়দ শামীম শিরাজী জানান, জেলার সদরে যমুনা নদীর পানির প্রবল স্রোতে একটি বাধের ৭০ মিটার নদীতে ধসে গেছে। এ কারনে বাধ অভ্যন্তরের পাচঠাকুরী এলাকার প্রায় ৫০টি বসতবাড়ি নদীতে বিলীনের আশঙ্কায় অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে।

বুধবার রাত ১০টার দিকে সদর উপজেলার ছোনগাছা ইউনিয়নের শিমলা এলাকায় অবস্থিত স্পার বাধের ৭০মিটার ধসে যায়। ধসের মুখে পড়ায় ইতোমধ্যে পাচঠাকুরী এলাকার প্রায় ৫০টি বসতবাড়ি নদীতে চলে যাওয়ার আশংকায় অন্যত্র সরিয়ে নেয়া হয়েছে। আশংকায় রয়েছে আরও বেশকিছু বসতবাড়ি। বাধ ধসের কারনে এসব এলাকার মানুষের মধ্যে আতঙ্কক দেখা দিয়েছে।

কুড়িগ্রাম থেকে শফিকুল ইসলাম বেবু জানান, জেলার বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। ফলে বানভাসীদের বেড়েছে ভোগান্তি। সত্তরভাগ বানভাসীদের কাছে পৌছায়নি ত্রাণ সামগ্রী। আশ্রয়স্থান গুলোতে নেই বিশুদ্ধ পানি ও পয়প্রণালির সুবিধাদি। টানা ৬দিন ধরে ব্রহ্মপূত্র ও ধরলা নদী অববাহিকায় পানিবন্দী দুই লাখ মানুষ চরম ভোগান্তির মধ্যে দিন পার করছে। গতকাল ব্রহ্মপুত্র নদের পানি চিলমারী পয়েন্টে ৫৫ ও নুনখাওয়া পয়েন্টে ৪৬ সেন্টিমিটার এবং ধরলা নদী ব্রীজ পয়েন্টে ২৬ সেন্টিমিটার বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তবে তিস্তা নদী কাউনিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৫৪ সে.মি নীচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কুড়িগ্রাম সিভিল সার্জন ডাক্তার হাবিবুর রহমান জানান, বন্যায় এ পর্যন্ত ৪ শিশুসহ ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি মোকাবেলায় ৮৫টি মেডিকেল টিম কাজ করছে। গত ২৪ঘন্টায় জেলায় ২১জন ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে। কুড়িগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় নদী ভাঙন তীব্ররূপ ধারণ করেছে। ভাঙনের কবলে পড়েছে সারডোব, মোগলবাসা ও নুনখাওয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। এছাড়া জয়কুমর, থেতরাই, কালিরহাটসহ আরো ১২টি স্পটে ভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়েছে অন্তত ৫ শতাধিক পরিবার। বিলীন হবার পথে সারডোব বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের প্রায় ২০০ মিটার।

রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলা সংবাদদাতা মোজাম্মেল হক জানান, উপজেলার দৌলতদিয়া ঘাট পয়েন্টে ৩০ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে , যা বিপদ সীমার ৮ দশমিক ৯৫ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ২৪ ঘন্টার চেয়ে ১২ সেন্টিমিটার পানি বৃদ্ধি পেয়েছে । ১ ও ২নং ফেরি ঘাটে নদী ভাঙ্গন দেখা দিয়েছে। ফেরি ঘাটের পল্টুনের র‌্যাম মিড ওয়াটার থেকে হাই ওয়াটার পয়েন্টে সরানো হয়েছে। এদিকে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ার কারনে ঘাটের আশে পাশের গ্রাম ও ফসলি জমি তলিয়ে গেছে।

রংপুর জেলার চরাঞ্চলে পানিতে তলিয়েছে সবজি ক্ষেতসহ ফসলি জমি। তিস্তা ব্যারেজের সবকটি গেট খুলে দেওয়ায় নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে পানিবন্দি হয়ে আছে দুই হাজারেরও বেশি পরিবার। গেল ২৪ ঘণ্টায় রংপুরের গঙ্গাচড়া ও কাউনিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি কিছুটা কমলেও বেড়েছে ভাঙন ঝুঁকি। নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বেশ কয়েকটি ঘরবাড়ি। নদীগর্ভের খুব কাছাকাছি থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, মসজিদ ও মক্তব নিয়ে চিন্তিত স্থানীয়রা। রংপুরের পীরগাছা উপজেলার ছাওলা ইউনিয়নে পাঁচটি গ্রামে তিস্তার বন্যার পানিতে ভেসে গেছে প্রায় অর্ধশতাধিক মৎস্যচাষির স্বপ্ন।

এদিকে সুনামগঞ্জ জেলার বন্যা পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হলেও এ জেলার শাল্লা উপজেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এরই মধ্যে পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন শত শত পরিবার। তলিয়ে গেছে নিচু এলাকার মানুষের ঘরবাড়ি। বেশ কিছু পরিবার আশ্রয় নিয়েছেন বিদ্যালয়ে। গবাদিপশু নিয়ে বিপাকে পড়েছেন পানিবন্দি মানুষ। উজানের কয়েকদিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়িঢলের প্রভাব পরেছে হাওর পাড়ের এই উপজেলায়। উপজেলার ৪ টি ইউনিয়নের বহু গ্রামেই বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। বানের পানিতে ভেসে গেছে অনেক মৎস্য চাষির পুকুরের মাছ।

 

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর