,



পোলট্রি খাতে বিপর্যয় খামারিরা দিশেহারা

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ করোনা মহামারীর প্রভাবে ভীষণ চাপে পড়েছে পোলট্রি শিল্প। বাংলাদেশ পোলট্রি ইন্ডাস্ট্রিজ সেন্ট্রাল কাউন্সিল (বিপিআইসিসি) বলছে, এরই মধ্যে আট হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। ছোট ও মাঝারি খামারিদের ৪৫ থেকে ৫০ শতাংশ পুঁজি হারিয়েছে। ডিমের উৎপাদন এক-তৃতীয়াংশ কমেছে, মাংস উৎপাদন নেমে এসেছে অর্ধেকে।

দেশে করোনা সংক্রমণের শুরুতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজবে সাধারণ মানুষ ব্রয়লার মুরগির মাংস ও ফার্মের ডিম খাওয়া কমিয়ে দিলে এ বিপর্যয় নেমে আসে। পরে আড়াই মাসেও তা কাটিয়ে উঠতে পারেনি শিল্পটি। বরং শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার এগিয়ে না এলে ও জনসচেতনতা না বাড়লে ধ্বংস হয়ে যাবে খাতটি।

বিপিআইসিসি সহ-সভাপতি শামসুল আরেফিন খালেদ জানান, এ ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ব্যবসায়ী ও খামারিরা যতটুকু সহযোগিতা পাওয়ার কথা তা পাচ্ছে না। ফলে একের পর এক খামার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ডিমের দৈনিক উৎপাদন যেখানে সাড়ে চার কোটি হতো, সেখানে এখন পৌনে তিন কোটিতে নেমে এসেছে। ব্রয়লার মুরগির মাংসের দৈনিক উৎপাদন হতো তিন হাজার ২৭ টন, বর্তমানে হচ্ছে এক হাজার ৫০০ টন। এ কারণে মার্চ থেকে মে পর্যন্ত পোলট্রি শিল্পে প্রায় আট হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। জুলাই মাস নাগাদ পোলট্রি শিল্পের সঙ্গে জড়িত ১৫ থেকে ২০ লাখ মানুষ বেকার হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। সেইসঙ্গে তাদের ওপর নির্ভরশীল প্রায় ৪৫ থেকে ৫৫ লাখ মানুষের জীবনেও দারিদ্র্য নেমে আসবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

শামসুল আরেফিন খালেদ আরও জানান, পোলট্রি শিল্পে যুক্ত প্রায় ২০ লাখ নারীর অর্থনৈতিক সচ্ছলতা ও সামাজিক অবস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হতে শুরু করেছে। কোভিড মহামারী শুরুর আগে দেশে পোলট্রি খামারের সংখ্যা ছিল প্রায় এক লাখ। করোনা পরিস্থিতিতে ৫০-৬০ শতাংশ ব্রয়লার খামার সাময়িক বা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়। চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ায় ডিম পাড়া মুরগিও অনেক খামারি বিক্রি করে দেন। ফলে ডিমের উৎপাদন ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে। দ্রুত যদি এসব খামারিকে কিছুটা পুঁজিও না দেয়া যায়, তাহলে সামনে আরও বিপদ বাড়বে।

বিপিআইসিসি সূত্র জানায়, গত ফেব্রুয়ারিতে একেকটা ডিম ৮ টাকা করে বিক্রি হয়েছে। মুরগির কেজি ১৪০ টাকা আর মুরগির বাচ্চা ৪৫ টাকায় বিক্রি করেছিলেন ব্যবসায়ীরা। মার্চে তা কমে অর্ধেকে নেমে আসে। শেষ দুই মাসে নতুন করে প্রায় ৩০ হাজার খামারি পুঁজি হারিয়ে ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন।

এক ব্যবসায়ী জানান, দেশে করোনা সংক্রমণের শুরু থেকেই একটি চক্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ছড়ায়- ব্রয়লার মুরগি ও ফার্মের মুরগির ডিম থেকে করোনাভাইরাস ছড়াতে পারে। এরপর এ খাতে পণ্য পরিবহনে বাধা সৃষ্টি হওয়ায় সংকট আরও বাড়ে। তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন ক্ষুদ্র খামারিরা। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে ক্ষুদ্র খামারিদের নিবন্ধন করে ভর্তুকির আওতায় আনা জরুরি। পাশাপাশি হ্যাচারি, পোলট্রি ফিড ও বড় শিল্পগুলোকে আগামী ছয় মাস ঋণের সুদ মওকুফ ও কিস্তি পরিশোধ স্থগিত করা সময়ের দাবি।

ওই ব্যবসায়ী আরও বলেন, ক্ষতিগ্রস্তদের দ্রুত সহযোগিতা করতে হবে, যাতে তারা ঘুরে দাঁড়াতে পারেন। মনে রাখতে হবে, এই খাত পুঁজির সংকটে পড়লে দেশের ডিম ও মুরগির মতো নিত্যপণ্যের সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়বে। এতে মানুষের পুষ্টি ও খাদ্যনিরাপত্তায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। আর সরকার যে কৃষি খাতের জন্য প্রণোদনা সহায়তা ঘোষণা করেছে তা যদি এই খাতের উদ্যোক্তাদের না দেয়া হয়, তাহলে এই ডিম ও মুরগির উৎপাদন আগের অবস্থায় কখনও ফিরে আসবে না।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী স ম রেজাউল করিম বলেন, আমরা সংশ্লিষ্টদের খোঁজখবর রাখছি। সারা দেশে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের একটি তালিকা আমরা করছি। সে অনুযায়ী তাদের সহায়তা করা হবে। সরকার কৃষি খাতে প্রণোদনা দিয়েছে। এর বাইরেও আমরা আরও পোলট্রি, প্রাণিসম্পদ ও মৎস্য খাতের জন্য সহযোগিতা চাইছি। ক্ষতিগ্রস্ত উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহযোগিতা করা হবে। সহজ ঋণ দেয়া হবে।

খামারিদের খামার বন্ধ না করে যেভাবে হোক চালু রাখার পরামর্শ দিয়ে মন্ত্রী বলেন, পোলট্রি ও ডেইরি শিল্পের আর যেন কোনো ক্ষতি না হয় সেজন্য সবরকম ব্যবস্থা নিচ্ছে। মনে রাখতে হবে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ মতে, করোনা সংকটকালে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে পুষ্টিকর খাবার গ্রহণ করা প্রয়োজন। ডিম ও মুরগির মাংস এর সহজ ও স্বল্পব্যয়ী দুটি উৎস। প্রাণিজ পুষ্টির উৎস দুধ, ডিম, মাছ ও মাংসের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় সব ব্যবস্থা নিয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর