,



আজ রাসেলের জন্মদিন

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ আজ ১৮ অক্টোবর। ৪৫ বছর পেরিয়ে গেছে। ছেলেটি আজও সেই ১০ বছরের কিশোর। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার বয়স বাড়েনি। তার জন্য সময়ের চাকা স্তব্ধ।

১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট ঘাতকের নির্মম বুলেট কেড়ে নিল ছোট্ট রাসেলকে। বয়স তার মাত্র ১০ বছর ১১ মাস। মা-বাবা, দুই ভাই, দুই ভাবি, চাচা—সবার লাশের পাশ দিয়ে হাঁঁটিয়ে নিয়ে ঘাতকরা সবার শেষে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করল রাসেলকে। ওই ছোট্ট বুকটা তখন কষ্টে-বেদনায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মায়ের রক্তাক্ত লাশ দেখে আকুল আবেদন জানায়, ‘আমার হাসু আপার কাছে পাঠিয়ে দিন।’ এত মৃতদেহ দেখে যাদের সান্নিধ্যে স্নেহ-আদরে হেসেখেলে বড় হয়েছিল—কী কষ্টই না ও পেয়েছিল। কিন্তু ঘাতকের পাষাণহূদয় সে আকুতি শোনেনি। তারা ওয়্যারলেসের মাধ্যমে অনুমতি নিয়ে শিশু শেখ রাসেলকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। ‘কেন কেন কেন আমার রাসেলকে এত কষ্ট দিয়ে কেড়ে নিল ঘাতকরা?’ হাসু আপা কি এই কেনর উত্তর পাবেন না?

৩০ জুলাই ১৯৭৫ হাসু আপু জার্মানিতে স্বামীর কর্মস্থলে চলে যান। রাসেল খুব মন খারাপ করে থাকত। আপু তাকে নিয়ে যেতে চেয়েছিল। কিন্তু হঠাত্ জন্ডিস হয় এবং শরীর খারাপ হয়ে পড়ে। সে কারণে মা ওকে আর হাসু আপুর সঙ্গে যেতে দেননি।

টুঙ্গিপাড়ায় গ্রামের বাড়িতে ওর খেলাধুলার অনেক সাথি ছিল। বাড়ি গেলে গ্রামের ছোট অনেক বাচ্চা জড়ো করত। তাদের জন্য ডামি বন্দুক বানিয়ে দিয়েছিল। সেই বন্দুক হাতে তাদের প্যারেড করাত। প্রত্যেকের জন্য খাবার কিনে নিয়ে যেত। রাসেলের খুদে বাহিনীর জন্য জামা-কাপড় ঢাকা থেকেই কিনে নিয়ে যাওয়া হতো। মাছ ধরা খুব পছন্দ করত। কিন্তু মাছ ধরে আবার ছেড়ে দিত।

স্বাধীনতার পর এক ভদ্রমহিলাকে রাসেলের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো। রাসেলকে পড়ানো খুব সহজ কাজ ছিল না। শিক্ষককে ওর কথাই শুনতে হতো। প্রতিদিন শিক্ষিকাকে দুটি করে মিষ্টি খেতে হবে। মিষ্টি না খেলে ও পড়তে বসবে না। কাজেই শিক্ষিকাকে খেতেই হতো। তা ছাড়া সব সময় ওর লক্ষ্য থাকত শিক্ষিকার যেন কোনো অসুবিধা না হয়। মানুষকে আপ্যায়ন করতে রাসেল খুবই পছন্দ করত।

মা ওর জন্য প্রিন্স স্যুট বানিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ আব্বা প্রিন্স স্যুট যেদিন পরতেন, রাসেলও পরত। কাপড়চোপড়ের ব্যাপারে ছোটবেলা থেকেই তার নিজের পছন্দ ছিল। তবে একবার একটা পছন্দ হলে তা আর ছাড়তে চাইত না। সেই বালক বয়সেই রাসেলের মধ্যে আলাদা ব্যক্তিত্বের প্রকাশ লক্ষ করা গিয়েছিল। নিজের পছন্দের ওপর খুবই বিশ্বস্ত ছিল। খুবই স্বাধীন মত নিয়ে চলতে চাইত। অবাক হওয়ার মতো দৃঢ়তা ছিল ছোট মানুষটার চরিত্রে। বড় হলে সে যে বিশেষ কেউ একটা হবে তাতে কোনো সন্দেহ ছিল না।

রাসেল একটু একটু করে বড় হয়ে ওঠে। মা ও আব্বার দেওয়া নাম রাসেল। স্কুলে নাম ছিল শেখ রিসাল উদ্দীন। ১৯৭৫ সালে রাসেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাবরেটরি হাই স্কুলে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র।

রাসেলের সব থেকে আনন্দের দিন, যেদিন তার আব্বা ফিরে এলেন। এক মুহূর্তের জন্যও তাঁকে কাছছাড়া করতে চাইত না। সব সময় পাশে পাশে ঘুরে বেড়াত। অনেক খেলনা আনা হয়েছে। ছোট সাইকেল এসেছে। তার পরও কিছুক্ষণ পরপরই ও তার বাবার কাছে চলে যেত।

একাত্তরের ১৬ই ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হলো। রাসেল, তার মা, আপু মুক্তি পেল ১৭ ডিসেম্বর। পাকিস্তানি আর্মিদের আত্মসমর্পণে বাধ্য করে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর মেজর তাঁরা বাসায় প্রবেশ করলে রাসেল গিয়ে প্রথমে তাঁর সঙ্গে হ্যান্ডশেক করে। এর মধ্যে রাসেলের মাথায় একটা হেলমেট।

প্রথম দিকে রাসেল তার আব্বার জন্য খুব কান্নাকাটি করত। পরে চেষ্টা করত মনের কষ্ট লুকাতে। মাঝেমধ্যে রমার কাছে বলত তার দুঃখের কথা। ওর চোখে পানি দেখলে যদি জিজ্ঞেস করা হতো কাঁদছ কেন? বলত চোখে যেন কী হয়েছে। এতটুকু একটা শিশু কিভাবে নিজের কষ্ট লুকাতে শিখল। সে ছিল অত্যন্ত মেধাবী। পাকিস্তানি সেনারা তাদের অস্ত্রশস্ত্র পরিষ্কার করত। ও জানালার কাছে দাঁড়িয়ে সব দেখত। বিভিন্ন অস্ত্রের নাম ও বলতে পারত।

২৫শে মার্চ রাতে হানাদাররা রাসেলের বাবা বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ার পর মায়ের সঙ্গে অনেকের বাসায় থেকে তারপর একদিন পাকিস্তানি সেনারা ধানমণ্ডি ১৮ নম্বর রোডের একটি বাসায় গৃহবন্দি রাখল। রাসেল সেই বন্দিজীবন পছন্দ করত না। সে বাসার বাইরে গিয়ে খেলতে চাইত। তার প্রিয় সাইকেল এনে দেওয়ার জন্য জেদ করত। মা তাকে অনেক কষ্টে সামলাতেন। ছোট্ট রাসেলও বন্দি জীবন যাপন করতে শুরু করে। ঠিকমতো খাবারদাবার নেই। কোনো খেলনা নেই, বইপত্র নেই, কী কষ্টের দিন যে ওর জন্য শুরু হলো। পাকিস্তানি সেনাদের ব্যবহার এতটাই খারাপ ছিল যে মনে হতো যেকোনো সময় মেরে ফেলতে পারে। যখন স্বাধীন বাংলা রেডিও শুনে রাসেল মুক্তিযুদ্ধের গান মুখস্থ করে নিজেই গাইত, পাকিস্তানি সেনারা জিজ্ঞেস করত ‘ক্যায়া গাতা হ্যায়?’ রাসেল গাইত জয় জয় জয়, গাছের পাতা হয়, যাতে পাকিস্তানি সেনারা কিছু বুঝতে না পারে। ছোট্ট হলেও সে বুঝতে পারত, জয় বাংলা বললে পাকিস্তানি সেনারা গুলি করতে পারে। এই সময় নবজাত শিশু ভাগ্নে সজীব ওয়াজেদ জয় ছিল তার খেলার একমাত্র সাথি।

২৫শে মার্চ ১৯৭১ সাল, বাংলার আকাশে গাঢ় অমানিশার কালরাত্রি আর মুহুর্মুহু অশনি পতন। ৩২ নম্বরে পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে আজ রাতের খাওয়া খেতে পারেননি বঙ্গবন্ধু পরিবার। রাত দেড়টা, একটা ট্যাংক, কয়েক ট্রাক বোঝাই মিলিটারি। রাসেল তখন মা-বাবার সঙ্গে ঘুমিয়েছিল ঘরে। ৩২ নম্বরের বাড়ির সামনে এসে থামল পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। সেই বাড়িটি তাক করে প্রায় সব সেনা মিলে কিছুক্ষণ গুলি চালাল। একটা গুলির খোসা ঘরে এসে ওর পায়ের ওপর পড়ে। বেশি বয়স পর্যন্ত বোতলে দুধ খেত রাসেল। সেদিন তাই ঘুমের মধ্যে দুধ খাচ্ছিল সে তার আব্বার হাত থেকে। গোলাগুলির আওয়াজ পেয়ে তিনি উঠে স্ত্রী ও ছোট ছেলেকে ঠেলে বাথরুমে ঢুকিয়ে দিলেন। চোখের সামনে থেকে বাবাকে ধরে নিয়ে গেল পাকিস্তানি সেনারা। স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার অপরাধেই তার আব্বাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ছোট্ট রাসেল কিছুই বুঝতে পারেনি।
২২ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯, তখন রাসেলের বয়স চার বছর পার হয়েছে। কিন্তু ভীষণ রোগা হয়ে গিয়েছিল বলে ওকে বয়সের তুলনায় ছোট্ট দেখাত। মুক্তি পেয়ে বাবা ফিরে এসেছেন। রাসেল সারা দিন নিচে খেলা করে, খেলার ফাঁকে ফাঁকে কিছুক্ষণ পরপরই তার আব্বাকে দেখে আসে। আব্বার বাড়ির নিচতলায় অফিস। কিছুক্ষণ দেখত আবার খেলা করত। মনে মনে বোধ হয় ভয় পেত, সে তার আব্বাকে বুঝি আবার হারায়।
টমির সঙ্গে তার খুব ভাব। ছোট রাসেল টমিকে নিয়ে খেলে। খেলতে খেলতে হঠাত্ টমি ঘেউ ঘেউ করে ডেকে ওঠে, এতে রাসেল ভীষণ ভয় পেয়ে যায়। ও কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘টুমি বকা দিচ্ছে।’ টমি ওকে কেন বকা দিয়েছে, এটা সে কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। কারণ টমিকে সে খুব ভালোবাসে! হাতে করে খাবার দেয়। নিজের পছন্দের খাবারগুলোর ভাগ টমিকে দেবেই। সেই টমি বকা দিলে দুঃখ তো পাবেই।

২৭ মে ১৯৬৭ রোজনামচায় বাবা বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, “পাঁচটায় আবার গেটে যেতে হলো। রেণু এসেছে ছেলে-মেয়েদের নিয়ে। রাসেল আমাকে পড়ে শোনাল, আড়াই বছরের ছেলে আমাকে বলছে, ‘ছয় দফা মানতে হবে—সংগ্রাম, সংগ্রাম—চলবে চলবে—পাকিস্তান জিন্দাবাদ’, ভাঙা ভাঙা করে বলে, কী মিষ্টি শোনায়! জিজ্ঞেস করলাম, ‘ও শিখল কোথা থেকে?’ রেণু বলল, ‘বাসায় সভা হয়েছে, তখন কর্মীরা বলেছিল তাই শিখেছে।’ বললাম, ‘আব্বা, আর তোমাদের দরকার নাই এ পথ। তোমার আব্বাই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করুক।”

২৮ এপ্রিল ১৯৬৭ বাবা লিখছেন বহুদিন পরে ছেলে-মেয়েদের ও রেণুর সঙ্গে প্রাণ খুলে কথা বললাম। প্রায় দেড় ঘণ্টা। রাসেল এবার আমার কোলে, একবার তার মার কোলে, একবার টেবিলের ওপরে উঠে বসে। আবার মাঝেমধ্যে আপন মনেই এদিক-ওদিক হাঁটা-চলা করে। বড় দুষ্ট হয়েছে, রেহানাকে খুব মারে। রেহানা বলল, ‘আব্বা দেখেন আমার মুখখানা কী করছে রাসেল মেরে।’ আমি ওকে বললাম, ‘তুমি রেহানাকে মারো?’ রাসেল বলল, ‘হ্যাঁ, মারি’। বললাম, না আব্বা আর মেরো না। উত্তর দিল, ‘মারব।’ কথা একটাও মুখে রাখে না।

১৪ এপ্রিল ১৯৬৭ লিখেছেন, “জেলগেটে যখন উপস্থিত হলাম ছোট ছেলেটা আজ আর বাইরে এসে দাঁড়াইয়া নাই দেখে একটু আশ্চর্যই হলাম। আমি যখন রুমের ভিতর যেয়ে ওকে কোলে করলাম আমার গলা ধরে ‘আব্বা’, ‘আব্বা’ করে কয়েকবার ডাক দিয়ে ওর মার কোলে যেয়ে ‘আব্বা’, ‘আব্বা’ করে ডাকতে শুরু করল। ওর মাকে ‘আব্বা’ বলে। আমি জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ব্যাপার কী?’ ওর মা বলল, ‘বাড়িতে ‘আব্বা’, ‘আব্বা’ করে কাঁদে তাই ওকে বলেছি আমাকে ‘আব্বা’ বলে ডাকতে। রাসেল আব্বা আব্বা বলে ডাকতে লাগল। যেই আমি জবাব দিই সেই ওর মার গলা ধরে বলে, ‘তুমি আমার আব্বা।’ আমার ওপর অভিমান করেছে বলে মনে হয়। এখন আর বিদায়ের সময় আমাকে নিয়ে যেতে চায় না।”

১৭ মার্চ ১৯৬৭ তারিখে লিখেছেন, ‘আজ আমার ৪৭তম জন্মবার্ষিকী। তখন সাড়ে চারটা বেজে গিয়েছে, বুঝলাম আজ বোধ হয় রেণু ও ছেলে-মেয়েরা দেখা করার অনুমতি পায় নাই। পাঁচটাও বেজে গেছে। ঠিক সেই মুহূর্তে জমাদার সাহেব বললেন, চলুন, আপনার বেগম সাহেবা ও ছেলে-মেয়েরা এসেছে। আড়াই বত্সরের ছেলে রাসেল ফুলের মালা হাতে করে দাঁড়াইয়া আছে। মালাটা নিয়ে রাসেলকে পরাইয়া দিলাম। সে কিছুতেই পরবে না, আমার গলায় দিয়ে দিল। ওকে নিয়ে আমি ঢুকলাম রুমে। ছেলে-মেয়েদের চুমা দিলাম। সিটি আওয়ামী লীগ একটা বিরাট কেক পাঠাইয়া দিয়াছে। রাসেলকে দিয়েই কাটালাম, আমিও হাত দিলাম। জেলগেটের সকলকে কিছু কিছু দেওয়া হলো।’

১১ জানুয়ারি ১৯৬৭ বঙ্গবন্ধু তাঁর রোজনামচায় লিখেছেন, জেলগেটে রেণু এসেছে ছেলে-মেয়ে নিয়ে দেখা করতে। ছেলে-মেয়েদের মুখে হাসি নাই। ওরা বুঝতে শিখেছে। রাসেল ছোট্ট, তাই এখনো বুঝতে শিখে নাই। শরীর ভালো না, কিছুদিন ভুগেছে। দেখা করতে এলে রাসেল আমাকে মাঝেমধ্যে ছাড়তে চায় না। ওর কাছ থেকে বিদায় নিতে কষ্ট হয়।

দোতলার বারান্দায় রাসেল খেলা করত, যখনই দেখত পুলিশের গাড়ি যাচ্ছে তখনই চিত্কার করে বলত, “ও পুলিশ কাল হরতাল। যদিও ওই ছোট্ট মানুষের কণ্ঠস্বর পুলিশের কানে পৌঁছাত না। কিন্তু রাসেল হরতালের কথা বলবেই। বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে হরতাল হরতাল বলে চিত্কার করত। স্লোগান দিত ‘জয় বাংলা’।”
আম্বিয়া বুয়া সব সময় ওকে দেখে রাখে। রাসেলের খাবার খেতে একেবারে ভালো লাগে না কিন্তু রান্নাঘরে বাবুর্চি, দারোয়ান, কাজের বুয়ারা ফুল আঁকা টিনের থালায় করে যখন সবাই খেতে বসে ও ওদের সঙ্গে গিয়ে বসত। রান্নাঘরে পিঁড়ি পেতে বসে লাল ফুল আঁকা থালায় করে ভাত খুব মজা।

বাসায় কবুতরের ঘর ছিল। অনেক কবুতর থাকত তাতে। মা খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতেন। রাসেলকে কোলে নিয়ে নিচে যেতেন এবং নিজের হাতে খাবার দিতেন কবুতরদের। হাঁটতে শেখার পর থেকেই রাসেল কবুতরের পেছনে ছুটত, নিজ হাতে ওদের খাবার দিত। গ্রামের বাড়িতেও কবুতর ছিল। কবুতরের মাংস সবাই খেত। সকালে নাশতার জন্য পরোটা ও কবুতরের মাংস ভুনা সবার প্রিয় ছিল। তা ছাড়া কারো অসুখ হলে কবুতরের মাংসের ঝোল খাওয়ানো হতো। ছোট বাচ্চাদের কবুতরের স্যুপ করে খাওয়ালে রক্ত বেশি হবে, এই ধারণা থেকে নিয়মিত বাচ্চাদের কবুতরের স্যুপ খাওয়ানো হতো। রাসেলকে কবুতরের মাংস দেওয়া হলেও খেত না।
হাসু আপার কোলে চড়ে কত গান শুনত, কত কবিতা শুনত। কামাল ভাই, জামাল ভাই, দেনা আপুর কোলে সারা দিন। রাসেলের কান্না রেকর্ড করে  তাকেই বাজিয়ে শোনাত হাসু আপা। মা কান্নার শব্দ শুনে রান্নাঘর থেকে ছুটে এসে দেখতেন টেপরেকর্ডার বাজছে। ভয়ও হতো যদি কোল থেকে পড়ে যায়। যদি ব্যথা পায়। ওর খুব কষ্ট হবে। আব্বা খুব আদর করতেন ওকে। বাইরে থেকে ঘরে ফিরেই প্রথমে রাসেলকে খুঁজতেন। ওকে কোলে বসিয়ে কত কথা বলতেন। রাসেলও কত কথা জিজ্ঞেস করত। ওর বলার ভঙ্গিটা ছিল খুব মজার। বরিশাল, ফরিদপুর, ঢাকার আঞ্চলিক ভাষা ও উর্দু মিশিয়ে একটা নিজস্ব ভাষায় কথা বলত রাসেল।

বাবা বঙ্গবন্ধু তাঁর কারাগারের রোজনামচায় লিখেছেন, “৬ জুলাই ১৯৬৬ বিকালে চা খাবার সময় সিকিউরিটি জমাদার সাহেবকে আসতে দেখে ভাবলাম বোধ হয় বেগম সাহেবা এসেছেন। গত তারিখে আসতে পারেন নাই অসুস্থতার জন্য। ‘চলিয়ে, বেগম সাহেবা আয়া।’ আমি কী আর দেরি করি?  তাড়াতাড়ি পাঞ্জাবি পরেই হাঁটা দিলাম গেটের দিকে। সেই পুরান দৃশ্য। রাসেল হাচিনার কোলে। আমাকে দেখে বলছে, ‘আব্বা!’ আমি যেতেই কোলে এলো। কে কে মেরেছে নালিশ হলো। খরগোশ কিভাবে মারা গেছে, কিভাবে দাঁড়াইয়া থাকে দেখাল।”

রাসেল যেমন ছিল মায়ের নয়নের মণি, তেমনি ছিল বাবার স্নেহধন্য, অন্য ভাই-বোনদের আদরের ধন। তার ছোট্ট জীবনের অর্ধেকটা সময়ই সে তার বাবাকে দেখেছে ‘বাবার বাড়িতে’ থাকতে আর সে থেকেছে মা, ভাই ও আপুর সঙ্গে ৩২ নম্বর ধানমণ্ডিতে। কারাগারে বাবাকে দেখতে গেলে, ফেরার সময় খুব  কষ্ট হতো রাসেলের। একবার খুব মন ভার করে বাসায় ফিরল। জিজ্ঞেস করতেই বলল, ‘আব্বা আসলো না। বলল, ওটা তার বাসা, এটা আমার বাসা। এখানে পরে আসবে।”

রাসেল পাঁচ ভাই-বোনের সবারই বড় আদরের। সবার ছোট বলে তার আদরের কোনো সীমা নেই। ও কখনো যদি একটু ব্যথা পায় সে ব্যথা যেন সবার লাগে। সব ভাই-বোন সব সময় চোখে চোখে রাখে তাকে, ওর গায়ে এতটুকু আঁচড়ও যেন না লাগে। তবে শৈশব থেকেই বাড়ির রাজনৈতিক পরিবেশ ও নানা সংকটের মধ্যে তাকে কাটাতে হয়েছে।

ব্রিটিশ দার্শনিক বার্ট্রান্ড রাসেলের খুব ভক্ত ছিলেন বাবা শেখ মুজিবুর রহমান আর মা ফজিলাতুন নেছা মুজিব, বার্ট্রান্ড রাসেলের বই পড়ে মাকে বাংলায় ব্যাখ্যা করে শোনাতেন বাবা। মা বার্ট্রান্ড রাসেলের দর্শনতত্ত্ব শুনে শুনে এত ভক্ত হয়ে যান যে নিজের ছোট সন্তানের নাম রাখেন রাসেল। শেখ রাসেল অতি কঠিন এক দুঃসময়ের মধ্যে বেড়ে ওঠে। ছয় দফার আন্দোলন করতে গিয়ে বারবার জেলে যেতে হয় বাবাকে আর আগরতলা যড়যন্ত্র মামলায় তো প্রথমবারের মতো মৃতুদণ্ডের মুখোমুখিও হতে হয়েছিল। মায়ের কঠোর মানসিক অবস্থান, দেশের মানুষের প্রবল আন্দোলন ও সংগ্রামে রাসেলের বাবা ফিরে আসেন বঙ্গবন্ধু খেতাব নিয়ে।

রাসেল জন্ম নিল রাত দেড়টায়। হাসু আপুর ঘরটাতেই তার পৃথিবীতে আগমন। মেজো ফুফু ঘুম ভাঙিয়ে সব্বাইকে ডাকলেন, জলদি উঠো, তোমার ভাই হয়েছে। জন্মের পরে ওকে দেখে মনে হয়েছিল একটা পুতুল। কী সুন্দর হাসে, আবার কাঁদেও। মাথা ভরা চুল। তুলতুলে নরম গাল। বেশ বড়সড় ছিল বাবুটা। চুল একটু ভেজা মনে হতেই হাসু আপু ওড়না দিয়েই মুছতে শুরু করল। তার পরই একটা চিরুনি নিল মাথার চুল আঁচড়াতে। মেজো ফুফু নিষেধ করলেন, চামড়া খুব নরম, তাই চিরুনি দেওয়া যাবে না।

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা রেণুর কনিষ্ঠ সন্তান সে। তাঁর জন্ম ১৯৬৪ সালের ১৮ অক্টোবর। সেই হিসাবে আজ রবিবার তাঁর ৫৬তম জন্মদিন। মা নাম রেখেছিলেন তার ‘রাসেল’।

শুভ জন্মদিন শেখ রিসাল উদ্দীন রাসেল। আল্লাহ তাআলার অপার অনন্তে, মা-বাবার কোলে শান্তিতে থাকো। এই প্রার্থনা।

লেখক : অধ্যাপক ও  কমিটি অফিসার, প্রকাশনা ও সাহিত্য  অনুষ্ঠান উপকমিটি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর