,



বিইউ পেঁপে-১: দ্বিগুণ ফলন, দ্বিগুণ লাভ

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ গাজীপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভাবিত বিইউ পেঁপে-১ জাতটি কৃষকদের মাঝে ব্যাপক আগ্রহ সৃষ্টি করেছে। প্রচলিত জাতের পুরুষ গাছে পেঁপের তেমন ফলন না হলেও এ জাতের পেঁপে গাছের প্রতিটিতেই অধিক ফলন হতে দেখা গেছে। এ জাতের পেঁপে চাষ করে কৃষকরা প্রচলিত থাইল্যান্ডের জাতের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ ফলন ও লাভ পাচ্ছেন। এতে কৃষক ও বীজ বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানেরও এ জাতের প্রতি ব্যাপক চাহিদা বেড়েছে।

গাজীপুরের সীমান্ত জেলা ময়নসিংহের ভালুকা উপজেলার চাঁনপুর এলাকায় গিয়ে জানা গেছে, স্থানীয় খন্দকার রুমান হোসেন ছিলেন একজন বেকার যুবক। অর্থের অভাবে তিনি বেশি লেখাপড়াও করতে পারেননি। পরে তিনি নিজের বেকারত্ব ঘুচাতে শুরু করেন কৃষিকাজ।

কয়েক বছর আগে তিনি তার বাবার দেড় একর জমিতে আখ চাষ শুরু করেন। কিন্তু তাতে তিনি লাভের মুখ দেখতে পারেননি। পরে বীজ কিনে শুরু করেন বিইউ পেঁপে-১ জাতের পেঁপে চাষ। যে জমিতে আখ চাষ করে তিনি এক লাখ টাকা পেতেন আজ সেই জমিতে এ জাতের পেঁপে চাষ করে এক মৌসুমেই ১০-১৫ লাখ টাকা আয় করছেন। প্রতিটি গাছে ৪০-৬০ কেজি পেঁপে হয়। যার প্রতিটির ওজন ২-৩ কেজি হয়ে থাকে।

 প্রচলিত অনেক পেঁপে জাতে পুরুষ গাছে শুধু ফুল ধরে, কোন ফল হয় না। কিন্তু এ জাতের প্রতিটি গাছে প্রচুর ও বড় আকৃতির ফল ধরে। এ মৌসুমে প্রায় তিন মাস আগে সুপ্রিম সিড কোম্পানির কাছ থেকে বিইউ পেঁপে-১ জাতের বীজ সংগ্রহ করে পেঁপে চাষ শুরু করেন।

ইতোমধ্যে ঢাকার যাত্রাবাড়ি আড়ৎদারের কাছে প্রায় ৬ লাখ টাকার পেঁপে বিক্রি করেছে। এখনো গাছে যে পেঁপে রয়েছে তা ৭-৮ লাখ টাকা বিক্রিয় করা যাবে। এ জাতের পেঁপে বেশ মিষ্টি ও সহজে পঁচে না। বিচিও খুব কম। তাই ভোক্তাদের মধ্যে এর বেশ চাহিদা রয়েছে। প্রায় ৩ লাখ টাকা খরচ করে প্রায় ১৫ লাখ টাকার এ জাতের পেঁপে উৎপন্ন করা গেছে।

সুপ্রিম সীড কোম্পানি লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার আফজাল হোসেন জানান, ২০১৭ সাল থেকে এ জাতের পেঁপের বীজ বাজার জাত শুরু করি। কৃষকদের মধ্যে জাতটি ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। এ দেশে চাষ হওয়া থাইল্যান্ডের জাতের চেয়েও ফলন কোনো অংশে কম নয়। এ বীজের চারা গজানোর সক্ষমতা বেশি এবং রোগবালাইও কম। ২০২৫ সালের মধ্যে দেশে ৫০ হাজার একর জমিতে এ বীজ বপনের টার্গেট নিয়ে কাজ করছেন তারা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক অধ্যাপক ড. নাসরীন আক্তার আইভি ও প্রয়াত অধ্যাপক ড. এম এ খালেক, টানা পাঁচ বছর গবেষণা করে শতভাগ ফলবান পেঁপের এ জাতটি উদ্ভাবন করেন। ২০১৩ সালে জাতীয় বীজ বোর্ড কর্তৃক নিবন্ধিত হয় বিইউ পেঁপে-১ জাতটি।

 অধ্যাপক ড. নাসরীন আক্তার আইভি বলেন, পেঁপের এ জাতটি (স্ত্রী ও উভলিঙ্গ বিশিষ্ট) গাইনোডাইওসিয়াস ধরনের। প্রতিটি গাছেই ফল ধরবে। স্ত্রী গাছের ফল সিলিন্ড্রিক্যাল এবং গায়ে লম্বালম্বি দাগ রয়েছে, উভলিঙ্গি গাছের ফল লম্বাটে এবং ফলন হেক্টর প্রতি ৫০-৬০ টন। চারা রোপণের চারমাস থেকেই কাঁচা পেঁপে এবং ৬ মাস থেকে পাকা পেঁপে সংগ্রহ করা যায়। বীজ থেকে চারা বের হতে সময় লাগে ১০-১৫ দিন। এ জাতের পেঁপের ফলন দেশে প্রচলিত থাইল্যান্ডের জাতের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। এতে কৃষকরা দামও পাচ্ছেন প্রায় দ্বিগুণ।

স্থানীয় চাঁনপুর এলাকার নার্সারি ব্যবসায়ী মো. জাহিদুল ইসলাম জানান, বিইউ পেঁপে-১ জাতটি এলাকায় খুবই জনপ্রিয়তা পেয়েছে। গেল মৌসুমে তিনি সোয়া লাখ টাকার পেঁপের বীজ কিনে প্রায় চার লাখ টাকার চারা বিক্রি করেছেন।

কৃষকের মাঠ পরিদর্শন

শনিবার দুপুরে তা পরিদর্শনে গাজীপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. গিয়াস উদ্দিন মিয়া সরেজমিনে ময়নসিংহের ভালুকা উপজেলার চাঁনপুর এলাকায় বিইউ পেঁপে-১ জাত চাষাবাদ ও কয়েক কৃষকের মাঠ পরিদর্শন করেছেন। এ সময় তার সঙ্গে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক একেএম আমিনুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. মো. আজিজুল হক, অধ্যাপক ড. নাসরীন আক্তার আইভি, সুপ্রিম সীড কোম্পানি লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার আফজাল হোসেন ও গবেষকরা ছিলেন।

গাজীপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. গিয়াস উদ্দিন মিয়া বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়টি একটি গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান। এখানে উচ্চ শিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন শস্যজাত উদ্ভাবনেরও কাজ হচ্ছে। এখানে শিক্ষকরা ধান, লাউ, শিম, পেঁপে, চেরি টমোটোসহ প্রায় ৫০ জাতের বিভিন্ন শস্যজাত উদ্ভাবন করেছে। এসব জাত সম্প্রসারণে কয়েকটি বীজ কোম্পানি আমাদের সঙ্গে চুক্তি করেছে।

সারাদেশে তারা আমাদের শস্যজাত কৃষকের মাঝে ছড়িয়ে দিচ্ছে। আমাদের জাতের প্রতি কৃষকদেরও বেশ সাড়া পেয়েছি। আমাদের এ ধরণের জাত উদ্ভাবনের কাজ অব্যাহত থাকবে।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর