,



আমেরিকা, ইইউসহ সব বাজারেই পোশাক রপ্তানিতে ধস

বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তৈরি পোশাক রপ্তানিতেও চরম মন্দাভাব বিরাজ করছে। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রচলিত বাজারসহ অপ্রচলিত বাজারে পোশাক রপ্তানি নেতিবাচক ধারায় চলে এসেছে। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) ও বিজিএমইএ’র প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এসব তথ্য জানা গেছে। ইপিবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাস বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে আয় হয়েছে ২ হাজার ৫৬২ কোটি ৪৭ লাখ ৭০ হাজার ডলার; যা লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৬.৪৩ শতাংশ কম।
সংশ্লিষ্টরা জানান, আগে কখনো প্রবৃদ্ধির হার নেতিবাচক ধারায় যায়নি। কিন্তু এখন ঋণাত্মক ধারায় চলে এসেছে পোশাক রপ্তানি আয়। এ ছাড়া গত এক বছরে বন্ধ হয়ে যাওয়া ১২০০ কারখানা রপ্তানিতে কোনো অবদান রাখতে না পারায় ওইসব কারখানার উৎপাদন এবং রপ্তানি আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে দেশ। এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই সিদ্ধান্তে ইমেজ সংকটের পাশাপাশি তৃতীয় দেশে কার্গোর বিস্ফোরক পরীক্ষার শর্তের কারণে পোশাক রপ্তানিতে বাড়তি খরচ ও অতিরিক্ত সময় লাগবে। আর এ কারণে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছানো নিয়ে আশঙ্কা পোশাক রপ্তানিকারকদের।
বিজিএমইএ সূত্র মতে, ছোট-বড় প্রায় সব বাজারেই রপ্তানি কমেছে। এর মধ্যে প্রধান প্রধান তিন বাজার যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং কানাডায় বড় অঙ্কে রপ্তানি কমেছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে কমেছে প্রায় ৭ শতাংশ। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানির ৬.৩৪ শতাংশ বাংলাদেশ থেকে গিয়েছিল। গত বছর সেটি বেড়ে ৬.৫৭ শতাংশ হয়েছে। বাজারটিতে বাংলাদেশ তৃতীয় সর্বোচ্চ রপ্তানিকারক। ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব কমার্সের অফিস অব টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল (অটেক্সা) বিভিন্ন দেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক আমদানির হালনাগাদ পরিসংখ্যান প্রকাশ করে। সেই পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত বছর ১৮৬ কোটি বর্গমিটার কাপড়ের সমপরিমাণ পোশাক রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। পরিমাণটি ২০১৫ সালের ১৮৭ কোটি বর্গমিটারের চেয়ে ০.৪১ শতাংশ কম। যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি কমে যাওয়ায় দেশটিকে টপকে জার্মানি এখন বাংলাদেশের পোশাকের প্রধান বাজার। কানাডায় কমেছে প্রায় ৫ শতাংশ। যুক্তরাজ্যে কমেছে প্রায় ৬ শতাংশ। উদীয়মান বা নতুন বাজার শ্রেণিতে একই অবস্থা। এ শ্রেণির প্রধান বাজার জাপানে রপ্তানি কমেছে ১ শতাংশের বেশি। ভারতে ৩.৮১ শতাংশ ও মেক্সিকোতে প্রায় ১৭ শতাংশ কমেছে। অস্ট্রেলিয়ায় কমেছে ৮.১৮ শতাংশ। ব্রাজিলে কমেছে ১৯.৯১ শতাংশ। দক্ষিণ কোরিয়ায় ১১.৩২, দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৩.৬১, তুরস্কে ১০.২৭, বেলজিয়ামে ৮.২২, আয়্যারলান্ডে ২২.৭১ শতাংশ কমেছে। মোট আয়ে উদীয়মান বাজারের অবদান ১৬ শতাংশ থেকে ১৫ শতাংশে নেমে এসেছে।
ইপিবির প্রতিবেদনে বলা হয়, চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে নিটওয়্যার (গেঞ্জি) পণ্য রপ্তানিতে আয় হয়েছে ১ হাজার ২৫০ কোটি ৪ লাখ ৯৪ হাজার ডলার। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১১ মাসে আয় হয়েছিল ১ হাজার ১৯২ কোটি ২ লাখ ডলার। ১১ মাসে নিটওয়্যার পণ্যে রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল ১ হাজার ২৭৭ কোটি ২৪ লাখ ডলার। আলোচ্য সময়ের মধ্যে এই খাতে আয় হয়েছে ১ হাজার ২৫০ কোটি ৪৯ লাখ ৪০ হাজার ডলার; যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ২.০৯ শতাংশ কম। তবে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আলোচ্য খাতের রপ্তানি আয় ৪.৯১ শতাংশ বেড়েছে।
এদিকে চলতি বছরের ১১ মাসে ওভেন (শার্ট-প্যান্ট) পণ্য রপ্তানিতে আয় হয়েছে ১ হাজার ৩১১ কোটি ৯৮ লাখ ৩০ হাজার ডলার। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আলোচ্য খাতে রপ্তানি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৬২১ কোটি ডলার। চলতি অর্থবছরের জুলাই-মে মেয়াদে ওভেন গার্মেন্ট পণ্য রপ্তানিতে বৈদেশিক মুদ্রা আয় হয়েছে ১ হাজার ৩১১ কোটি ৯৮ লাখ ৩০ হাজার ডলার; যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ১০.২১ শতাংশ কম। একই সঙ্গে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় আলোচ্য খাতের রপ্তানি আয় ০.৩৩ শতাংশ কমেছে।
বিজিএমইএ সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, রপ্তানিতে মন্দাভাব দীর্ঘমেয়াদি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অবস্থার পরিবর্তন না হলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে সংস্কার করা কারখানাও একপর্যায়ে বন্ধ হয়ে যাবে। এর ফলে জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
বিজিএমইএ সূত্র মতে, রপ্তানি আদেশ পাওয়ার পর পোশাক উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির অনুমতি নিতে হয়। ইউটিলাইজেশন ডিক্লারেশনের (ইউডি) নামে এ অনুমতি দেয় বিজিএমইএ। বিজিএমই জানায়, ইউডি নেয়ার হার কমছে। গত বছরের জানুয়ারিতে ইউডির সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৫৯৫টি। এ বছরের জানুয়ারিতে তা কমে হয় ২ হাজার ৫৭৭টি। পরের মাস ফেব্রুয়ারিতেও কমেছে। এখনও এ ধারা অব্যাহত আছে। ফলে রপ্তানি আদেশ কমে যাওয়ার প্রভাব থাকবে আগামী কয়েক মাসের রপ্তানি আয়ে।
বিজিএমইএ’র সাবেক সভাপতি ও ইএবি সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিকূলতার কারণে আমাদের রপ্তানি আয় কমেছে। বড় বাজার যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে এখনও মন্দাভাব বিদ্যমান। সে কারণে পোশাকের চাহিদা ও দর কমছে। ডলারের বিপরীতে ইউরোর দর পতন এবং ব্রেক্সিটের মতো বড় কারণ তো আছেই।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর