বেড়েছে ছিনতাই চাঁদাবাজি অজ্ঞান পার্টির তত্পরতা

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ  ঈদকে সামনে রেখে মৌসুমি অপরাধীদের দৌরাত্ম্য বেড়েছে। পাশাপাশি চাঁদাবাজদের দখলে রয়েছে শহরের রাস্তাঘাট ও ফুটপাত। পেশাদার অপরাধীদের পাশাপাশি ছিনতাই, চুরি, ডাকাতি, জাল নোট চক্র ও অজ্ঞান পার্টিসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে তত্পর মৌসুমি অপরাধীরাও। চুরি ও ডাকাতির জন্য মাসিক-দৈনিক মজুরিতে কিশোর-যুবকদেরও ভাড়া করছে বিভিন্ন অপরাধী চক্রের হোতারা। শুধু রাজধানীজুড়েই ২০টি গ্রুপে দুই শতাধিক পেশাদার ও মৌসুমি অপরাধী কাজ করছে। অপরাধ ঘটিয়ে তারা সহজেই ঢাকার বাইরে পালিয়ে যাচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ছিনতাইকারী ও অজ্ঞান পার্টির চক্রের ২০ সদস্যকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত বুধবার রাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে এদের গ্রেফতার করা হয়। গত বুধবার সকালে উত্তরার ক্রিসেন্ট হাসপাতালের সামনে ছিনতাইয়ের প্রস্তুতির সময় পুলিশের গুলিতে দুই ছিনতাইকারী আহত হয়। দুজনই পুলিশের হেফাজতে রয়েছে। একই দিন রাত ১০টার দিকে খিলক্ষেত এলাকায় সোহেল রানা নামে এক যুবক বাইসাইকেলে করে উত্তরা যাচ্ছিলেন। পথে খিলক্ষেত থানা ও আন্তর্জাতিক মানের হোটেল লা মেরিডিয়ানের কাছাকাছি যেতেই সশস্ত্র অবস্থায় সোহেল রানাকে ৪-৫ জন ঘিরে ধরে তার সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোন ও তিন হাজার টাকাসহ মানিব্যাগ নিয়ে চলে যায়। পর দিন তিনি থানায় জিডি করতে গেলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা ছিনতাইয়ের কথা উল্লেখ না করে হারানোর জিডি করার পরামর্শ দেন। পরে সোহেল রানা মোবাইল সিম তোলার জন্য বাধ্য হয়ে ‘হারিয়েছে’ জিডি করেন বলে অভিযোগ করেন। প্রায় একই সময়ে জাতীয় শহীদ মিনারের সামনে থেকে একটি পত্রিকার অপরাধ বিষয়ক রিপোর্টার ফজলুল বারীর কাছ থেকে মোবাইল ও টাকা ছিনিয়ে নেয় ছিনতাইকারীরা। এছাড়াও গত শনিবার রাজধানীর উপকণ্ঠ নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গুলি করে এক ব্যবসায়ীর ৫৩ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। একই দিন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ এক সংবাদ সম্মেলনে জানায়, গত শনিবার রাতে অজ্ঞান পার্টির ১৫ সদস্যের একটি চক্রকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গত রোববার টঙ্গীর কলেজগেটে প্রকাশ্যে গুলি করে মাইক্রোবাস থামিয়ে বিকাশের টাকা ছিনতাইকালে ছিনতাইকারী আমিনুল ইসলাম ইয়াছিন (২৩) নামে এক কলেজ ছাত্রকে হাতেনাতে আটক করে ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভাষ্য, ঈদ সামনে এলে অপরাধীদের দৌরাত্ম্যও বেড়ে যায়। তবে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে বলে দাবি করেন পুলিশ ও র্যাবের কয়েক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা। গত ১ জুন যাত্রাবাড়ীতে কুমিল্লার মুরাদনগর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডের ডেপুটি কমান্ডার জাহাঙ্গীর আলম (৬৯) ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে নিহত হন। সম্প্রতি মুক্তিযোদ্ধা হত্যায় জড়িত পাঁচ ছিনতাইকারী পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছে। গত কয়েক দিনের ঘটনায় ছিনতাইকারী ও অজ্ঞান পার্টির সদস্যদের হামলায় বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হয়েছে। ছিনতাইয়ের পাশাপাশি ঈদকে সামনে রেখে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে চাঁদাবাজি। পেশাদার অপরাধী থেকে মৌসুমি অপরাধী ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী থেকে শুরু করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কোনো কোনো কর্মকর্তাও চাঁদাবাজিতে জড়িয়ে পড়েছে। ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুলিশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কাজ করছে না। প্রতিদিনই রাজধানীর অলিগলিতে ছিনতাই-চাঁদাবাজি হয়। ছিনতাইকারীদের হাতে আহত ব্যক্তিরা চিকিত্সার জন্য হাসপাতালে গেলে ঘটনা প্রকাশ পায়। কিন্তু আহত করে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে কম। অস্ত্র ঠেকিয়েই বেশি ছিনতাই হয়। কখনও কখনও পরিচিত ব্যক্তির ভান করে পথে বাহন থামিয়ে দিয়ে ছিনতাই করা হয়। ছিনতাইয়ের শিকার বেশিরভাগ মানুষই হয়রানি ও ঝামেলার আশঙ্কায় মামলা করে না। ফলে ছিনতাইয়ের মামলা হয় কম। মামলা হলেও ছিনতাইকৃত টাকা উদ্ধার করতে পারে না পুলিশ। আবার কেউ কেউ মামলা করতে গেলেও থানা তা নেয় জিডি হিসেবে। ফলে ছিনতাইয়ের প্রকৃত হিসাব পুলিশের কাছেও থাকে না। হাসপাতাল ও ভুক্তভোগীদের দেওয়া তথ্যমতে, গত এক সপ্তাহে গুলি, ছুরিকাঘাত ও অস্ত্র ঠেকিয়ে অন্তত ১০-১২ জনের কাছ থেকে ছিনতাই এবং অজ্ঞান করে টাকা ও মালামাল হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি পল্টনের দৈনিক সংবাদ অফিসের পাশ থেকে লোকজনের সামনে প্রকাশ্যে পাঁচ রাউন্ড গুলি করে কয়েক লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় সন্ত্রাসীরা। ছিনতাইয়ের শিকার ব্যক্তির কোমর ও মোজাসহ বিভিন্ন স্থানে লুকিয়ে রাখা টাকা প্রায় পাঁচ মিনিট ধরে তল্লাশি চালিয়ে ছিনতাইকারীরা সব অর্থ লুটে নেয়। তিনটি মোটরসাইকেলে আসা ছয় ছিনতাইকারীকে পথচারীরা ধাওয়া করলেও ধরতে পারেনি। পাশের বিল্ডিংয়ের সিসি ক্যামেরায় ছিনতাইয়ের ঘটনা ধরা পড়লেও পুলিশ ছিনতাইকারীদের ধরতে পারেনি। আর গত ১ জুন সদরঘাট এলাকায় অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়ে এক লাখ টাকা হারান কাপড় ব্যবসায়ী আরিফ হোসেন। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, রাজধানীতে ছিনতাইকারী চক্রের নেতৃত্বদানকারী বেশ কয়েকজন বড় ভাই বা সর্দার জড়িত। এদের মধ্যে মিরপুর, শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া ও উত্তরায় রয়েছে খলিফা গ্রুপ। মতিঝিল ও ওয়ারী এলাকায় মকবুল গ্রুপ, পুরান ঢাকা ও পোস্তগোলায় ঠাণ্ডু গ্রুপ এবং সায়েদাবাদে রয়েছে বাবুল গ্রুপ। এছাড়াও ডলার লিটন ও কাইয়ুম গ্রুপের নামও রয়েছে গোয়েন্দা তালিকায়। এসব অপরাধীকে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে সরকারি দলের কতিপয় প্রভাবশালী ব্যক্তি ও কিছু ছাত্রনেতা। সায়েদাবাদ-গাবতলী রুটে চলাচলকারী বাসে একটি ছিনতাইকারী গ্রুপ সক্রিয় আছে। এই চক্রের সদস্য সংখ্যা ১৫-২০ জন। এরা সবাই বাসের ড্রাইভার ও হেল্পার। এদের নেতৃত্বে রয়েছে যাত্রাবাড়ী থানা এলাকার যুবলীগের এক নেতা। ওই নেতাকে আটক করার পরও ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় পুলিশ। সূত্র আরও জানায়, ছিনতাইকৃত অর্থ কমিশন হিসেবে ভাগ হচ্ছে বিভিন্ন স্তরে। এর মধ্যে কথিত বড় ভাই ৫০, কামলা ৩০ ও লোকাল সর্দার ২০ শতাংশ পেয়ে থাকে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার (মিডিয়া) মাসুদুর রহমান বলেন, রমজানের আগে থেকেই রাজধানীতে প্রস্তুত ছিল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ জন্য অপরাধের সংখ্যা খুবই কম। তিনি বলেন, সাধারণত রমজানে অজ্ঞান পার্টি, ছিনতাই ও জাল টাকা চক্রের আনাগোনা বেড়ে যায়। তাই জনসাধারণের নিরাপত্তায় সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। ডিবি পুলিশের টিম কয়েক স্তরে ভাগ হয়ে দায়িত্ব পালন করছে। শপিংমল ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিরাপত্তার পাশাপাশি অলিগলিতেও নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে। বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনে সহায়তার জন্য প্রস্তুত রয়েছে পুলিশের মানি স্কট। ডিএমপি সূত্র জানায়, ২০০৭ সালে ছিনতাইয়ের ৪৪৪টি স্থান চিহ্নিত করে ছিনতাই প্রতিরোধ নির্দেশিকা প্রকাশ করে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। পরে যদিও ছিনতাইয়ের স্পটগুলোর তালিকা হালনাগাদ করা হয়। এগুলো হালনাগাদের কাজ চলছে বলে পুলিশ সূত্র জানায়।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর