,



নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন ইস্যুতে বিকল্প ভাবছে সরকার

বহুল আলোচিত নতুন মূল্য সংযোজন কর (মূসক) বা ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন ইস্যুতে দেশজুড়ে নানা আলোচনা-সমালোচনায় অস্বস্তিতে রয়েছে সরকার। আইনটি বাস্তবায়ন হলে পণ্যমূল্য বাড়বে বলে আলোচনা হচ্ছে সংসদেও। এই পরিস্থিতিতে শেষ দিকে এসে বিকল্প ভাবছে সরকার। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নিত্যপ্রয়োজনীয় ও স্বল্প আয়ের ভোক্তার ব্যবহার উপযোগী পণ্য এবং সেবায় আরও ভ্যাট ছাড় দিয়ে আইনটি বাস্তবায়নের উপায় খোঁজা হচ্ছে। এ জন্য ভ্যাট অব্যাহতির সীমা আরও বাড়ানো হতে পারে। তাছাড়া বিদ্যমান ১৯৯১ সালের ভ্যাট আইনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নতুন আইনে সংযুক্ত করা হতে পারে। অথবা কিছু সময়ের জন্য আইনটির বাস্তবায়ন পিছিয়েও দেওয়া হতে পারে। সেক্ষেত্রে আগামী অর্থবছর চলমান ১৯৯১ সালের ভ্যাট আইনই বলবত্ থাকতে পারে। তবে এ আইনের মধ্য থেকেই বাড়ানো হবে ভ্যাটের আওতা ও পরিধি। জোর দেওয়া হবে অটোমেশন পদ্ধতির ওপর। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে। সূত্র জানায়, এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গেলে এ খাত থেকে রাজস্ব আয়ে কী প্রভাব পড়তে পারে, তারও পর্যালোচনা চলছে সরকারের ভেতরে। শেষ দিকে এসে পুনরায় সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে অর্থমন্ত্রী ও এনবিআর চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বৈঠকও হয়েছে। বাজেট পাসের আগে প্রধানমন্ত্রীর সমাপনী বক্তব্যে এ বিষয়ে ঘোষণা দিতে পারেন তিনি। গতকাল সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রীও বলেছেন, ২৮ জুন এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে। অন্যদিকে আইনটি নিয়ে ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদদের পাশাপাশি খোদ সরকারি দলের সাংসদরাও নতুন করে সমালোচনায় সরব হয়েছেন। বিশেষত আগামী নির্বাচনের আগে আইনটি কার্যকর হলে মূল্যস্ফীতির কারণে জনমনে ক্ষোভের আশঙ্কা করা হচ্ছে বিভিন্ন মহলে। আইনটি বাস্তবায়নের ঠিক আগে এমন সরব আলোচনায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে এনবিআরের কর্মকর্তাদের মধ্যেও। এনবিআরের বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশই সব পণ্য ও সেবায় ঢালাও ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাটের পক্ষে নন। তারা বলছেন, আইনটির প্রয়োজন আছে। কিন্তু এ জন্য ছাড় দেওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে। অন্যথায় আইনটির সুফল ঘরে তোলা যাবে না। বিশেষত রেয়াত নেওয়া সব ব্যবসায়ীর পক্ষে সম্ভব হবে না বলেই মনে করছেন অনেকে। সঠিক হিসাব তথা চালান দেখাতে না পারলে রেয়াত পাওয়া যাবে না। ফলে বাড়তি ভ্যাটের ভার যাবে ভোক্তার ঘাড়েই। ২০১২ সালে আইনটি পাস হওয়ার পর থেকেই এর বিরোধিতা করে আসছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের পক্ষ থেকেও আইনটি বাস্তবায়ন শুরু হলে পণ্যমূল্য বাড়ার আশঙ্কার কথা আবার জানানো হয়েছে এনবিআরকে। বাজেট প্রস্তাবের পর সম্প্রতি এনবিআর চেয়ারম্যানকে পাঠানো এক চিঠিতে ব্যবসায়ীদের এ শীর্ষ সংগঠনের পক্ষ থেকে বেশকিছু পণ্য ও সেবার নাম উল্লেখ করা হয়, যেগুলোর দাম বাড়তে পারে। এসব পণ্য ও সেবায় এত দিন ধরে সঙ্কুচিত ভিত্তিমূল্যে ও ট্যারিফ মূল্যের ভিত্তিতে হ্রাসকৃত হারে ভ্যাট দিয়ে আসছিলেন উদ্যোক্তারা। নতুন চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, প্লাস্টিক খাত, রি- সাইক্লিং খাত, প্লাস্টিক ও রাবারের হাওয়াই চপ্পল, প্লাস্টিকের খেলনা, রিয়েল এস্টেট ও নির্মাণ খাত, বিলেট, এমএস রড, জুয়েলারি, বিভিন্ন ধরনের সেবা খাত, হাতে তৈরি পাউরুটি, বিস্কুট, পণ্য পরিবহন ও আউটসোর্সিং, অ্যালুমিনিয়াম, টেক্সটাইল প্রিন্টিং ও ফিনিশিং, জুট মিল ও টেক্সটাইল মিলের স্পেয়ার পার্টস ও সরিষার তেল ছাড়াও বিদ্যুতের দাম বাড়বে বলে। প্রসঙ্গত, নতুন আইনে অব্যাহতি প্রাপ্ত ছাড়া প্রায় সব পণ্য ও সেবার ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট আরোপ করা হয়েছে। সঙ্কুচিত ভিত্তিমূল্যে দেড় থেকে সাড়ে সাত শতাংশের মধ্যে অর্থাত্ হ্রাসকৃত হারে ভ্যাট দেওয়ার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়েছে। বাতিল হয়েছে ট্যারিফ মূল্যের ভিত্তিতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ভ্যাটের ব্যবস্থাও। অপেক্ষাকৃত ছোট ব্যবসায়ীদের প্যাকেজ পদ্ধতির ভ্যাট (বার্ষিক একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ ভ্যাট) ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এই নিয়ে ব্যবসায়ীদের তীব্র আপত্তি রয়েছে। সূত্র জানায়, প্রস্তাবিত নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন পিছিয়ে দেওয়া হলেও ভ্যাটের আওতা ও পরিধি বাড়ানো হবে। এছাড়া আমদানি শুল্কেও পরিবর্তন আনা হতে পারে। প্রস্তাবিত বাজেটে শুধু ভ্যাট খাতেই রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৯১ হাজার ২৫৪ কোটি টাকা, যা চলতি বছর ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রার (৭২ হাজার ৭৬৪ কোটি) তুলনায় ২৫ দশমিক ৪২ শতাংশ বেশি। এছাড়া আয়কর খাতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৫ হাজার ১৭৬ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের (৭১ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা) তুলনায় ১৮ দশমিক ৪০ শতাংশ বেশি। আমদানি শুল্ক খাতে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ হাজার ২৩ কোটি টাকা, যা চলতি বছরের (২২ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা) তুলনায় ৩৩ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি। নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন না হলে প্রস্তাবিত বাজেটের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর