,



বিরোধী জোটে নয়া মেরুকরণ

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ সরকারবিরোধী জোট-ফ্রন্টগুলোতে নতুন মেরুকরণ ঘটছে। মূল্যায়ন, যোগাযোগ, বৈঠক না ডাকা ও কর্মসূচি গ্রহণ করা না করা নিয়ে পারস্পরিক দোষারোপ আর মতপার্থক্যের কারণে জোটগুলোতে চলছে অন্যরকম ভাঙা-গড়ার খেলা। জোটের ব্যানার বদল করে গড়ে উঠছে আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক নতুন উপজোট। কখনো অভিন্ন, কখনো ভিন্ন ইস্যুতে পালন করা হচ্ছে নানা কর্মসূচিও। তবে মঞ্চ বা ব্যানারে পরিবর্তন এলেও সবারই অবস্থান সরকারবিরোধী। আবার কমবেশি সবাই নতুন করে বৃহত্তর ঐক্য গড়ার কথাও বলছেন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে রাজনীতিতে চমক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয়। নানা বিবাদের পর অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিকল্পধারাকে বাদ দিয়ে বিএনপিকে সঙ্গে নিয়ে ২০১৮ সালের ১৩ অক্টোবর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ঘোষণা দেন ড. কামাল হোসেন। বিএনপি ও গণফোরাম ছাড়াও ঐক্যফ্রন্টের শরিক আ স ম আবদুর রবের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি, মাহমুদুর রহমান মান্নার নাগরিক ঐক্য ও ড. নুরুল আমিন ব্যাপারীর বিকল্পধারার একাংশসহ কয়েকটি দল। বঙ্গবীর আবদুল কাদের সিদ্দিকীর কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ নানা নাটকীয়তা শেষে ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিলেও ভোটের পর ফ্রন্ট ছেড়ে যায়। আর গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে।

ঐক্যফ্রন্টের আত্মপ্রকাশের দিনে ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনও উপস্থিত ছিলেন। মোশাররফ হোসেন গতকাল শুক্রবার ইত্তেফাককে বলেন, ‘আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট এখনো বিলুপ্ত হয়নি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দল আছে। তবে ঐক্যফ্রন্ট অকার্যকর, এর কোনো কার্যকারিতা নেই। আর ড. কামাল হেসেনের দলের (গণফোরাম) ভেতরেই সমস্যা চলছে।’ ড. মোশাররফ আরো বলেন, ‘আমাদের দলের (বিএনপির) মহাসচিব (মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর) রাজশাহীর সমাবেশেও বলেছেন, বিএনপি বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। আমার জানামতে, বিভিন্ন দলের সঙ্গে কথাবার্তাও চলছে।’

ঐক্যফ্রন্টের বিষয়ে এর আহ্বায়ক ড. কামাল হোসেন সম্প্রতি ইত্তেফাককে বলেছেন, ‘আমরা সব সময়ই বলেছি বৃহত্তর এই ঐক্য রক্ষা করব। গণতন্ত্র ও সংবিধানকে সমুন্নত রাখতে আমাদের সেই বক্তব্য এখনো অটুট রয়েছে। এক্ষেত্রে আমাদের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন ঘটেনি।’

এদিকে ড. কামাল হোসেনের গণফোরাম কার্যত দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। ড. কামালের আপত্তি উপেক্ষা করে গত ২৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাবে অনুষ্ঠিত বর্ধিতসভার আয়োজনে নেতৃত্ব দেন গণফোরামের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসীন মন্টু এবং সাবেক দুই নির্বাহী সভাপতি অধ্যাপক আবু সাইয়িদ ও অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী। বর্ধিত সভায় আগামী ২৮ ও ২৯ মে ঢাকায় দুই দিনব্যাপী কাউন্সিল অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ঐ সভায় আগামী কাউন্সিল পর্যন্ত সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ২১ সদস্যবিশিষ্ট স্টিয়ারিং কমিটি ঘোষণা করা হয়। আবু সাইয়িদকে আহ্বায়ক এবং ১৫ জনকে যুগ্ম-আহ্বায়ক করে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটি এবং মন্টুকে আহবায়ক ও সুব্রত চৌধুরীকে সদস্যসচিব করে ২০১ সদস্যবিশিষ্ট কাউন্সিল প্রস্তুতি কমিটিও গঠন করা হয় ঐ সভায়।

কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি ঘোষণা করায় প্রশ্ন উঠেছে—তাহলে একাংশ কি ড. কামালকে বাদ দিয়েই নতুন নেতৃত্ব ঘোষণা করলেন? সুব্রত চৌধুরীর কাছে এই প্রশ্ন রাখা হলে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘কামাল হোসেন এখনো দলের সভাপতি আছেন। আমাদের কাউন্সিলে যদি উনি আবারও সভাপতি থাকতে চান, তাহলে কাউন্সিলররা সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।’ দলে চলমান সংকট নিয়ে আলোচনার জন্য আজ শনিবার মতিঝিলে নিজ চেম্বারে গণফোরামের নেতাদের নিয়ে বৈঠক ডেকেছেন ড. কামাল। ঐক্যফ্রন্টের বিষয়ে সুব্রত চৌধুরী জানান, তারা ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে ছিলেন এবং থাকবেন।

সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত না থাকলেও ঐক্যফ্রন্ট গঠনে যে কজন সক্রিয় ভূমিকা রাখেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী। ঐক্যফ্রন্ট প্রশ্নে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ফ্রন্টের বর্তমানে কোনো কার্যক্রম নেই। ঐক্যফ্রন্ট গঠনের আরেক উদ্যোক্তা এবং নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ইত্তেফাককে বলেন, ঐক্যফ্রন্ট আছে—এটা বলার মতো অবস্থায় নেই। আবার ঐক্যফ্রন্ট নেই—এটাও বলতে পারছি না।

মাসের পর মাস ঐক্যফ্রন্টের নিষ্ক্রিয়তার কারণে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও মাহমুদুর রহমান মান্না নতুন করে পথচলছেন গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি ও ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুরকে নিয়ে। কারাগারে লেখক মুশতাক আহমেদের মৃত্যুতে এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিলের দাবিতে সম্প্রতি একসঙ্গে কর্মসূচি পালন ও একমঞ্চে বক্তব্য রেখেছেন জাফরুল্লাহ-মান্না-সাকি-নুর। ‘গণমানুষের রাজনীতি এগিয়ে নিয়ে জনগণের নিজস্ব রাজনীতি প্রতিষ্ঠা’র লক্ষ্যে ২৬ ফেব্রুয়ারি একত্রে পথচলার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয় চারটি সংগঠন—গণসংহতি আন্দোলন, ছাত্র-যুবক-শ্রমিক অধিকার পরিষদ, ভাসানী অনুসারী পরিষদ ও রাষ্ট্রচিন্তা। এ প্রসঙ্গে জোনায়েদ সাকি ইত্তেফাককে বলেন, আপাতত জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করাই আমাদের লক্ষ্য। আর ছাত্র যুবক ও শ্রমিক অধিকার পরিষদের সমন্বয়ক এবং ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নুর বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার কথা বলছেন।

অন্যদিকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দল ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমান্তরালে ২০১৯ সালের ২৭ জুন ‘জাতীয় মুক্তি মঞ্চ’ নামে পৃথক মঞ্চের ঘোষণা দেন ২০ দল শরিক এলডিপি সভাপতি অলি আহমদ। এর পর থেকেই ২০ দলের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন প্রায় তিনি। অলি আহমদের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধেছেন ২০ দল শরিক বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম। ২০ দলের অন্যতম শরিক জামায়াতেরও সখ্য রয়েছে অলি আহমদের জাতীয় মুক্তি মঞ্চের সঙ্গে।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর