,



গরু ও কিস্তির টাকা গেলো আগুনে, স্বপ্নও পুড়েছে তাহেরা বেগমের

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ পুড়ে কালো হয়ে যাওয়া মাটির ওপর থেকে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখছেন যদি প্রিয় জিনিসটি খুঁজে পাওয়া যায়। কেউ এক পাশে দাঁড়িয়ে চাপা কান্না করছে আবার কেউ কেউ হারানোর যন্ত্রণায় এদিক সেদিক ছুটাছুটি করছেন। আজ শুক্রবার (১২ মার্চ) সকালে এমন মর্মাহত দৃশ্য চোখে পড়েছে রাজধানীর কাঁঠাল বাগানের গরু বস্তিতে।

গতকাল বৃহস্পতিবার (১১ মার্চ) রাত ৯টায় রাজধানীর কাঁঠাল বাগানের গরুপট্টির বস্তিতে আগুন লাগে বস্তির টিনশেড ঘরগুলোর প্রায় সবই ভস্মীভূত। পুরো বস্তির চারপাশ থেকে বাতাসে পোড়া গন্ধ নাকে আশেপাশের চারদিকে ছড়িয়ে যাচ্ছে।

নিচে ভাঙারির দোকান আর ঠিক দোকানের উপরে বসত ঘর স্বামী সন্তান নিয়ে ভালো চলছিলো তাহেরা বেগমের সংসার। গতকাল রাতের আগুনে সাজানো সংসার পুড়ে ছাই হয়ে যায়। সব কিছু হারিয়ে চতুর্থ শ্রেনীতে পড়ুয়া মেয়ে মানছুয়ার আক্তারসহ পরিবারের বাকি সদস্যদের নিয়ে রাত থেকে বসে আছে বস্তির পাশে রাস্তার ধারে। আগুনের বিভীষিকাময় দৃশ্য নিয়ে জানতে চাইলে ইত্তেফাক অনলাইনকে তিনি বলেন, রাত ৯টায় আমার ভাতিজা এসে দেখে ঘরে আমাদের পাশেই একটি ধোঁয়া উঠছে, ধোঁয়া কোথায় উঠছে তা নিয়ে শুরু হয় হাঙামা। তখন দেখলাম তালাবদ্ধ ঘরে আগুন ধোঁয়া উঠছে। তারপর সেখান থেকেই শুরু হয় আগুণের লীলাশিখা। পরে ভেড়া ভেঙে ঢুকলেও সবদিকে সেকেন্ডে এর মধ্যে আশেপাশের চারদিকে আগুণ ছড়িয়ে পড়ে।

তিনি কান্নাকাটি করে বলেন, আমার কোনো কিছু আর থাকলো না সব আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আমার দুইটা গরু প্রায় দেড় লাখ টাকা দামের, পুড়ে মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ঘরের ভিতরে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা ক্যাশ পুড়েছে। এক ভরি স্বর্ণ গেছে। দোকান বসত ঘর আর কিছুই রইলো না আমার। প্রায় ৪০ বছর ধরে এখানে বসবাস করে আসলেও এমন বীভিশকাময় দৃশ্য আর কখনো দেখিনি। আমার সাড়ে ৪ লাখ টাকা শেষ। কিস্তির ১ লাখ ২০ হাজার টাকা এনে ঘরে রেখেছিলাম সেটা শেষ। আমি এখন কিস্তি পরিশোধ করব কীভাবে?

বস্তির বাসিন্দা বৃদ্ধা জহিরুল ইসলামের (৬০) একই অবস্থা। পরিবারসহ সম্পত্তি হারিয়ে পথে বসে আছেন ছোট নাতিসহ অন্যান্যেদের সঙ্গে। দুইদিন আগেই মহাখালী ক্যান্সার হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে বাসায় ফিরছে। আবারও হাসপাতালে যাওয়ার কথা ছিলো। সবকিছুর সঙ্গে তার চিকিৎসার সমস্ত কাগজপত্র পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।

তিনি দৈনিক ইত্তেফাক অনলানকে বলেন, আগুনে আমার সব কিছু নিয়ে গেছে কোনোরকম জানটা নিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে আসছিলাম। আমি অসুস্থ মানুষ আমি এখন কোথায় যাবো, কোথায় থাকবো।

গরুপট্টির বাসিন্দা দিনে ইসলাম বলেন, আমার বসত ঘর সবকিছু পুড়ে গেলেও অনেকের সহযোগিতায় আমার খামারের গরুগুলোকে বাঁচিয়ে বের করতে পেরেছি। এছাড়া আমার আর কিছু অবশিষ্ট নেই।

সবকিছু আগুণে পুড়ে কালো ছাই হয়ে যাওয়ায় কালো ছাই এর মধ্যে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে দেখছেন আকলিমা আক্তার প্রিয় জিনিসটি খুঁজে পাওয়ার আশায়। তিনি বলেন, আমাদের কয়টি স্বর্ণের গয়না এখানে পুড়ে মিশে গেছে যদি কোন একটা পাওয়া যায় এ আশায় খুঁজছি।

জুরিনা বেগম (৫০), তিন ছেলে দুই মেয়ে নিয়ে সংসার। রাতের আগুন লাগার দৃশ্য এখনো চোখে মুখে লেগে আছে তার। তিনি বলেন, আমার মেয়ে তার শ্বশুর বাড়ি থেকে আসছিলো। স্বামীকে নিয়ে আমার মেয়ে একটা দিনও থাকতে পারলো না। জামাইসহ এক কাপড়ে সবাইকে বের হয়ে আসতে হয়েছে। আমাদের শরীরের কাপড়টা ছাড়া সব কিছু পুড়ে গেছে।

বৃহস্পতিবার রাজধানীর কাঠাল বাগানের গরুপট্টি বস্তিতে রাত ৯টার দিকে আগুন লাগার পর প্রায় ৪০ মিনিটের চেষ্টায় ফায়ার সার্ভিসের পাঁচটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও কী কারণে এই আগুনের সূত্রপাত ঘটেছে, তা নিশ্চিত করে জানাতে পারেননি কর্মকর্তারা। তদন্ত সাপেক্ষে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ও আগুন লাগার কারণ জানা যাবে বলে জানিয়েছেন তারা।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর