,



গ্রামে মানুষেরা চিকুনগুনিয়া জ্বরে আতঙ্ক

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ  চিকুনগুনিয়া নিয়ে আতঙ্ক এখন গ্রামেও। গ্রামের মানুষও এ জ্বরে আক্রান্ত হচ্ছেন। আতঙ্কিত লোকজন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণ কক্ষে ফোন করে পরামর্শ নিচ্ছেন। গতকাল সকাল থেকে নয় ঘণ্টায় অন্তত ৫০০ জন ফোন করে পরামর্শ নিয়েছেন। গতকাল পর্যন্ত সরকারি হিসাবে দেশে দুই হাজার ১০০ জন মানুষ চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার কথা বলা হলেও বাস্তবে এই সংখ্যা অনেক বেশি বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর অবশ্য বলছে চিকুনগুনিয়ার প্রভাব থাকতে পারে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। চিকুনগুনিয়া জ্বর হঠাৎ করে প্রথমে রাজধানীর ঘরে ঘরে এবং এখন দেশজুড়ে জেঁকে বসায় চিকুনগুনিয়া সামাল দেয়া নিয়ে বেকায়দায় পড়েছে সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগ। স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে হাসপাতালে ভর্তিকে নিরুৎসাহ করা হলেও অনেকে ঘরোয়া চিকিৎসায় ভরসা পাচ্ছে না। তাই প্রতিদিনই হাসপাতালে বাড়ছে জ্বরে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চিকুনগুনিয়া জ্বর এখন গ্রামেও ছড়িয়ে পড়েছে। ভৈরব, লক্ষ্মীপুর গ্রাম থেকে এক গৃহিণী জানান, তাদের বাসায় গত এক সপ্তাহে পরপর চারজনের জ্বর হয়েছে। এই জ্বরের মাত্রা ১০৪ ডিগ্রি পর্যন্ত উঠেছে। জ্বরের সঙ্গে বমি হয়েছে কয়েকজনের। মাথাব্যথা, গিঁটে গিঁটে ব্যথাও অনুভব করেছেন তারা। নরসিংদী থেকে রুমি নামের আরেক রোগী জানিয়েছেন, তাদের বাসাও ধারাবাহিকভাবে তিনজনের জ্বর হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ বলেন, চিকিৎসাসেবা প্রদানের পাশাপাশি এ ভাইরাস সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীরা কাজ করছেন। মনে হচ্ছে, লোকজন কিছুটা সচেতনও হয়েছে। তাই গত কয়েক দিন ধরে হাসপাতালগুলোতে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত রোগী কমেছে। তবে যতদিন বৃষ্টি আছে, ততদিন এর প্রভাব থাকবে। সে হিসেবে চিকুনগুনিয়ার প্রকোপ থাকতে পারে আগামী সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। তিনি বলেন, চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হলেও ভয়ের কিছু নেই। জ্বর কমে গেলেও অনেক দিন ধরে ব্যথা থাকতে পারে। এটা সবার জানা থাকা জরুরি। কিন্তু চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার সন্দেহ হলেও ‘চিকুনগুনিয়া’ শনাক্তকরণে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে হাসপাতাল বা ডায়াগনস্টিক সেন্টারে দৌড়ঝাঁপের কোনো দরকার নেই। চিকিৎসকরা জানান, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে রাজধানীতে ভাইরাসটির ব্যাপক প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এর পর থেকে নগরজুড়ে ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে এপ্রিল, মে ও জুন মাসে চিকুনগুনিয়া ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ে। তিন থেকে সাত দিনের মধ্যে জ্বর সেরে গেলেও শরীরে ব্যথা থাকছে দীর্ঘ সময়।
দেশের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) তথ্যমতে, ভাইরাসজনিত জ্বর চিকুনগুনিয়ায় গিঁটে গিঁটে প্রচণ্ড ব্যথা, মাথাব্যথা, বমিবমি ভাব, চামড়ায় লালচে দানা, মাংসপেশিতে ব্যথা হয়। এডিস মশার কামড়ে ছড়ায় এটি। সাধারণত দিনের বেলা এই মশা কামড়ায়। তিন থেকে সাত দিনের মধ্যে জ্বর ভালো হলেও ব্যথা থাকে দীর্ঘ সময়। এ রোগ-প্রতিরোধে কোনো ভ্যাকসিন নেই।
এ প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদের ডিন অধ্যাপক ডা. এবিএম আব্দুল্লাহ বলেন, চিকুনগুনিয়া ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। চিকুনগুনিয়া আর ডেঙ্গুর উপসর্গ অনেকটা একই রকম। এডিস মশা ডেঙ্গু আর চিকুনগুনিয়ার বাহক। তবে এ দুই ভাইরাসে রয়েছে অনেক পার্থক্য। ডেঙ্গুতে আক্রান্তদের সাধারণত দীর্ঘ সময় শরীর ব্যথা বা অন্য কোনো সমস্যা থাকে না। জ্বর ভালো হয়ে গেলে কয়েক দিন দুর্বলতা বা ক্লান্তি থাকতে পারে। কিন্তু চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্তদের জ্বর সেরে গেলেও ব্যথা থাকতে পারে দীর্ঘ সময়। আক্রান্তদের অনেকেই দীর্ঘদিনের জন্য স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলতে পারেন। তিনি বলেন, অন্য ভাইরাস জ্বরের মতো চিকুনগুনিয়ার নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। তাই রোগীকে বিশ্রামে রাখার পাশাপাশি প্রচুর পানিসহ অন্য তরল খাবার খেতে দিতে হবে। জ্বর হলে খাওয়াতে হবে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ। সেই সঙ্গে বারবার পানি দিয়ে শরীর মুছে দিতে হবে। আক্রান্ত রোগীকে রাখতে হবে মশারির ভেতর। কেননা, রোগীকে কোনো মশা কামড় দিয়ে অন্য সুস্থ লোককে কামড়ালে তিনিও চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হতে পারেন।
এ বিষয়ে দেশের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, এ পর্যন্ত সারা দেশে দুই হাজার ১০০ জন চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়েছে বলে আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া কেবল আইইডিসিআরের গবেষণাগারে পরীক্ষা করা ৬৬৯টি নমুনার মধ্যে ৫৩৩টিতেই চিকুনগুনিয়া ভাইরাস শনাক্ত হয়েছে। এই নমুনাগুলো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আমাদের কাছে পাঠানো হয়। এদিকে, গত ৩ই জুলাই সচিবালয়ে চিকুনগুনিয়া নিয়ে বৈঠকের পর এক সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম মশক নিধন কার্যক্রমকে আরো জোরালো করতে সিটি করপোরেশনে জনবল আরো বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এরপর ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন আগামী চার থেকে ছয় সপ্তাহের মধ্য চিকুনগুনিয়া রোগ নিয়ন্ত্রণে আসবে জানিয়ে বলেন, চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে কার্যক্রম চলছে। মেয়র সিটি করপোরেশনের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে বলেন, শিগগিরই লোক নিয়োগে পদক্ষেপ নেয়া হবে।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর