,



ফরহাদ মজহারের সেই বাসে যাত্রী ছিলেন ক’জন?

বাঙালী কণ্ঠ ডেস্কঃ  অপহরণের পর খুলনা থেকে ঢাকায় ফেরা কবি, প্রাবন্ধিক ও রাজনৈতিক ভাষ্যকার ফরহাদ মজহারের সেই বাসে যাত্রী ছিলেন কয়জন? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এমন প্রশ্ন সংক্রান্ত একটি ছবি প্রকাশের পর সেই বাসে তিন জন যাত্রী ছিলেন বলে অনেকেই বলছেন। কিন্তু আসলেই কি বাসে তিন জন যাত্রী ছিলেন?

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হানিফ পরিবহনের ঢাকা মেট্রো ব-১৪-৯৮০১ নম্বরের ২৭ আসনের সেই বাসটির সব টিকিট বিক্রি হয়েছিল। তবে যশোরের নওয়াপাড়ায় যখন ফরহাদ মজহারকে উদ্ধার করা হয় সেই সময় বাসে যাত্রী ছিলেন ১২ জন। অনুসন্ধানে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

হানিফ পরিবহনের ৫০৫ নম্বর সেই কোচের সুপারভাইজার হাফিজুর রহমান বলেন, ‘শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সেই বাসটি ছিল ২৭ আসনের। রাত সোয়া ৯টায় খুলনার রয়েল কাউন্টার থেকে বাসটি যখন ছাড়ে তখন ২৭ জন যাত্রীর একটি ‘সিট প্ল্যান’ তার হাতে দেওয়া হয়। রয়েল কাউন্টার থেকে বাসটিতে যাত্রী ওঠেন ছয় জন। শিববাড়ি কাউন্টার থেকে যাত্রী ওঠেন দুই জন। এই কাউন্টার থেকেই বাসে এসে বসেন ফরহাদ মজহার।

পরবর্তীতে নতুন রাস্তা এলাকা থেকে যাত্রী ওঠেন আরও দুই জন। যশোরের নওয়াপাড়া থেকে যোগ হন আরও দুই যাত্রী। এই ১২ জন যাত্রী নিয়ে আসার পথেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে বাসটি থামাতে বলা হয়। প্রায় ৪০ মিনিট দাঁড়িয়ে থাকার পর পুলিশ ও র‌্যাব এসে বাস থেকে আই-৩ আসনের যাত্রী ফরহাদ মজহারকে নামিয়ে নিয়ে যায়।

সুপারভাইজার আরও জানান, বাসটিতে আরও ১৫ জন যাত্রী উঠেছেন পরে। বাকি ১৫ যাত্রী যশোর, মনিহার ও নিউমার্কেট এলাকা থেকে ওঠেন। তিনি যখন যাত্রীদের টিকিট চেক করছিলেন তখন ফরহাদ মজহার ঘুমিয়ে ছিলেন। তাকে ডেকে তুলে টিকেট দেখতে চান। এ সময় তিনি ব্যাগ থেকে একটি টিকিট বের করে দেখান।

হানিফ পরিবহরেন ওই বাসে খুলনা থেকে ঢাকায় আসা নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন যাত্রী বলেন, ‘বাসে তিন জন যাত্রী ছিলেন বলে যারা তথ্য ছড়াচ্ছে তারা মিথ্যে কথা বলছেন। ওই বাসে তখন আনুমানিক ১০-১২ জন যাত্রীকে দেখেছেন তিনি। বাকি যাত্রীরা পরবর্তীতে বাসে ওঠেন।’

টিকিট কাটার সময় দেওয়া মোবাইল নম্বরটি বন্ধ
হানিফসহ বড় বাস কাউন্টারগুলোতে টিকেট কাটার সময় যাত্রীদের একটি মোবাইল নম্বর দিতে বলা হয়। এই নম্বরটি বাস টিকিটে না থাকলেও কাউন্টারের কম্পিউটারে সংরক্ষণ করা হয়। পরবর্তীতে নম্বরসহ যাত্রীদের একটি শিট বা সিট প্ল্যান সংশ্লিষ্ট বাসের সুপারভাইজারের কাছে দেওয়া হয়।

ফরহাদ মজহারের কাছে টিকিট বিক্রি করেছিলেন খুলনার শিববাড়ি মোড়ের হানিফ পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার নাজমুল সাদাত সাদি। গফুর নামে ১৩০০ টাকা দিয়ে টিকিট কিনেছিলেন তিনি। কাউন্টার ম্যানেজারের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে যশোরের নওয়াপাড়া থেকে ফরহাদ মজহারকে উদ্ধার করা হয়।

বাসটিতে আই-ফোর আসনের যাত্রী ছিলেন ঢাকার একটি বায়িং হাউজে কর্মরত খুলনার দৌলতপুরের বাসিন্দা মো. বাপ্পী  বলেন, ‘বাসে ওঠার পর দেখি পাশের আসনের যাত্রী ঘুমিয়ে আছেন। স্বল্প আলোর কারণে তাকে চিনতে পারিনি। তবে পুলিশ বাস থেকে নামিয়ে নেওয়ার সময় দেখি তিনি ফরহাদ মজহার!’

আই-ওয়ান আসনের যাত্রী কুষ্টিয়ার শরিফুল ইসলাম জানান, তিনি খুলনার আবু নাসের হাসপাতালে এসেছিলেন। কাজ শেষে হানিফ পরিবহনে চড়ে ঢাকায় ফিরছিলেন। তিনি একই কাউন্টার থেকে বাসে ওঠার সময় ফরহাদ মজহারকে চিনতে পারেন।

ফরহাদ মজহারকে বহনকারী বাসের সুপারভাইজার হাফিজুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে জানান, তাকে যখন প্রথম অজ্ঞাত এক ব্যক্তি ফোন করে আই-৩ এর যাত্রীর বিষয়ে খোঁজ নেন, তখনই তিনি ওই যাত্রীর টিকিট কাটার সময় যে নম্বরটি দেওয়া হয়েছিল সেই নম্বরে ফোন করেছিলেন। কিন্তু নম্বরটি তখন বন্ধ পাওয়া যায়।

এদিকে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ফরহাদ মজহারের অপহরণের বিষয়টি অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে অনুসন্ধান করা হচ্ছে। তার বাসা থেকে বাইরে আসা, মাইক্রোবাসে তুলে খুলনা নিয়ে যাওয়া এবং খুলনায় ছেড়ে দেওয়ার বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এছাড়া কে টিকিট কেটেছিল, কখন টিকিট কেটেছিল সব বিষয়েই নজর রাখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলে আলোচিত এই ঘটনার বিস্তারিত বলা যাবে বলে আশা করছেন তারা।

উল্লেখ্য, গত ৩ জুলাই ভোর সোয়া ৫টার দিকে আদাবর রিং রোড এলাকার হক গার্ডেনের নিজ বাসা থেকে বের হন ফরহাদ মজহার। এরপর একটি সাদা মাইক্রোবাসে অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা তাকে তুলে নিয়ে যায়। বিষয়টি তিনি স্ত্রী ফরিদা আখতারকে জানান। এরপর আরও অন্তত পাঁচবার পরিবারের কাছে ফোন করে মুক্তিপণ হিসেবে বিভিন্ন অংকের টাকা দেওয়ার কথা বলেন। বিষয়টি নিয়ে দিনভর দেশজুড়ে আলোচনা চলতে থাকে।

মৌখিক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রযুক্তির সহায়তায় আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যরা জানতে পারে ফরহাদ মজহারকে গাবতলী, মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, যশোর হয়ে খুলনার দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। পরবর্তীতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী খুলনা থেকে ঢাকায় আসার পথে যশোরের নওয়াপাড়া এলাকায় হানিফ বাসে তাকে উদ্ধার করে। মঙ্গলবার তাকে ঢাকায় আনার পর আদালতে নেওয়া হলে তিনি ১৬৪ ধারায় ভিকটিম হিসেবে ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে জবানবন্দী দেন। পরে তাকে চিকিৎসার জন্য বারডেম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

এদিকে এ ঘটনায় ফরহাদ মজহারের স্ত্রী ফরিদা আখতার বাদী হয়ে গত ৩ জুলাই রাতেই আদাবর থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করেন। ওই মামলাটি আদাবর থেকে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

Print Friendly, PDF & Email

এই ক্যাটাগরীর আরো খবর